default-image

বাহ্, এই সময়ে এত মানুষ! বইমেলায় ঢুকেই মনটা ভালো হয়ে গেল। একটানা অবরোধ, হরতাল আর পেট্রলবোমার আতঙ্কে মেলা এবার প্রথম থেকেই ফাঁকা ফাঁকা। শুধু সপ্তাহান্ত আর ছুটির দিনগুলোতেই যা ভিড়। কিন্তু এই বিকেলে মেলার খোলামেলা জায়গাটায় আক্ষরিক অর্থেই ধুলো উড়ছে, মানুষের পদচারণে। শুধু কি তা-ই? তাঁদের হাতে হাতে বই। এবার আসতে শুরু করেছেন বইয়ের আসল ক্রেতারা। যাঁরা সারা মাসজুড়ে বইয়ের খবরাখবর নেন, বেশির ভাগ বই মেলায় আসা পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন, ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে তাঁদেরই জয়জয়কার।
দুই বন্ধু আলিয়া আজাদ আর শুক্লা সরকার। একজন চিকিৎসা-মনোবিদ, অন্যজন স্কুলশিক্ষক। বই কিনে ফিরছেন। কী কিনলেন তাঁরা? মুহম্মদ জাফর ইকবালের বিজ্ঞান কল্পগল্প আর শাহরিয়ারের বেসিক আলী। ধানমন্ডি বালক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রেজোয়ান আরিফের হাতেও বিরাট এক বইয়ের ব্যাগ। তারও পছন্দ বিজ্ঞান কল্পগল্প আর রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা সিরিজ। সে জানাল, আগেও মেলায় বই কিনতে আসত বটে, তবে এবার ‘বড় হয়ে’ নিজের পছন্দে কিনতে এসেছে।
প্রথমা প্রকাশনের সামনে মধ্যবয়সী ভদ্রলোক একগাদা বই কিনে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। একজন গুরুগম্ভীর ক্রেতার সাক্ষাৎও পাওয়া গেল তাহলে? না, তাঁর ছেলে বিরাট এক বইয়ের ফর্দ গছিয়ে দিয়েছে। তিনি এসেছেন সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যেতে। তবে সে ফর্দে শুধু গল্পের বই-ই নেই, আছে বেশ কিছু জীবনীও। বেশ তো!
প্রথমা প্রকাশনের লোকদের কাছে জানা গেল, আনিসুল হকের বিক্ষোভের দিনগুলিতে প্রেম, মশিউল আলমের দ্বিতীয় খুনের কাহিনি আর রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা নিঃসন্দেহে খুব ভালো চলছে। কিন্তু সিরিয়াস বহু বইও চলছে তাদের সঙ্গে রীতিমতো পাল্লা দিয়ে। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নাগরিকদের জানা ভালো বা মহিউদ্দিন আহমদের জাসদের উত্থান-পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি তেমন দুটি বই। একই মতের প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল অনন্যা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মনিরুল হকের কণ্ঠে। তিনি বললেন, ‘আগের দিন আর নেই। সিরিয়াস বইয়ের এখন বিপুল চাহিদা।’
মনিরুল হক বললেন, মেলার বড় এক ক্রেতার দল আসে ঢাকার বাইরে থেকে। টানা অবরোধ আর হরতালের কারণে তাদের বড় অংশ এবার বাদ পড়েছে। সারা দেশের গ্রন্থাগারগুলো থেকে যাঁরা বই কিনতে আসেন, তাঁরাও আসতে পারেননি। মেলার বিকিকিনিতে এর বড় প্রভাব পড়ছে।
প্রকাশক আর লেখক, দুই পক্ষের তরফ থেকেই কেউ কেউ আরেকটি আক্ষেপের কথা বলছিলেন। ঘাসফুলনদী একটু প্রথাবিরোধী প্রকাশক। এর স্বত্বাধিকারী মুনীর মোরশেদের কথায় তা জানা গেল আবার। তিনি বললেন, বাস্তবের তাগিদে বাংলা একাডেমি আর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলা ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু ক্রেতাদের বিভ্রান্তি তাতে বেড়েছে। অনেকে এখনো পুরোনো ধারণার বশে বাংলা একাডেমিতে চক্কর দিয়েই চলে যাচ্ছেন। এবারের মেলার পরিসর বেড়েছে, কিন্তু পরিসর বিভাজন ঠিকমতো হয়নি বলে বইপ্রেমীদের স্রোত পুরো মেলায় সুষমভাবে ছড়িয়ে পড়ছে না। আগামী মেলায় তিনি এদিকে দৃষ্টি দেওয়ার অনুরোধ রাখলেন।
কিশোর সাহিত্যিক ও ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান সেরে এগিয়ে এলেন। বললেন, প্রযুক্তির কল্যাণে সুমুদ্রিত হয়ে ভুলে ভরা অজস্রÊ অপাঠ্য বই বেরোচ্ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে এর পরিণতি হচ্ছে মারাত্মক।
মেলা থেকে বেরোনোর পথে দেখা মিলল লেখক-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদের। এসব সমস্যা সত্ত্বেও বইমেলার গুরুত্ব তাঁর কাছে অমূল্য। তিনি বললেন, ‘একটি সাংস্কৃতিক বিপর্যয় থেকে বাঙালিকে রক্ষা করার জন্য বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিতে একদল তরুণ প্রাণ দিয়েছিল। ফেব্রুয়ারির এই মেলা দেশের সবচেয়ে সাংস্কৃতিক উৎসব। এতে যে সবাই যুক্ত হতে আসে, এর চেয়ে বড় আর কিছু তো হতে পারে না।’
সন্ধ্যায় বেরোনোর সময় বইমেলাগামী মানুষের স্রোত আরও বেড়েছে। বইমেলার সোনালি প্রহর তাহলে সত্যিই শুরু হলো!
মেলা মঞ্চের আয়োজন ও নতুন বই
বাংলা একাডেমির সমন্বয় ও জনসংযোগ উপবিভাগ থেকে জানা গেছে, গতকাল বইমেলার ২২তম দিনে নতুন বই এসেছে ৬৩টি। সাতটি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। নজরুল মঞ্চে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ উন্মোচন করেন এ এ এম হাফিজুর রহমানের মনের বাড়ি আরশি নগর ও সাবিনা ইয়াসমিনের লেখা তমোঘ্না বইয়ের মোড়ক। বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন উন্মোচন করেন সরকার জাহানারা ফরিদের মায়ের কাছে লেখার পর বইটির মোড়ক। কবি তন্ময় ভট্টাচার্যের কবিতার বই ইচ্ছের আকাশ-এর মোড়ক উন্মোচন করেন লেখক সাংবাদিক হারুন হাবীব ও অ্যাডভোকেট রানা দাশ গুপ্ত।
গতকাল বিকেলে বর্ধমান হাউসের পাশে অমর একুশে গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত এবং আবদুশ শাকুর রচিত দুই খণ্ডের রবীন্দ্রজীবন গ্রন্থ বিষয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ: মহাজীবনের অঙ্গ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক বেগম আকতার কামাল। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান এবং অধ্যাপক ফকরুল আলম। সভাপতিত্ব করেন রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সন্জীদা খাতুন। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পুলিশ মঞ্চস্থ করে নাটক রাজারবাগ ’৭১। নাটকটি পরিচালনায় রয়েছেন মো. শরিফুল আলম।
মেলায় প্রথমা প্রকাশন এনেছে রওনক জাহানের POLITICAL PARTIES IN BANGLADESH: Challenges of Democratization. সংহতি প্রকাশন এনেছে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি, সময় এনেছে কামাল চৌধুরীর উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা, চর্চা এনেছে জায়েদুল আহসানের রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি, অন্যপ্রকাশ এনেছে বরেন চক্রবর্তীর ভিঞ্চির ভোজ মাতিসের নাচ, ফজলুল লতিফ চৌধুরীর জীবনানন্দ দাশের চিঠিপত্র, অবসর এনেছে শাকুর মজিদের ভ্রমণগ্রন্থ প্রাগের ঠাকুরোভা লবণপুরের মোজার্ট, আগামী প্রকাশনী এনেছে রাশেক রহমানের লেখা ও শমী কায়সার সম্পাদিত প্রণয়ের রাজনীতি। রূপসী বাংলা প্রকাশ এনেছে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের ভালোবাসার বিরোধী যারা।
আজ সোমবার ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল চারটায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘সবুজপত্রের শতবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আবুল মোমেন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করবেন অধ্যাপক সৌভিক রেজা এবং আবদুল আলীম। অনুষ্ঠানের সভাপতি অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন