বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সড়ক দুর্ঘটনার সমস্যাটি রাজনৈতিক। কারিগরিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। যাঁরা সড়কে বিশৃঙ্খলার সুবিধাভোগী, তাঁরাই নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন কমিটিতে বসে আছেন।
অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান, পরিচালক, অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বুয়েট

নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে সাড়ে ১৩ শতাংশ আর মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।

করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় গত বছর কয়েক ধাপে দেশজুড়ে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে মোট ৮৫ দিন গণপরিবহন বন্ধ ছিল। এত দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকার পরও সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়াকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অনেক তথ্য পত্রপত্রিকায় আসে না। ধারণা করা হয়, গণমাধ্যমে যে পরিমাণ তথ্য প্রকাশিত হয়, প্রকৃত দুর্ঘটনা তার চেয়ে চার বা পাঁচ গুণ বেশি। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে শুধু কমিটি গঠনে বেশি মনোযোগ না দিয়ে এবং সুপারিশ করার চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সরকারকে। এসবের চেয়ে বেশি জরুরি জনবান্ধব পরিবহন কৌশল প্রণয়ন করা।

সড়কে নিহতদের বড় অংশই শিক্ষার্থী

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২১ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩৭১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৪৬৮ জন। নিহতদের মধ্যে ৮০৩ জন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। তাদের হিসাবে, প্রতিদিন সড়কে ১৭ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৮৫ দিন গণপরিবহন বন্ধ থাকার বিষয়টি হিসাবে নেওয়া হলে, গড়ে দৈনিক ২২ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

default-image

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মে মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ৮৪ জন শিক্ষার্থী নিহত হন। ফেব্রুয়ারি মাসে নিহত হন ৮৩ শিক্ষার্থী। সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে কম ৫৩ জন শিক্ষার্থী নিহত হন জুন মাসে। শিক্ষার্থীদের বড় অংশ নিহত হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো ও ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

সাড়ে তিন বছর আগে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিল। সরকারের নানা প্রতিশ্রুতির পর তারা রাজপথ ছেড়ে যায়। কিন্তু সড়কে বিশৃঙ্খলা বন্ধ হয়নি। গত বছরের ১৮ নভেম্বর বাসে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে শিক্ষার্থীরা। এই বিক্ষোভের মধ্যেই ২৪ নভেম্বর গাড়িচাপায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের মৃত্যুর পর তা রূপ নেয় নিরাপদ সড়কের ৯ দফা দাবির আন্দোলনে। এবার টানা ২০ দিনের বেশি আন্দোলন করে ঘরে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা।

গণপরিবহন বন্ধের পরও এত মৃত্যু

করোনা সংক্রমণ বাড়তে থাকায় গত বছরের ৫ এপ্রিল থেকে বিধিনিষেধের আওতায় গণপরিবহন বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। পরে ২৪ মে থেকে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন চলার অনুমতি দেওয়া হয়। আবার ২৮ জুন থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ থাকে। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে এক সপ্তাহ বিধিনিষেধ শিথিল থাকে। এরপর ২৩ জুলাই থেকে বিধিনিষেধ চলে ১০ আগস্ট পর্যন্ত। এই সময় মোট ৮৫ দিন গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকে।

নিরাপদ সড়ক চাই–এর (নিসচা) চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, করোনার বিধিনিষেধের কারণে ২০২১ সালে অফিস-আদালত, দোকানপাট ও গণপরিবহন বন্ধ ছিল। ফলে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা কম হওয়ার কথা। এর পরও আগের বছরের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনা বেশি হওয়াটা উদ্বেগজনক।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৫০ শতাংশ

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ২০২১ সালে মোট দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের তুলনায় গত বছর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ৫০ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৫১ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

গত বছর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ২১৪ জন। নিহতের অধিকাংশের বয়স ১৪ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৩৫ লাখের বেশি। পাঁচ বছর আগে দেশে মোটরসাইকেল ছিল ৮ লাখের কাছাকাছি।

ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বেশি

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারি পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরে মোট দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ২৫ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ১৮ শতাংশ দুর্ঘটনা চট্টগ্রাম বিভাগে। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে রংপুর বিভাগে।

সাতটি জাতীয় দৈনিক, পাঁচটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের তথ্যের ভিত্তিতে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তৈরি করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন তুলে ধরে সংগঠনটি। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার অনেক তথ্য পত্রপত্রিকায় আসে না। ধারণা করা হয়, গণমাধ্যমে যে পরিমাণ তথ্য প্রকাশিত হয়, প্রকৃত দুর্ঘটনা তার চেয়ে চার বা পাঁচ গুণ বেশি।

সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন। নিহতদের মধ্যে পথচারী সাড়ে ৫২ শতাংশ এবং মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী সাড়ে ২৮ শতাংশ। রাজধানীতে যানবাহনের চাপায়-ধাক্কায় পথচারী বেশি হতাহত হয়েছেন। রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীতে পণ্যবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে ভোরে ও রাতে পথচারীদের নিহত হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটছে।

রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে গেছে। গতকাল সকালেও গুলিস্তানের মুরগিপট্টি এলাকায় যাত্রীবাহী বাস উল্টে দুজন নিহত হয়েছেন।

মানবসম্পদের আর্থিক ক্ষতি

সড়ক দুর্ঘটনায় গত বছর ক্ষতি হওয়া মানবসম্পদের আর্থিক মূল্য ৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা। যা দেশের জিডিপির দশমিক ৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক সড়ক মূল্যায়নপ্রক্রিয়া মেনে এই হিসাব করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ যানবাহন বা সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, সে তথ্য না থাকায় সম্পদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাপ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দেশের জিডিপির প্রায় দেড় শতাংশ হতে পারে।

দুই সংগঠনের তথ্যে ফারাক

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আরেকটি সংগঠন নিসচার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ৩ হাজার ৭৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ২৮৯ জন নিহত ও ৫ হাজার ৪২৪ জন আহত হয়েছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে গতকাল সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন সংগঠনের চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।

তবে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও নিসচার তথ্যে মৃত্যুর সংখ্যায় পার্থক্য প্রায় দুই হাজার। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান সারা দেশে দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করে না। বেসরকারি একাধিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে দুর্ঘটনার তথ্য রাখে। সংগঠনগুলোর তথ্যের উৎস মূলত পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম। সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারিভাবে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আধুনিক, উন্নত প্রযুক্তি ও পদ্ধতি মেনে দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা নিরূপণ করা প্রয়োজন।

দুর্ঘটনায় মৃত্যুর তথ্যে এত পার্থক্যের বিষয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বের করা একটি দুরূহ কাজ। কাজটি করা হয় বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে। বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্নভাবে তথ্য প্রকাশ করছে বলে বিভ্রান্তি হচ্ছে। তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সরকারের কোনো পরিসংখ্যান নেই। কাজটি যদি সরকার করত, তাহলে পরিসংখ্যানের এই পার্থক্য হতো না।

দুর্ঘটনার পেছনের কারণ

গত বছর যত দুর্ঘটনা, তার ৬২ শতাংশের কারণ যানবাহনের বেপরোয়া গতি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এ ছাড়া চালকদের অদক্ষতা, মহাসড়কে স্বল্প গতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাত হকারের দখলে থাকা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সরকারি সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে।

সুপারিশে যা যা আছে

সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ, দক্ষ চালক তৈরি, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি, মহাসড়কে স্বল্প গতির যানবাহন চলাচলের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার সমস্যাটি রাজনৈতিক। কারিগরিভাবে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। সড়কের পরিস্থিতি এতটাই বিশৃঙ্খল-উচ্ছৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে যে চাইলেই সড়ক নিরাপদ করা এখন খুব কঠিন। যাঁরা সড়কে বিশৃঙ্খলার সুবিধাভোগী, তাঁরাই নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন কমিটিতে বসে আছেন। শুধু বক্তব্য দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা নয়, সত্যিকার অর্থে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া কোনোভাবেই সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন