default-image

করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের কাজে তোড়জোড় শুরু হয়। সংক্রমণের হার কমে এলে কাজের গতিও কমে যায়। এক বছর পরও তাই সারা দেশে নিশ্চিত হয়নি নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ।

শ্বাসতন্ত্রের রোগ কোভিড-১৯-এর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র বলছে, গত বছর সারা দেশে ৭৯টি হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্ট (নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা) বসানোর পরিকল্পনা নেয় সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৩৮টিতে অক্সিজেন সরবরাহ শুরু হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতের তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত বছরের মে মাসে নেওয়া পরিকল্পনাটি জুনে চূড়ান্ত হয়। এরপর ২৬টি হাসপাতালে প্ল্যান্ট বসানোর কাজ পায় ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (নিমিউ অ্যান্ড টিসি)। সিদ্ধান্তহীনতায় বাকি ৫৩টি হাসপাতালের কার্যাদেশ ঝুলে যায়। শীতে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কায় গত অক্টোবরে আবার তাগাদা শুরু হলে তড়িঘড়ি করে এসব হাসপাতালে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালের তালিকা নির্ধারণ নিয়ে শুরু হয় দীর্ঘসূত্রতা। নভেম্বরের মধ্যে ২৩টি হাসপাতালের তালিকা চূড়ান্ত হয়। সবশেষ গত বুধবার বৈঠক করে আরও ৩০টি হাসপাতালের তালিকা চূড়ান্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

বিজ্ঞাপন
নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করার কাজ শুরু হয় গত বছরের মে মাসে। ৭৯টি হাসপাতালের মধ্যে চালু হয়েছে ৩৮টিতে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল দুজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বৈশ্বিক মহামারি শুরুর পর অনেক দেশ দ্রুততার সঙ্গে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বাংলাদেশ সরকার শুরুতেই জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত বছরের মধ্যেই অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানোর কাজ শেষ হয়ে যেত। প্রতি জেলায় অন্তত একটি হাসপাতালে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকত। কিন্তু অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে একটি ভালো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি। এখন সংক্রমণ বাড়তে থাকায় দ্রুত কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। মাঝে সংক্রমণ কমে আসায় অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ বাদ দেওয়ার উপক্রমও হয়েছিল।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হয় মার্চে। জুন-জুলাইয়ে গিয়ে এটি গত বছর সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়েছিল। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে আবার কমতে শুরু করে সংক্রমণ। গত ১০ মার্চ থেকে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। চার দিন ধরে দৈনিক পাঁচ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এ ছাড়া করোনায় মৃত্যুও বাড়ছে।

সংক্রমণের এক বছর পরও নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারায় স্বাস্থ্য বিভাগের অযোগ্যতা ও অদক্ষতাকে দুষছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তাঁরা বলছেন, প্রতিটি জেলা হাসপাতালে অন্তত নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকাটা আবশ্যক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৫ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত করোনার রোগীর ক্ষেত্রে অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হতে পারে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ফরিদ হোসেন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, সব কটি তো একসঙ্গে শেষ করা সম্ভব নয়। কাজ চলমান আছে। নিমিউ ও এইচইডি কাজ শেষের দিকে নিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাংক ও ইউনিসেফের মাধ্যমে ৩০টির কাজ শুরু হয়েছে।

৩০টির মধ্যে ২১টি চালু করেছে নিমিউ

৩০টি হাসপাতালে অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানোর কাজ করছে নিমিউ অ্যান্ড টিসি। এর মধ্যে ২৮টির কাজ শেষ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠান। ২১টিতে ইতিমধ্যে অক্সিজেন সরবরাহ চালু হয়েছে।

এ বিষয়ে নিমিউ অ্যান্ড টিসির চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজার আনজুমান আরা প্রথম আলোকে বলেন, আরও ৭টির কাজ শেষ হয়েছে। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের লাইসেন্স পেলে দুই সপ্তাহের মধ্যে অক্সিজেন সরবরাহ শুরু হবে।

নিমিউ অ্যান্ড টিসির একজন কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল ও হবিগঞ্জ ২৫০ শয্যার হাসপাতালে এখন প্ল্যান্ট বসানোর কাজ চলছে। আগামী মে মাসে এ দুটি চালু হতে পারে।

১৯টির মধ্যে ১৭টি চালু করেছে এইচইডি

ঢাকার বাইরে ১৯টি হাসপাতালে গ্যাস পাইপলাইন ও লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপনের কাজ পেয়েছে আরেকটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (এইচইডি)। এর মধ্যে ছিল ৯টি ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ও ১০টি ১০০ শয্যার হাসপাতাল। দুই দফায় ঢাকার বাইরের ১৯ জেলায় ১৯টি সদর হাসপাতালে কাজ করার অনুমোদন পায় এইচইডি। এর মধ্যে ১৭টি হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ চালু হয়েছে। আর দিনাজপুর জেনারেল ও ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে কাজ শেষের দিকে।

এ বিষয়ে এইচইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ঠাকুরগাঁও এক সপ্তাহের মধ্যে চালু হবে। আর দিনাজপুরে ট্যাংক স্থাপনের জায়গা পাওয়া যাচ্ছিল না। জায়গা চূড়ান্ত হয়েছে, এটিও খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

ইউনিসেফ: ৩০টির মধ্যে একটিও চালু হয়নি

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গঠিত কোভিড তহবিলের টাকায় ৩০টি হাসপাতালে গ্যাস পাইপলাইন ও লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপন করবে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) বাংলাদেশ। গত বছরের জুনে এমন সিদ্ধান্ত হলেও তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদন পায় অক্টোবরে। এরপর শুরু হয় হাসপাতালের তালিকা নিয়ে জটিলতা। তাদের তালিকায় থাকা কিছু হাসপাতালে কাজ করার প্রস্তুতি নেয় নিমিউ ও এইচইডি। তাই তালিকা সমন্বয় করতে চলে যায় আরও কয়েক মাস। গত বুধবার তিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করে তালিকা চূড়ান্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগেই কাজ শুরু করেছে ইউনিসেফ। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি চালু হতে পারে।

এ বিষয়ে ইউনিসেফ বাংলাদেশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, জুনে অনুমোদন পেলে সেপ্টেম্বরে সব চালু হতো। করোনা বাড়লে টনক নড়ে। এখন আগামী জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। সব সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে। যেখানে করোনা পরিস্থিতি বেশি খারাপ, সেখানে অগ্রাধিকার দিয়ে আগে কাজ করা হবে।

ইউনিসেফ সূত্র বলছে, মুগদা ছাড়া বাকি ২৯টি হাসপাতাল ঢাকার বাইরে। সবই মোটামুটি ২৫০ শয্যার সদর হাসপাতাল। এর মধ্যে ১৩টি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) তৈরি করছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এসব হাসপাতালে দ্রুত অক্সিজেন প্ল্যান্ট বসানো হবে।

সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১১ মাস!

করোনা রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহের জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে লিকুইড অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপন করতে গত ৫ মে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চিঠিতে অধিদপ্তর জানায়, করোনা মহামারির কারণে ক্রমেই রোগী বাড়তে থাকায় বিদ্যমান মেডিকেল গ্যাস পাইপলাইন সিস্টেম দ্বারা অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে ট্যাংক স্থাপন প্রয়োজন।

এরপর চলে গেছে প্রায় ১১ মাস। এখন আবার সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অক্সিজেন সরবরাহের কাজে তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক বে-নজীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের অভাবে স্বাস্থ্য খাতে সক্ষমতার ৫০ শতাংশ অপচয় হয়। নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারার পেছনে যাদের গাফিলতি আছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। করোনা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার মূল হচ্ছে অক্সিজেন সরবরাহ। দ্রুততার সঙ্গে সারা দেশে এটি নিশ্চিত করতে না পারলে মৃত্যুহার বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন