default-image

মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাকাণ্ডের পর ওসমান পরিবারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। তবে এখনো আতঙ্ক পুরোপুরি দূর হয়ে যায়নি নারায়ণগঞ্জের মানুষের মন থেকে। মূলত এই আতঙ্ক টিকিয়ে রাখতেই প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন শামীম ওসমানেরা।এরই মধ্যে শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি প্রদীপ ঘোষ ও জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি হাফিজুল ইসলামকে সপরিবারে হত্যার হুমকি দিয়েছেন। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে।সন্ত্রাসী জহিরুল ইসলাম পারভেজ ওরফে ক্যাঙ্গারু পারভেজ নিখোঁজ হওয়ার পর গত ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজ মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনে নিজের অনুগত নেতা-কর্মীদের নিয়ে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় শামীম ওসমান পারভেজকে ফিরে পেতে সময় বেঁধে দেন। পারভেজকে ফিরে না পেলে আর কাউকে ছাড়া হবে না হুংকার দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রাণপ্রিয় নেত্রীর (শেখ হাসিনা) পা ছুঁয়ে যখন আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেব, তখন অনেকের বাড়ির ইট তো দূরের কথা, একটি বালুকণাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।’

default-image

শামীম ওসমান প্রথম আলোর কাছে আওয়ামী লীগ ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণাটি সত্য বলে স্বীকার করে বলেন, ‘যদি প্রমাণ পাই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা এ কাজ করেছে, তাহলে আমি অবশ্যই দল ছেড়ে দেব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি শতভাগ নিশ্চিত, নারায়ণগঞ্জ সিটি মেয়র ও রফিউর রাব্বি মোটা অঙ্কের টাকা চুক্তির মাধ্যমে পারভেজকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুম করেছে।’রফিউর রাব্বি বলেন, ‘অতীতেও শামীম ওসমানের অনেক ক্যাডারের লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। বছর তিনেক আগে শামীমের ক্যাডার মাকসুদকে (নুরুল আমিন ওরফে মাকসুদ) রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়। পরে তাঁর লাশ পাওয়া যায়। অনেকের মুখে শোনা যায়, মাকসুদকে অপহরণ করিয়ে শামীমই হত্যা করিয়েছেন। ক্যাঙ্গারু পারভেজের ক্ষেত্রেও তা-ই হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।’সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ‘বড় রক্তক্ষয়ী ঘটনার আশঙ্কা’ জানিয়ে উচ্চপর্যায়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। তবে এ নিয়ে কথা বলতে নারাজ জেলার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, গোপন কোনো প্রতিবেদন থাকলে তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বলার কিছু থাকে না।তবে রফিউর রাব্বি গত ৫ জুলাই নারায়ণগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সভায় ওই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বিষয়টি সবাইকে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী অথবা তাঁকে খুন করে শামীম ওসমানের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করবে। তাঁর মতে, এ ধরনের গোয়েন্দা প্রতিবেদন ওসমানদের আরও হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে দিচ্ছে। মেয়র আইভীর প্রাণসংশয়ের আশঙ্কা নিয়ে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির বৈঠকেও কথা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি হালিম আজাদ বলেন, ত্বকী হত্যার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জ শহরে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা আনাগোনা করছে। মেয়র নিজে কোনো আতঙ্ক বোধ করেন কি না, জানতে চাইলে সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে।’ তিনি বলেন, ‘শামীম ওসমানের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই। নারায়ণগঞ্জে তিনি ও তাঁর ওসমান পরিবার নিজেদের স্বার্থে আওয়ামী লীগকে বিতর্কিত করেছেন। ওসমান পরিবারের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এতকাল কেউ মুখ খোলেনি। এখন প্রকাশ্যে অভিযোগ করছেন পরিবহনের মালিকেরাও।’

নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, ত্বকী ছাড়াও শীতলক্ষ্যা নদীতে চঞ্চল, আশিক, ভুলুসহ অসংখ্য লাশ পড়েছে। তিনি বলেন, একটি মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি লিটন ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে ত্বকীকে ভ্রমর, লিটন, কালাম সিকদার, রাজীব, সীমান্ত ও অপু খুন করেছেন বলে জানিয়েছেন। এঁদের মধ্যে ভ্রমর, রাজীব, লিটন ও অপু আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কালাম শিকদার নাসিম ওসমানের ব্যবসায়িক অংশীদার। সীমান্ত শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। সীমান্তের বাবা হাজি রিপন নাসিম ওসমানের ক্যাডার।

আবদুর রহমান বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, শামীম ও আজমেরী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় খুঁজছেন।’

দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন কি না, জানতে চাইলে শামীম ওসমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অপপ্রচার ও মিথ্যা মামলার ভয়ে ওসমানরা পালায় না।’ ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর তাঁর দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘তখন দেশ না ছাড়লে আমাকে খুন করা হতো। আবারও বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে আমার বেঁচে থাকার জন্য হয়তো আত্মগোপনে যেতে হবে।’

ত্বকী হত্যায় অভিযুক্তদের সঙ্গে তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জানতে চাইলে শামীম ওসমান বলেন, ‘আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে, হয়তো ঘনিষ্ঠতাও হবে, তাই বলে আমার অন্যায়ের দায় আপনার ওপর বর্তাবে?’

নারায়ণগঞ্জের সংস্কৃতিকর্মীরাই সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের পুরোভাগে রয়েছেন। এই সংস্কৃতিকর্মীদের অভিযোগ, চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ পুলিশ নির্বিকার। গ্রেপ্তার-বাণিজ্য, মাদক দিয়ে ব্যবসায়ীদের ফাঁসিয়ে মাসোহারা আদায়, পরিবহন সেক্টর থেকে চাঁদার ভাগ-বাঁটোয়ারা, গার্মেন্টসের ঝুট, মাদক ও চোরাই জ্বালানি তেল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উৎকোচ আদায় করাটাই হচ্ছে পুলিশের প্রশাসনের নিত্যদিনের কাজ। পুলিশ ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর নজরদারি করা ছাড়া সন্ত্রাস নির্মূলে কোনো ভূমিকাই রাখছে না।

তবে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, পুলিশকে অকারণে বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে। তিনি শহরের বিবদমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার জন্যই শহীদ মিনারে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

( আগামীকাল পড়ুন:      আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নেই)

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0