default-image

পশ্চিমের গোলগাল সূর্যটাকে মনে হচ্ছিল সোনার থালা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পূর্ব পাশে বাঁশের বেঞ্চে বসে বিকেলের সন্ধ্যা হয়ে যাওয়া দেখতে মন্দ লাগে না। এবারের মেলার মূল আসর এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেই। উদ্যানের সবুজ চত্বরে অস্থায়ী ঘর বানিয়ে দেশের নামকরা প্রকাশকেরা তাঁদের নিত্যনতুন বইগুলো সাজিয়েছেন এখানেই। বড় পরিসরের আয়োজন, তাই ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে এখানটায় এসে বসেন পান্থজনেরা। বিকেল পাঁচটাতেই এখানকার সব আসন ভরে যায়। 
কেউ বসে সদ্য কেনা নতুন বইটি উল্টেপাল্টে দেখেন, কেউ সেলফি জ্বরে কাতর, কারও মুখে বাদাম।
এখানেই দুজন কথা বলছেন সদ্য কেনা বই নিয়ে। পরিচয় দিয়েই জানতে চাই, কী কিনলেন আপনারা? ‘এবারই মেলায় এসেছে এমন পাঁচটি নতুন বই কিনেছি। পাশে থাকা ব্যাগের দিকে ইঙ্গিত করে প্রথমে জবাব দিলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী শারমিন উর্মি। জানালেন, তিনি কিনেছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণের রচনাবলী: জন্মশতবর্ষ সংস্করণ, শামসেত তাবরেজীর অশ্রু মোবারক, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বসবাসের উপযুক্ত বাংলাদেশ চাই, শাহাদুজ্জামানের গল্পসমগ্র১ এবং বিশ্বজিৎ চৌধুরীর বাসন্তী, তোমার পুরুষ কোথায়। উর্মিকে বৈচিত্র্যসন্ধানী পাঠক বললে ভুল হবে না। পাশের জন ইসরাত জাহান। মাথায় ফুলের মুকুট। বসন্তের প্রথম দিনের রেশ তাঁর মধ্যে ষোলআনা। পাশের জনের তুলনায় বয়সে নবীন। তবে পছন্দটা ব্যতিক্রম বটে। কিনেছেন দুটি ভ্রমণকাহিনি। মঈনুস সুলতানের সোয়াজিল্যান্ড: রাজা প্রজা পর্যটক এবং শাকুর মজিদের প্রাগের ঠাকুরোভা লবণপুরের মোজার্ট। ইসরাত বললেন, ‘ভাই, আমার তো ঘোরাঘুরির খুব শখ। এখনো দেশের বাইরে ঘুরতে যেতে পারিনি। তাই ভ্রমণের বই পড়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাই আর কি!’
একটু আগেই মেলায় ঢুকে বেশ কয়েকজন প্রকাশক আর স্টলে থাকা বিক্রেতার সঙ্গে কথা হয়েছিল। সবার মন্তব্য, একুশে গ্রন্থমেলায় বিক্রিবাট্টা অন্যান্য দিনের মতোই, মানুষজনও বেশি আসেনি। অথচ এই যে বিশ্রাম বেঞ্চিতে বসে থাকা তরুণ-তরুণীদের হাতে থাকা বই আর নিজের চোখে মেলায় ঢোকার লাইন দেখে সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। মেলায় ঘোরাঘুরির অভিজ্ঞতা চোখ আর কানের বিবাদ মেটাতে সাহায্য করল।
ফাল্গুনের তৃতীয় দিনের উদাস হাওয়া আর আগের দিন ভালোবাসা দিবস নিয়ে দুনিয়াজুড়ে মাতামাতিতে চঞ্চল সবাই পথ চলার আনন্দেই ঘুরে বেরিয়েছে। আগের দুই দিনের জনসমুদ্র গতকাল না মিললেও যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা মূলত কেনার জন্যই এসেছিলেন বলে জানা গেল ঘুরেফিরে। তবে ‘ভালোবাসা দিবস’ হিসেবে নির্দিষ্ট হওয়ার কারণে অভিভাবকের কড়াকড়িতে যাঁরা আগের দিন বের হতে পারেননি, এমন অনেক নবীন যুগলেরও দেখা মিলল গতকাল। বই কেনার চেয়ে আড্ডা দেওয়া বা চা-কফি-চটপটি খাওয়ার প্রতিই তাঁদের উৎসাহ ছিল বেশি। কেউ কেউ অবশ্য জনপ্রিয় লেখকদের স্টলে ভিড় করেছেন, কয়েকজন কিনেছেনও বই। বাংলা একাডেমি থেকে দেওয়া নতুন বইয়ের তথ্য অনুযায়ী গতকাল মেলায় ৭১টি নতুন বই এসেছে।
তিন মেয়েকে নিয়ে প্রসন্নমুখে মেলায় ঘুরছিলেন বেগমগঞ্জের নাসরিন নীলা। প্রসন্নতার কারণ মা-মেয়ের হাতে ধরে থাকা একগাদা বই। নাসরিন একজন গৃহিণী। বই বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তিিন হাসিমুখে উত্তর দিলেন, ‘এর আগে কখনো বইমেলায় আসা হয়নি। পরশু আর গতকাল শুধু টিভিতে দেখেছি বিশাল ভিড়। এসব দেখে বাচ্চারা বায়না ধরল মেলায় আসবে। এটা আমার কাছে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা। মেলায় এসে খুবই ভালো লাগছে।’ তিনি জানালেন, বেশির ভাগ বই-ই কিনেছেন বাচ্চাদের জন্য। এর মধ্যে রয়েছে আনিসুল হকের ভয়ংকর দ্বীপে বোকা গোয়েন্দা, ফরিদুর রেজা সাগরের বটগাছের মধুরহস্য। নিজের জন্যও কিনেছেন একটি—সোমা সাহা ও সৌমেন কুমার সাহার রয়েল রেসিপি:বাদশাহি রান্না।
রাতে বৃষ্টিতে ধুলা পালিয়েছে, তবে...
বসন্তের দ্বিতীয় রাতেই বৃষ্টি নগরবাসীর জন্য ভিন্ন অভিজ্ঞতা হলেও তার দুটি প্রভাব পড়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। নিত্যদিনের ধুলাবালুর ওড়াওড়ি কাল তেমনটি দেখা যায়নি। কিন্তু রাতের বৃষ্টিতে বেশ কিছু প্রকাশকের বই ভিজে গেছে। বেলা তিনটায় বইমেলার দ্বার খোলার পর সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন ভেজা বই সংরক্ষণের জন্য। এ জন্য গতকাল অধিকাংশ স্টলের পর্দা ওঠাতে দেরি হয়েছে। কয়েকটি স্টলে দেখা গেছে শামিয়ানায় জমে থাকা পানি টিপটিপ করে পড়ছে। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে, অন্যপ্রকাশ, সূচিপত্র, আহমেদ পাবলিশার্স, রয়েল পাবলিশার্সসহ বেশ কয়েকটি স্টল বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকাশকেরা জানান, হঠাৎ করে বৃষ্টি হবে বুঝতে পারেননি কেউ। বুঝতে পারলে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া যেতে পারত।
টাস্কফোর্স অভিযান
মেলায় গতকাল দ্বিতীয়বারের মতো টাস্কফোর্স অভিযান চলতে দেখা গেছে। পাইরেট বইয়ের বিরুদ্ধে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মনজুরুর রহমানের নেতৃত্বে গতকাল মেলায় টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হয়। মনজুরুর রহমান জানান, এ অভিযানে পাইরেট কোনো বই পাওয়া যায়নি। তবে নীতিমালা ভঙ্গ করে অন্য প্রকাশনীর বই বিক্রির অভিযোগে ‘বইপোকা’ স্টলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ‘ছোটদের মেলা’ ও ‘শিশুঘর’ স্টল থেকে বই জব্দ করে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।
নতুন বই: রোববার একাডেমির নজরুল মঞ্চে ১০টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এর মধ্যে মুহম্মদ জাফর ইকবাল উন্মোচন করেন মদিনা জাহান রিমির ইনসমনিয়া ও দেড়শ মাইল দূরের স্বর্গ এবং শাহরিয়ার হোসেনের শেষ অধ্যায় বইগুলোর।
অ্যাডর্ন পাবলিকেশন থেকে এ বি এম হোসেনের পড়ন্ত বেলার গল্প ,শেলী নাজের পুরুষ সমগ্র, ইত্যাদি থেকে এসেছে রাজীব সরকারের সাহিত্যিকের সমাজচেতনা ও অন্যান্য ভাবনা , অনন্যা থেকে এসেছে লুৎফর রহমান রিটনের হরিণ একটা বান্ধা ছিল গাছেরই তলায়, উৎস প্রকাশন থেকে সুমন কুমার দাসের লোকগান লোকসংস্কৃতি, তাম্রলিপি থেকে এসেছে প্রভাষ আমিনের স্বৈরাচারের দালাল বলছি’।

মূল মঞ্চের আয়োজন
বিকেলে মেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘জাতীয় অধ্যাপক সালাহ্ উদ্দীন আহ্মদ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিরোজ মাহমুদ। আলোচনায় অংশ নেন নিশাত জাহান রানা ও মৃত্তিকা সহিতা। অনুষ্ঠানে আসতে না পারায় অধ্যাপক শামসুল হোসাইনের বক্তব্য পাঠ করেন বাংলা একাডেমির সহপরিচালক সায়েরা হাবীব। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মাহ্মুদ শাহ কোরেশী।
সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তিশিল্পী ডালিয়া আহমেদ ও মুস্তাফা ওয়ালিদ। আনোয়ার হোসেনের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন আরশিনগর বাউল সংঘের শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি সংগীত পরিবেশন করেন সাইদুর রহমান বয়াতী, মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, সোনিয়া বয়াতি, পাগলা বাবলু, মমতা দাসী বাউল, রণজিৎ দাস বাউল, কোহিনূর আকতার গোলাপী ও আমজাদ দেওয়ান।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন