default-image

নম্বর পরিবর্তন না করে অন্য অপারেটরের সেবা নেওয়ার সুযোগ (এমএনপি) খুব শিগগির পাচ্ছেন না মোবাইল ফোনের গ্রাহকেরা। বিটিআরসি আগামী এক বছরের মধ্যে এ সেবা চালু করতে চাইলেও অপারেটরসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, তিন বছরের আগে এটা করা সম্ভব নয়।
এমএনপি চালু হলে মোবাইল গ্রাহকেরা তাঁদের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো মোবাইল কোম্পানির সেবা নিতে পারবেন। সেবায় সন্তুষ্ট না হলে কিংবা অন্য কোম্পানির বিশেষ সেবা নিতে চাইলে নম্বর পরিবর্তন না করেই যেকোনো কোম্পানির সেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন গ্রাহকেরা।
টেলিযোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এতে কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সেবার মান বাড়বে। বিষয়টি মাথায় রেখে গত বছরের জানুয়ারির মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গভাবে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) চালু করার জন্য অপারেটরদের নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। নির্ধারিত সময়ের এক বছর পরও এ বিষয়ে তেমন অগ্রগতি নেই। তবে মোবাইল অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এ বিষয়ে তাড়াহুড়ো না করে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে এ ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে মত দেয়।
তার পরও আগামী এক বছরের মধ্যে এমএনপি বাস্তবায়ন করতে চায় বিটিআরসি। বিটিআরসির সচিব সারওয়ার আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমএনপি বাস্তবায়নে অনেক সময় দেওয়া হয়েছে। আর দেরি করতে চাই না আমরা।’
সম্প্রতি এমএনপি বিষয়ে নাগরিকদের কাছ থেকেও মতামত নিয়েছে বিটিআরসি। বাংলাদেশে এমএনপি চালু করা প্রয়োজন রয়েছে কি না, এতে গ্রাহকেরা কীভাবে লাভবান হবেন, কোন মডেলে এমএনপি চালু করা প্রয়োজন ইত্যাদি বিষয়ে গত ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মতামত নিয়েছে বিটিআরসি। এখন এসব মতামত পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মহাসচিব হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া বলেন, গ্রাহকদের স্বার্থে এ বিষয়ে বিটিআরসির দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৩ জুন দেশের সব মোবাইল কোম্পানিকে এমএনপি চালু করার নির্দেশ দিয়েছিল বিটিআরসি। এ জন্য সাত মাস সময় বেঁধে দিয়েছিল টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
কিন্তু বিটিআরসির এই নির্দেশনা পাওয়ার পরপরই মোবাইল কোম্পানিগুলো ওই সময়ের মধ্যে এমএনপি চালু করা সম্ভব না বলে জানিয়ে দেয়। এ নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলতে থাকলেও এর মধ্যে সময় শেষ হয়ে যায়।
গত বছরের ১৯ মে বিটিআরসির কমিশন বৈঠকে অ্যামটব মহাসচিব টি আই এম নুরুল কবিরকে সভাপতি করে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে এই সেবা চালুর বিষয়ে একটি গাইডলাইন ও সমন্বিত প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে দুবার সময় বাড়িয়ে ৩১ আগস্টের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
কমিটি বিভিন্ন মোবাইল অপারেটর, আইসিএক্স, আইজিডব্লিউ, পিএসটিএন অপারেটরসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে। তাঁরা আগস্টের মাঝামাঝি একটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন বিটিআরসির কাছে জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির সভাপতি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। কমিটির বৈঠকে এমএনপির সম্ভাব্যতা, কারিগরি দিক, বাণিজ্যিক বিষয়, ব্যবস্থাপনার ধরনসহ সব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’
কবে নাগাদ এমএনপি চালু হতে পারে—এ বিষয়ে কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে কি না জানতে চাইলে নুরুল কবির বলেন, ‘এমএনপি একটি জটিল বিষয়। সবকিছু সঠিকভাবে করে এই সেবা চালু করতে অন্তত তিন বছর সময় লাগতে পারে।’
তবে বিটিআরসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, কমিটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রস্তাবে এমএনপি পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল বিষয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছুই আসেনি। অন্যান্য বিষয় নিয়েও চূড়ান্ত কোনো মতামত পাওয়া যায়নি।
ওই কর্মকর্তা মনে করেন, কমিটি গাইডলাইন তৈরি ও মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে যেভাবে সময় নিচ্ছে তাতে এমএনপি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।
এমএনপি দেশে দেশে
বিশ্বের মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্সের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০৮ সালের নভেম্বরে তুরস্কে এমএনপি চালু হওয়ার পর সেখানকার শীর্ষ অপারেটর টার্কসেল প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাভিয়া ও ভোডাফোনের কাছে গ্রাহক হারাতে থাকে। টার্কসেলের এক প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করে জিএসএমএ বলেছে, এমএনপির কারণে ২০০৮ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে তাদের বাজার ৫৬ শতাংশ থেকে ৫১ শতাংশে নেমে এসেছিল। গ্রাহক হারানোর পরিমাণ এত বেশি ছিল যে, মোবাইল সেবার দাম কমানো এবং সেবার মান বাড়ানোর দিকে তাদের মনোযোগ দিতে হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের ৭০টির মতো দেশে এমএনপি চালু রয়েছে। জিএসএমের গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মাত্র এক-চতুর্থাংশ এ সেবা চালু করেছে। ১৫ শতাংশ ভবিষ্যতে চালু করার পরিকল্পনা করছে। বাকি ৬০ শতাংশই এমএনপি চালু করার বিপক্ষে রয়েছে অথবা এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও ভারত এমএনপি চালু করেছে যথাক্রমে ২০০৭ ও ২০১১ সালে। তবে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় তিন বছর পর পাকিস্তান এ সেবা বন্ধ করে দেয়।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, তুরস্ক, মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকাও ইতিমধ্যে এমএনপি চালু করেছে। টেলিযোগাযোগ খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজার চীন এ বছরের মধ্যে সেবা চালু করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
জিএসএমের গবেষণা অনুযায়ী, এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশের মধ্যে এ সেবা চালু করার বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই। এমএনপি সেবা ব্যয়বহুল হবে—এ চিন্তা থেকে মালদ্বীপ ও উগান্ডা ইতিমধ্যে এর বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করেছে। পাশাপাশি ৮ শতাংশ দেশ, যেগুলোতে মাত্র একটি মোবাইল অপারেটর রয়েছে তাদের জন্য এমএনপি প্রযোজ্য নয়।
শ্রীলঙ্কাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা লার্ন এশিয়ার জ্যেষ্ঠ গবেষক ও অ্যামটবের সাবেক মহাসচিব আবু সায়ীদ খান বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রি-পেইড গ্রাহকের সংখ্যা বেশি। এসব গ্রাহকের কাছে নম্বরের চেয়ে কথা বলার খরচটাই বড় কথা। কম খরচে কথা বলার সুযোগ পেলেই এমনিতেই গ্রাহক ওই কোম্পানির নেটওয়ার্কে চলে যান। বাংলাদেশের মোবাইল গ্রাহকদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে প্রত্যেকের কাছে একাধিক কোম্পানির সিম থাকে। যখন যে কোম্পানি সুযোগ বেশি দেয়, সেই কোম্পানির সিম ব্যবহার করে তাঁরা কথা বলেন। মোবাইল অপারেটরদের তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোবাইল ফোন গ্রাহকের ৯৮ শতাংশই প্রি-পেইড সেবা নেন।
সেবার ব্যয়, বিটিআরসির গাইডলাইন
বিটিআরসির ২০১৩ সালের প্রস্তাবিত গাইডলাইন অনুসারে বাংলাদেশে এমএনপি সেবা নিতে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা ফি নেওয়া যাবে।
ভারতে মাত্র ১১ রুপি খরচ করে এ সেবা নেওয়া যায়। থাইল্যান্ডে এ সেবার জন্য খরচ হয় ৯৯ বাথ। মালয়েশিয়া, হংকং, যুক্তরাজ্যসহ বেশির ভাগ দেশেই সেবাটির জন্য কোনো মূল্য দিতে হয় না।
বিভিন্ন দেশে নম্বর পরিবর্তনের অনুরোধ পাওয়ার পর সর্বোচ্চ ৩০ দিন থেকে সর্বনিম্ন কয়েক সেকেন্ড লাগে। ভারতে এ সেবা পাওয়া যায় সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে। যুক্তরাজ্যে লাগে পাঁচ দিন, যুক্তরাষ্ট্রে দুই ঘণ্টা, অস্ট্রেলিয়ায় তিন মিনিট। আর নিউজিল্যান্ডে লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
অপারেটরদের ভাবনা
মূলত মুঠোফোন অপারেটরদের একচেটিয়া বাজারের ওপর গ্রাহকের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার ভাবনা থেকেই এমএনপি সেবা চালুর উদ্যোগ নেয় বিভিন্ন দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। পাশাপাশি অপারেটরদের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও রয়েছে। এমএনপি চালু হয়েছে এমন দেশগুলোতে অপারেটরের মধ্যে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে বেশি। গ্রাহক ধরে রাখার জন্য তাদের প্রত্যেকেই সেবার মানের দিকে সর্বোচ্চ নজর দিচ্ছে।
বাংলাদেশের শীর্ষ মুঠোফোন কোম্পানি গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার মাহমুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এমএনপির বিপক্ষে নই। তবে সবদিক বিচার-বিবেচনা না করে এটার বাস্তবায়ন করতে গেলে গ্রাহকের সুবিধার চেয়ে বিড়ম্বনাই বাড়বে।’ সবার আগে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এ বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আরও আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন মাহমুদ।
রবি আজিয়াটা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুপুন বীরাসিংহে বলেন, ‘বাংলাদেশে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি চালু করতে বিটিআরসিকে সব ধরনের সহায়তা করতে রবি প্রস্তুত আছে।’
এয়ারটেলের একজন মুখপাত্র প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমএনপি গ্রাহকদের জন্য প্রয়োজনীয় একটি সেবা বলে মনে করি। বিটিআরসির নির্দেশনা অনুযায়ী এ সেবা দিতে আমরা অপেক্ষায় আছি।’
বাংলালিংকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি গ্রাহকদের জন্য এমএনপি একটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু এটার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখে যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে করা উচিত। আমরা দেখেছি তাড়াহুড়ো করে এমএনপি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেক দেশই এর আসল লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের বাজার ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো অনেক জটিল হওয়ার কারণে এর ওপর নজর দেওয়া উচিত। এমএনপি বাস্তবায়নের আগে এর ব্যবস্থাপনা কাঠামো, কারা প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবে, সেসব বিষয়ে ভাবনার অবকাশ রয়ে গেছে।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন