বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া, অপুষ্টি, শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা, দূষণ এবং ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শরীরে জীবাণুর প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি হওয়ার কারণে নিউমোনিয়া হতে পারে।

বারডেম হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ফুসফুসে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে নিউমোনিয়া হয়। ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি, নিউমোকক্কাস, স্টাফাইলো কক্কাস অরিয়াস—এ তিনটি নিউমোনিয়ার প্রধান কারণ। এ ছাড়া আরএসভি নামক ভাইরাসের সংক্রমণেও নিউমোনিয়া হয়। তবে এর বাইরে কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী। করোনাভাইরাসও ফুসফুসকে আক্রমণ করে। শিশুরা করোনায় সংক্রমিত হলে নিউমোনিয়ার মতো পদ্ধতিতেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।

নিউমোনিয়া প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী কাজ করছে স্টপ নিউমোনিয়া। সংস্থাটি জানাচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুমৃত্যুর একক বৃহত্তম কারণ নিউমোনিয়া। ২০১৯ সালে ৬ লাখ ৭২ হাজার শিশুসহ নিউমোনিয়ায় ২৫ লাখ মানুষ মারা গেছে। ২০২০ সালে করোনার কারণে আরও মৃত্যু যোগ হয়ে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ লাখের বেশি।

বিশ্বে বায়ুদূষণকে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ বলা হচ্ছে। নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দূষিত বায়ুর জন্য হয়। ২০১৯ সালে দূষিত বায়ুর কারণে নিউমোনিয়া হয়ে ৭ লাখ ৪৯ হাজার ২০০ জন মারা যান। এর মধ্যে গৃহস্থালিতে বায়ুদূষণে ৪ লাখ ২৩ হাজার এবং বাইরের বায়ুদূষণের কারণে ৩ লাখ ২৬ হাজার মানুষ মারা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ২০১৭ সালে ৫ বছরের কমব য়সী ৮ লাখ ৮ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়, যা ওই বয়সী শিশুদের সব ধরনের মৃত্যুর ১৫ শতাংশ। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ও আগে থেকে বিভিন্ন অসুস্থতা রয়েছে এমন ব্যক্তিরাও নিউমোনিয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি

গত বছর আইসিডিডিআরবি কার্যালয়ে রিসার্চ ফর ডিসিশন মেকার্স (আরডিএম) এবং ডেটা ফর ইমপ্যাক্ট (ডিফরআই) এক মতবিনিময় সভায় জানিয়েছিল, নিউমোনিয়ার কারণে দেশে প্রতিবছর পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪ হাজার শিশু মারা যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু কমে ১৭ হাজারের মতো হয়েছে। বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতি এক হাজার শিশুর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা তিনে নামিয়ে আনতে হবে।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইউনিসেফ বলেছিল, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে আরও পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশে ১ লাখ ৪০ হাজার শিশু মারা যেতে পারে। অপুষ্টি, বায়ুদূষণ এবং টিকা ও অ্যান্টিবায়োটিক না পাওয়ার কারণে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় একজন করে শিশু মারা গেছে।

স্টপ নিউমোনিয়া ২০১৭ সালের তথ্য দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়া শিশুদের ৪৬ শতাংশ অপুষ্টির শিকার হয়। এ ছাড়া ৩০ শতাংশ গৃহস্থালির জ্বালানির দূষণ ও ২৬ শতাংশ অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়া শিশু ছিল। আর ২০১৮ সালে ১৩ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয় নিউমোনিয়ায়। ২০০০ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর হার হ্রাসের গড় বার্ষিক হার ৮ শতাংশ।

অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পাশাপাশি বাংলাদেশও নিউমোনিয়ার চিকিৎসাকে গুরুত্ব দেয়। কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে কোনো শিশু যেকোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলেই নিউমোনিয়া চিকিৎসার গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। নিউমোনিয়ার জন্য সরকারিভাবে টিকাও দেওয়া হচ্ছে।
নিউমোনিয়ায় মারা যাওয়া শিশুদের অনেকেই বাড়িতে বা চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে। এ বিষয়ে অধ্যাপক আবিদ হোসেন বলেন, মানুষ আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়েছে। কিন্তু এখনো দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার প্রবণতা কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিউমোনিয়ার লক্ষণ হলো কাশি, শ্বাসকষ্টের সঙ্গে জ্বর হওয়া এবং রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, শিশুদের খাওয়াতে অরুচি, বমি, খিঁচুনিসহ জ্বর, নিস্তেজ হয়ে যাওয়া এবং শিশুর বুকের ওঠা-নামা বেশি হওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। মায়ের প্রতি বিশেষ পরামর্শ হচ্ছে, শিশুদের বুকের ওঠা-নামা খেয়াল রাখা। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত বুকের দুধের বাইরে কোনো খাবার না খাওয়ানো এবং ছয় মাস থেকে বাসায় তৈরি খাবার খাওয়ানো। এ ছাড়া শিশুদের সব টিকা দিতে হবে। শিশুদের দেখাশোনা যাঁরা করেন, তাঁদের অবশ্যই পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের উপপরিচালক প্রবীর কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, দেশে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু অনেক কমে এসেছে। চিকিৎসাসুবিধা বাড়ায় নানা ধরনের নিউমোনিয়াও শনাক্ত হচ্ছে। তবে কোনো মৃত্যুই কাম্য নয়। নিউমোনিয়ার কারণগুলোর মধ্যে অপুষ্টি ও গৃহস্থালির দূষণ ব্যক্তি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে পরিবেশদূষণের বিষয়টি সার্বিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে তা প্রতিরোধে কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন