default-image

একুশে ফেব্রুয়ারি নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ কতটা সংগত ছিল, সে প্রশ্ন নিয়ে বিব্রত সরকার বিচারপতি এলিসকে তদন্তে নিয়োগ করে। এক সদস্যের ওই তদন্ত কমিশন সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন পেশ করে, তা ছিল পক্ষপাতদুষ্ট এবং তাতে ছিল সরকারকে অপরাধমুক্ত করার অপ্রপ্রয়াস। একজন বিদেশি বিচারপতির কাছ থেকে এ ধরনের অনৈতিকতা কারও হিসাবে মেলেনি। তাই ছাত্র-জনমত ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক অঙ্গন একবাক্যে এলিস কমিশনের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। পত্রপত্রিকায় চলেছে জোর সমালোচনা।

এলিস কমিশনের মূল বক্তব্য ছিল ছাত্ররা উচ্ছৃঙ্খল, দাঙ্গাবাজ। পুলিশ যুক্তিসংগত কারণেই ২৭ রাউন্ড গুলি চালিয়েছে এবং তারা হোস্টেলের বাইরে থেকে ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলিবর্ষণ করেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, পুলিশ তার নিরাপত্তার প্রয়োজনে গুলি করতে বাধ্য হয়েছে। আন্দোলনরত মানুষের ওপর গুলি চালানোর যথার্থতা প্রমাণ করতে এ ধরনের কথা প্রশাসন বা সরকারমাত্রই বলে থাকে। নুরুল আমিন ও তাঁর প্রশাসন কতৃ‌র্পক্ষের মুখেও একই কথা শোনা গেছে।

অথচ ঘটনা ভিন্ন কথা বলে। গুলিবর্ষণের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত হোস্টেল প্রাঙ্গণে ও বাইরে রাস্তায় সমবেত ছাত্রদের মুখে ছিল রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক স্লোগান। সেই সঙ্গে সরকার ও পুলিশি তৎপরতাবিরোধী স্লোগান। তবে তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল পরিষদ ভবনের সামনে পৌঁছানো, যে জন্য তারা দলবদ্ধভাবে চেষ্টা করেছে সামনের রাস্তায় পুলিশি বাধা অতিক্রম করতে। কিন্তু পুলিশের লাঠিপেটার মুখে সে চেষ্টা সফল হয়নি। তাদের হাতে না ছিল লাঠি, না ছিল কোনো ধরনের অস্ত্র, যা পুলিশের নিরাপত্তায় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে এটা ঠিক যে গুলি চালানোর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তারা তাদের সর্বশক্তি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিরস্ত্র চেষ্টা চালিয়ে গেছে। কমবয়সী স্কুলছাত্রদের কেউ কেউ পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুড়েছে এ কথা সত্য, পুলিশও পাল্টা সেগুলোই ছুড়েছে ছাত্রদের দিকে। কিন্তু এ ঘটনা কি গুলি চালনার কারণ হতে পারে?

বিজ্ঞাপন

আরও একটি বিষয়ে বিচারপতি এলিস মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁর প্রতিবেদন অনুযায়ী পুলিশ হোস্টেল গেটের বাইরে থেকে গুলি চালিয়েছে, ভেতরে ঢোকেনি। হোস্টেলের গেট, রাস্তা ও শেডগুলোর অবস্থান এবং কারও কারও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বিচার করে দেখলে এলিস সাহেবের দাবি সঠিক মনে হয় না। কারণ, গেটের বাইরে থেকে চালানো গুলি আঁকাবাঁকা গতিপথে সর্বপশ্চিমে অবস্থিত ২০ নম্বর শেডের বারান্দায় দাঁড়ানো আবদুল জব্বারের তলপেটে আঘাত করতে পারে না। তা ছাড়া পুলিশকে গেটের কিছুটা ভেতরে ঢুকে গুলি করতে উপস্থিত ছাত্রদের অনেকেই তো দেখেছে।

আর ছাত্রদের ছাত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কি কখনো কারও মাথা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে? বুঝতে কষ্ট হয় না যে পুলিশ হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে গুলি ছুড়েছে। তাই বরকতের ঊরুতে, জব্বারের তলপেটে এবং রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের পেটে গুলি লেগেছে। ভয় দেখানো গুলিতে ফুলার রোডে উপস্থিত কিশোর মারা যেত না। সত্যি বলতে কি, এলিস কমিশনের গোটা প্রতিবেদনটিই মিথ্যায় ভরা, একজন বিচারকের চরম অনৈতিকতার প্রতিফলন।

এরপরও কথা আছে। মেডিকেল কলেজের যে কজন ছাত্রকে কমিশনে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়েছিল, তারাও একবাক্যে বলেছে, গুলি চালানোর মতো তখন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। পুলিশ বিনা প্ররোচনায় গুলি চালিয়েছে। তাদের সাক্ষ্য যে প্রতিবেদনে অন্তভু‌র্ক্ত হয়নি, তা থেকেও এলিস সাহেবের পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সহপাঠী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার ডা. আবদুল মালিকের ভাষ্যেও এ কথা জানা যায়। সে সময় মেডিকেল কলেজের ছাত্র মালিককে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হয়েছিল। সেই সঙ্গে আরও কয়েকজনকে, যারা সক্রিয় রাজনীতিতে কখনো যোগ দেয়নি। তাদের সাক্ষ্য অগ্রাহ্য করার পক্ষে যুক্তি নেই।

default-image

নুরুল আমিন সরকারের রক্তমাখা নোংরা আস্তিন পরিষ্কার করতে গিয়ে এলিস সাহেব বিচারপতির পবিত্র আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন। ঘৃণা কুড়িয়েছিলেন পূর্ববঙ্গের দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতা ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর কাছ থেকে। তবে শাসক-সেবার ভালো ‘ইনাম’ পেয়েছিলেন নুরুল আমিন সরকারের কাছ থেকে। আর সেটাই বোধ হয় তাঁর কাঙ্ক্ষিত ছিল। যে জন্য শপথ-ভাঙা অপরাধ করতে এলিস সাহেবের বিবেকে বাধেনি।

প্রসঙ্গত বলা দরকার, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলি চালানোর মূল দায়দায়িত্ব শুধু অবাঙালি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোরাইশি, অতিরিক্ত সিটি পুলিশ সুপার মাসুদ মাহমুদ বা চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদেরই ছিল না; ছিল বাঙালি এস.পি মো. ইদরিস, ডিআইজি ওবায়দুল্লাহ ও তাঁর নিকট বাঙালি সহকর্মীদেরও এবং সর্বোপরি মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের। অবাঙালি পাকিস্তানি প্রশাসক ও রাজনীতিকদের মনোভাব সবাই জানি, কিন্তু বাঙালি মন্ত্রী বা প্রশাসকদের ওই মনোভাবের ব্যাখ্যা কী? সম্ভবত ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় স্বার্থ ও রক্ষণশীল চিন্তা এ ধরনের ন্যায়নীতি-বহিভূ‌র্ত কাজে তাঁদের প্ররোচিত করেছিল। সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্বার্থপূরণের চিন্তা তো ছিলই। তবে তাদের এ কর্মকাণ্ড আন্দোলনকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে সাহাঘ্য করেছিল, এই যা। সেই সঙ্গে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী মনোভাবের আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। যাকে বলে পাল্টা প্রাপ্তি। এ বাস্তবতা বুঝতে পারেনি নুরুল আমিন প্রশাসন।

সূত্র: ভাষা আন্দোলন, আহমদ রফিক, প্রথমা প্রকাশন, ২০০৯

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন