করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ। প্রায় এক বছর আগে বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ১৫ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি আজও।
ওই হাসপাতালের সম্প্রসারিত নতুন ভবন এখন ৫০ শয্যার কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল। গত বছর থেকে জেলায় করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসা চলছে এখানে। শুরুর দিকে এখানে ছিল না কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা। পরে এখানে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার এক বছরেও চালু না হওয়ায় রোগীদের সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে কয়েকটি বড় সিলিন্ডার দিয়ে হাসপাতালের অক্সিজেনের কেন্দ্রীয় সরবরাহ সচল রাখছে কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালটিতে সরবরাহ নেই এন-৯৫ মাস্কও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক জানান, গেল বছর করোনা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতাল থেকে একটিমাত্র এন-৯৫ মাস্ক পেয়েছেন তিনি। তা–ও ছিল নিম্নমানের। হাসপাতাল থেকে দেওয়া হয় সার্জিক্যাল মাস্ক। কোভিড ওয়ার্ডে দুজন নার্স ও একজন ওয়ার্ড বয়কেও দেখা যায় সার্জিক্যাল মাস্ক পরে দায়িত্ব পালন করতে। নার্স জানালেন, ঠিক এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ নেই। তাঁদের কাছাকাছি ধরনের একটি মাস্ক দেওয়া হয়।
ওই হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক বলেন, গত বছর কাজ শেষ হলেও ট্যাংকারে তরল অক্সিজেন সরবরাহ না করায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের উচ্চ চাপে অক্সিজেন দেওয়া যাচ্ছে না। এটা হলেই কোভিড রোগীদের বড় একটা সাপোর্ট হতো।
অক্সিজেনের গাড়ি ঢুকতে পারবে না—ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লিন্ডের এমন অজুহাতে হাসপাতালের প্রধান গেটও ভাঙা হয়েছে। সড়কের ওপর বিদ্যুতের তার উঁচু করে দেওয়া, রাস্তার পাশের ড্রেনে স্ল্যাব দেওয়াসহ একের সময় একেক অজুহাত দেয় লিন্ডে। তাদের সব ধরনের কাজ করে দেওয়া হলেও অক্সিজেনের সরবরাহ নেই।
উচ্চগতির অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর ছাড়াই ২৩ এপ্রিল স্থানীয় সাংসদ শেখ তন্ময়ের দেওয়া তিনটি বেড দিয়ে এখানে উদ্বোধন করা হয় আইসিইউ ইউনিট। কোভিড হাসপাতালের তৃতীয় তলায় এই ইউনিট রোববার গিয়ে দেখা গেছে তালাবদ্ধ।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চিকিৎসক বলেন, একটা ভেন্টিলেটর নেই, হাই ফ্লো অক্সিজেন নেই। কীভাবে আইসিইউ হয়, আপনারা কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করেন?
প্রায় আট মাস আগে কাজ শেষ হওয়া প্ল্যান্টটি চালু না হওয়ায় খুলনা থেকে সিলিন্ডারে করে অক্সিজেন এনে চলে হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা। এ জন্য সদর হাসপাতালের আছে ৬ হাজার ৮০০ লিটার ধারণক্ষমতার ৩৯টি সিলিন্ডার, যেগুলোর এক–তৃতীয়াংশ সব সময়ই রিফিলের জন্য থাকে খুলনায়।
সিভিল সার্জন কে এম হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিমিউর একটি প্রকল্পের আওতায় বাগেরহাট সদর হাসপাতালে ওই অক্সিজেন প্ল্যান্টের কাজ শুরু হয় গত বছর। ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তা সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। নভেম্বরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ শেষ হলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি লিন্ডে তরল অক্সিজেন সরবরাহ না করায় আমরা এখান থেকে অক্সিজেন ব্যবহার করতে পারছি না। তাদের গাড়ি ঢোকাতে সেসব প্রতিবন্ধকতা ছিল, সেসব দূর করা হয়েছে। এটি চালু হলে আমরা রোগীদের উচ্চ চাপের অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারব।
হাসপাতালে বর্তমান যে চাহিদা, তাতে একবার ট্যাংকার রিফিল হলে দুই মাসের মতো রোগীদের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। গত বৃহস্পতিবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা টেস্ট ট্রায়াল দিয়ে গেছে। শিগগিরই তাঁরা অক্সিজেন সরবরাহ করে প্ল্যান্টটি চালুর আশ্বাস দিয়েছেন।
সিভিল সার্জন বলেন, ‘বাগেরহাট সদর হাসপাতাল ১০০ শয্যার হলেও জনবলকাঠামো এখনো ৫০ শয্যার হাসপাতালের। তার ওপর কোভিডের জন্য আলাদা ৫০ শয্যা। মোট ১৫০ শয্যার বিপরীতে যে জনবল, তাতে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। আর আইসিইউ চালু করার মতো প্রশিক্ষিত জনবল না থাকায় তা চালু করা যাচ্ছে না। আমরা ১০ জন চিকিৎসক ও ১৫ জন নার্সকে পর্যায়ক্রমে ৬ মাসের প্রশিক্ষণে পাঠাব।’