default-image

কুড়িগ্রামের চিলমারীর রানীগঞ্জ ইউনিয়নের মজারটারী মাঝিপাড়া এলাকায় আজাদ হোসেন (৩৫) ও স্ত্রী মানছুরা (২৪) একটি বেসরকারি উন্নয়ন থেকে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করেছিলেন মুরগির খামার। এবারের বন্যায় মুরগির খামার পানিতে ভেসে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন এই দম্পতি। মাত্র ৫ শতক জমির ওপর বাড়ি ও একটি মুরগির খামার। অভাবে খামারে মুরগিও তুলতে পারেননি। অসহায় অবস্থায় রয়েছে এই পরিবারটি। কোনো সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে সাহায্য পেলে আবারও মুরগির খামারটি চালু করতে পারবেন।

মানছুরা বলেন, ‘১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে শুরু করি মুরগির খামার, কিন্তু এক রাতের বন্যায় সব ভেসে গেছে। দুই সন্তান নিয়ে রাতের আঁধারে একটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠে জীবন রক্ষা করি। পরে বাড়ি ফিরে দেখি সব শেষ।’

একই উপজেলার মনোরঞ্জন রায় (৩৫)। রাধাবল্লভ ইউনিয়নের দাসপাড়া এলাকায় বাস করেন। দুই বছর আগে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায় তিন বিঘা জমির একটি পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছিলেন। এ বছর তাঁর প্রায় আড়াই লাখ টাকা লাভের আশা ছিল। কিন্তু বন্যায় প্রায় সব মাছ ভেসে যাওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন।

মনোরঞ্জন রায় বলেন, ‘বন্যার পানিতে ইজারা নেওয়া পুকুরের সব মাছ পানিতে ভেসে গিয়েছে। এতে আমার প্রায় ১ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। অর্থসহায়তা পেলে আবারও মাছ চাষ শুরু করবেন তিনি।’

চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, বন্যায় এই এলাকায় প্রায় ৫ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানকার ৮০ ভাগ মানুষ শ্রমিক। প্রতিবছর এই পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়। এই এলাকার মানুষের জন্য আর্থিকভাবে সাহায্য ও কর্মের সংস্থান করে দিলে পরিবারগুলো স্বাবলম্বী হবে।

default-image
বিজ্ঞাপন

হাফিজুর রহমান (৩০) কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চর ঘনেশ্যাম এলাকায় বসবাস করেন। পেশা কৃষি। আমন মৌসুমে ১২ বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছিলেন। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সেই ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যার ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে শুকনা মৌসুমে চরের জেগে ওঠা ৬ বিঘা জমিতে ইরি ধানের আবাদ করেছেন। হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জেগে ওঠা চরে বিভিন্ন ফসলের চাষ করছি। আশা করি ভালো ফসল পাব। তবে নদীর ভাঙন হলে সব শেষ।’

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বলেন, এবারের বন্যায় এই ইউনিয়নে প্রায় ৫ শত মানুষের ঘরবাড়ি বিলীন হয়েছে। এ এলাকায় বন্যার কারণে বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কোনো কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। অসহায় গৃহহীন পরিবারগুলোকে ঘর নির্মাণের জন্য সহায়তা দিলে উপকৃত হয়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার প্রয়োজন।

কুড়িগ্রামের মানুষের কষ্টের জীবন

বাংলাদেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রাম। ২০১৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানাজরিপ প্রতিবেদন সূত্রে এ জেলায় গড় দারিদ্র্য ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০১৬ সালের পর গত চার বছরে কুড়িগ্রামে দারিদ্র্য কমতে পারে কিংবা বৈষম্য দূর হতে পারে, এমন কোনো কর্মসূচি সরকার গ্রহণ করেনি। ২০১৭ সালে কুড়িগ্রামে যে বন্যা হয়েছিল, তা ২০০ বছরের বন্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সেই বন্যার ক্ষতি এখনো অনেকেই কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালেও কুড়িগ্রামে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। ২০২০ সালে এসে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় এ জেলায় ক্ষতি হয়েছে এক মৌসুমে ছয়বার। করোনার ভয়াল থাবায় এ জেলার মানুষের জীবনে নেমে আসা দুর্ভোগের মাত্রা আরও বেশি ভয়াবহ।

প্রথম বন্যা হয় মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। সেই বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরপরই দ্বিতীয় বন্যা শুরু হয়। দ্বিতীয় বন্যার পানি নেমে যাওয়ার আগেই শুরু হয় তৃতীয় বন্যা। এরপর চতুর্থ ও পঞ্চমবারের মতো ভয়াবহ বন্যায় জীবন বিপন্ন হয়ে উঠেছে। করোনা, জলাবদ্ধতা ও পাঁচ বন্যা মিলে মোট সাতবার আঘাত এসেছে কুড়িগ্রামবাসীর ওপর। গত আট মাসে করোনা আর ধারাবাহিক বন্যার প্রকোপে ছিন্নভিন্ন এখানকার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনীতি।

default-image

বোরো ও আমন ধানের ক্ষতি

বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ঠিক ধান পাকার যখন সময় হয়ে আসছে, ঠিক তখনই বড় বৃষ্টি দেখা দিয়েছিল। জমির ধান পাকার আগেই সেই বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল ডুবে গেছে। পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়নি বলে সেটিকে বন্যা বলা হয় না। কিন্তু ফসলের ব্যাপক ক্ষতি ওই বৃষ্টির জলাবদ্ধতায় হয়েছে।

অন্যদিকে বন্যার পানি যতবার নেমেছে, বলতে গেলে ততবারই ফসল লাগানো হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই সেই ফসল বন্যার গর্ভে চলে গেছে। সর্বশেষ যে ধান লাগানো হয়েছিল, তা দীর্ঘ বন্যায় শেষ হয়েছে। বাস্তবতা হলো, মে মাসে বোরো ধান অনেকেই ঘরে তুলতে পারেননি। আর আমন ধান কয়েকবার লাগানো হলেও ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে বছরের দুটি ফসলই শেষ। এতে নিম্নমধ্যবিত্ত, এমনকি কৃষিনির্ভর মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনের চারদিকে ঘন অন্ধকার।

আশার আলো কৃষিবিমা

কুড়িগ্রাম উপজেলার চিলমারী উপজেলা রানীগঞ্জ ইউনিয়নের মজারটারী মাঝিপাড়া এলাকার দীপ্তি রানী (৩৩), তাঁদের বাড়ি ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। স্বামী ফুল্টু চন্দ্র বর্মণ পেশায় একজন জেলে। এক মেয়েসহ তাঁদের তিনজনের সংসার। প্রতিবছর বন্যায় তাঁদের ঘরবাড়ি ডুবে যায়। ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। ৬ শতক জমির ওপর তাঁদের বসতবাড়ি। এবারের বন্যায় তাঁর পোষা ১১টি হাঁস, ৩টি মুরগি, ১টি ছাগল মারা গেছে। পরে তাঁর জন্য কৃষিবিমার ব্যবস্থা করে দেয় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।

তিন মাস আগে কৃষিঝুঁকি বিমা ২ হাজার ৭০০ টাকা পেয়েছিলেন, সেই টাকায় স্থানীয় গর্ভবতী নারীদের প্রসবসেবা দেওয়ার জন্য ডেলিভারি সহায়তার সরঞ্জাম এবং সাধারণ চিকিৎসার ওষুধ কিনেছেন। সেই ওষুধ বিক্রি এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থে মেয়ের লেখাপড়া চালানোসহ স্বামীর সংসারে সহায়তা করছেন।

দীপ্তি রানী বলেন, ‘জলবায়ুঝুঁকি বিমা ২ হাজার ৭০০ টাকা পেয়ে আমি গর্ভবতী মায়ের সেবার জন্য ওষুধ কিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করছি। সেই টাকায় কোনোমতে সংসার চলছে আমাদের।’

বিজ্ঞাপন

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের (সিএএস) নির্বাহী পরিচালক আতিক রহমান জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষকের আর স্বাবলম্বী হওয়ার রাস্তা থাকে না। একসময় কৃষি পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হন। এ ক্ষেত্রে কৃষিবিমা চালু করা গেলে তাঁরা যেমন ক্ষতিপূরণ পাবেন, তেমনি জলবায়ুজনিত দুর্যোগেও পথে বসে যাবেন না। আবার দুর্যোগ শেষ হলে কৃষি আবাদে আগ্রহী হবেন, যা দীর্ঘ মেয়াদে কৃষি ও অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন