default-image

দুই হাতে সাদা ছোপ ছোপ দাগ। বাঁ হাতটা ডান হাতের চেয়ে কিছুটা সরু। বাঁ কানের পেছনে চামড়া কোঁচকানো। ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় পেট্রলবোমায় দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন মিনিবাসচালক মাহাবুব আলমের পুরো শরীরেই।
চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ করেও পুরো সুস্থ হতে পারেননি মাহাবুব। ওই খরচ জুগিয়েছেন স্বজনদের আর্থিক সহায়তায়, গ্রামের বসতবাড়ির একাংশ বিক্রি করে। পোশাকশ্রমিক স্ত্রীর বেতনের টাকা ও স্বজনদের সহায়তায় কোনোমতে চলছে তিনজনের সংসার। গত জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে শিশুপার্কের সামনে বিহঙ্গ পরিবহনের মিনিবাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়েছিলেন চালক মাহাবুবসহ ২৯ জন। তাঁদের মধ্যে পরে আটজন মারা যান। পোড়ার যন্ত্রণা, কষ্টের কথা মাহাবুব বললেন গত ৩০ জানুয়ারি মিরপুরের দুয়ারীপাড়ায় তাঁর বস্তিঘরে বসে।
মাহাবুব বলেন, ওই সন্ধ্যায় যাত্রীসহ মিনিবাস নিয়ে মিরপুর যাওয়ার পথে শিশুপার্কের সামনে পেট্রলবোমা হামলা হয়। পুরো শরীরে আগুন নিয়ে জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েন তিনি। তাঁকে ভর্তি করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। প্রথম কয়েক দিন তাঁর জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান ফিরলে দেখেন চিকিৎসক-সেবিকারা খুব যত্ন করছেন, গণমাধ্যমকর্মীরা সাক্ষাৎকার নিয়ে যাচ্ছেন। ১৪ ডিসেম্বর বার্ন ইউনিট থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
মাহাবুব বলেন, ‘আমি তখনো সুস্থ না, হাঁটপার পারি না। আমার বউ আর আমি খুব জোরাজুরি করলাম আরও কিছুদিন হাসপাতালে থাকার জন্য। কিন্তু তারা একরকম জোর করি বাড়িত পাঠাল।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক (অবৈতনিক) সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম হওয়ার কথা নয়। তবে এখানে যেহেতু রোগীর খুব চাপ, তাই এখানে ‘ক্রস ইনফেকশন’-এর শঙ্কাও বেশি। তাই কিছু রোগীকে মোটামুটি সুস্থ করে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিছু রোগী নিজেরাই একটু সুস্থ হলে বার্ন ইউনিট ছাড়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন।
মাহাবুব জানান, ক্ষত কাঁচা থাকায় এবং অসুস্থ বোধ করায় ১৫ ডিসেম্বর ভর্তি হন মিরপুর ১০ নম্বরের গ্যালাক্সি হাসপাতালে। চিকিৎসার বিপুল খরচ আর কুলাতে পারছিলেন না। ২৬ জানুয়ারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে তিন দিন পর পর আসতে বলে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। চিকিৎসায় এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। খরচ জোগাতে গাইবান্ধা সদরে গ্রামের বাড়ির পাঁচ শতাংশ জমিও বেচেছেন। বাবা-ভাই-চাচারা সাহায্য করেছেন। তিনি বলেন, ছয়-সাত মাস পর মোটামুটি সুস্থ হন। বাঁ হাতের শক্তি কমে যাওয়ায় আর বাস চালাতে পারবেন না। তাই গাড়িচালকের চাকরির জন্য এ পর্যন্ত পাঁচবার সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি হয়নি। তিনি বলেন, ‘লোকে কয়, আমার হাত-মুখ দেইখা বাড়ির ছোট বাচ্চারা ভয় পাইব। এহন আমারে যদি কেউ একটা চাকরি ধইরা দেয়, তাইলেই আমি বাঁইচা যাই, ভাই।’
মাহাবুবের স্ত্রী শাহনাজ জানান, স্বামী দগ্ধ হওয়ার পরের মাসে তিনি পোশাক কারখানায় চাকরি নিয়েছেন। তাঁর বেতন, স্বজনদের সহায়তায় সংসার চলছে। জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ডেকে তাঁকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এই দম্পতির একমাত্র ছেলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন