‘দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের নিকটবর্তীঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে ৬৯ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে চকরিয়া পর্যন্ত অংশে আড়াই কিলোমিটার ও চকরিয়া থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অংশে সাড়ে ১২ কিলোমিটার রেলওয়ে ট্র্যাক বা লাইন বসেছে। মোট রেললাইনের দৈর্ঘ্য ১০০ কিলোমিটার।

জোবায়েদা বেগম, আবুল বাশার ও আবু তাহেরদের মতো কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাসিন্দারা দোহাজারী–কক্সবাজার রেললাইন চালুর অপেক্ষায় আছেন। এই লাইনে রেল চলাচল শুরু হলে তাঁদের যাতায়াত আগের তুলনায় অনেক সহজ হবে। স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াত করতে পারবেন।পর্যটন শহর কক্সবাজারে পর্যটকদের আনাগোনা আগের তুলনায় বাড়বে। এতে পর্যটনকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও গতি আসবে বলে আশাবাদী তাঁরা। এ ছাড়া এই রেললাইন চালু হলে স্থানীয় কৃষিজ ও মৎস্য পরিবহন প্রক্রিয়া সহজ হবে।

দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের নিকটবর্তী ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে ৬৯ শতাংশ শেষ হয়েছে ।

গত শনিবার সন্ধ্যায় কক্সবাজার সদরে কথা হয় সংগঠক নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কে চলাচল করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটে। মানুষ মারা যাচ্ছে। তাই এই মহাসড়ক দিয়ে যেতে ভয় করে। সময় বেশি লাগে। এখন রেললাইন চালু হলে, সেই ভয় আর থাকবে না। দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমে যাবে। তখন নিরাপদে চট্টগ্রামে যাতায়াত করা যাবে।

শনিবার বিকেলে কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন ভবনের নির্মাণকাজ দেখতে এসেছিলেন চাকরিজীবী মুজিবুর রহমান। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান। কক্সবাজার সরকারি কলেজ এলাকার এই বাসিন্দা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চট্টগ্রামে চাকরি করেন। সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়িএলে নির্মাণাধীন রেলস্টেশন এলাকায় ঘুরতে আসেন। এই রেললাইন চালু হলে যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তন হবে। চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক চার লেন হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। এখন রেল চলাচল করলে এই পথে চলাচল নিরাপদ হবে। তাই কক্সবাজারের মানুষ এই রেললাইনের ব্যাপারে খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

স্টেশনে চলছে কর্মযজ্ঞ

এই প্রকল্পের আওতায় নয়টি স্টেশন নির্মাণ করা হবে। ইতিমধ্যে সবকটি স্টেশনের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।বর্তমান স্টেশন ভবন এলাকাগুলোতে চলছে নির্মাণকাজের কর্মযজ্ঞ। প্রতিটি স্টেশন এলাকায় শত শত শ্রমিক কাজ করছেন। আবার চলছে রেললাইন স্থাপনের কাজও৷ কোথাও রেললাইন গেছে বিস্তীর্ণ বিলের মাঝদিয়ে। আবার অনেক এলাকায় মূল সড়কের পাশ দিয়ে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার দিয়ে যাওয়ার সময় রেললাইনের নির্মাণকাজ চোখে পড়ে।

কক্সবাজারের চান্দের পাড়া এলাকায় চলছে আইকনিক স্টেশন ভবনের নির্মাণকাজ। গত শনিবার বিকেলে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ছয়তলা ভবনের মূল অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন প্রতিটি তলায় চলছে বিভিন্ন ধরনের কাজ।তাতে ব্যস্ত সময় পার করছিলেন শ্রমিকেরা। তাঁদের কেউ ব্যস্ত আছেন দেয়ালের আস্তর করার কাজে,কেউ ঝালাইয়ের কাজে। আবার বড় ক্রেন দিয়ে নির্মাণসামগ্রী ওঠানামার কাজ চলছে।

আইকনিক ভবনের দোতলা থেকে প্ল্যাটফর্মে নামার জন্য থাকবে চলন্ত সিঁড়ি। এখন সেটির কাজ চলছে। শ্রমিকদের একটা অংশ কাজ করছিল প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের। রেললাইন স্থাপনের জন্য মাটি ভরাটের কাজ হয়েছে। স্টেশনের এক পাশে আবাসিক ভবনের কাজও চলছে। এসব ভবনে স্টেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া থাকবে ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের জন্য কক্ষ।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের কনস্ট্রাকশন ম্যানেজার মো. আবদুল জব্বার প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজার আইকনিক স্টেশন ভবন হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় ও নান্দনিক ভবন। পর্যটন শহরের বিষয় মাথায় রেখে ভবনটির নকশা করা হয়েছে। ঝিনুক আকৃতির এই ভবনে সব ধরনের সুযোগ–সুবিধা থাকবে। এই স্টেশনে তিনটি প্ল্যাটফর্ম থাকবে। এখন প্রতিদিন রাতদিন প্রায় ৬০০ শ্রমিক কাজ করছেন। যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা যায়।

default-image

চকরিয়ার ডুলাহাজারা স্টেশন ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। তবে এই অংশে এখনো রেললাইন বসেনি। তবে রেললাইন বসানোর জন্য ভরাটের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। শ্রমিকেরা এখন প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের কাজ করছেন।

তাঁদের একজন সাজ্জাদ হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম একটা প্রকল্পে কাজ করতে পেরে খুব ভালো লাগছে। আগে এলাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তখন কখনো কাজ পেতেন, কখনো পেতেন না। এখন নিয়মিত কাজ করেন।

দোহাজারী–কক্সবাজার রেললাইনের নয়টি স্টেশনের প্রথমটি হচ্ছে দোজাহারী। বর্তমানে চট্টগ্রাম–দোহাজারী রেললাইনের জন্য একটা স্টেশন আছে। তবে সে স্টেশনের কিছুটা দূরে নতুন স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। স্টেশন ভবনের একটি অংশের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। বাকি দুটি অংশ ছাদ ঢালাইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ছাদ ঢালাই শেষ হওয়া অংশে এখন মেঝে ঢালাইয়ের প্রস্তুতির কাজ করছেন শ্রমিকেরা। তা তদারকি করছিলেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী মিথুন বড়ুয়া। তিনি বলেন, মাঝখানে কোভিড পরিস্থিতির কারণে নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখন পুরোদমে কাজ চলছে।

নির্মাণাধীন স্টেশনের পাশে চলছে রেললাইন স্থাপনের জন্য মাটি ভরাটের কাজও। ট্রাকে ট্রাকে নিয়ে আসা হচ্ছে বালু। এ ছাড়া এই এলাকায় শঙ্খ নদের ওপর রেল সেতুর কাজ চলছিল।

এ সময় কথা হয় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শামসুল ইসলামের সঙ্গে। স্থানীয় এই বাসিন্দা বলেন, চন্দনাইশের দোহাজারী স্টেশন একসময় অনেক ব্যস্ত এলাকা ছিল। নিয়মিত ট্রেন যাতায়াত করত। কিন্তু এখন আগের মতো ট্রেন আসে না। ফলে স্টেশন এলাকার সে ব্যস্ততাও আর নেই। তবে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন চালু হলে আবার জমজমাট হয়ে উঠবে দোহাজারী স্টেশন। মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগও তখন কমে যাবে। লোকজন এখন সে আশায় আছেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন