default-image

‘সতত হে নদ, তুমি পড় মোর মনে
............বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দলে
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?’

—বাংলা সাহিত্যে মধুকবি নামে পরিচিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিদেশ বিভুঁইয়ে বসে এ চরণগুলো লিখেছিলেন একটি বিশেষ নদের কথা ভেবে। বাংলা সাহিত্যে অনন্য প্রতিভার অধিকারী এই কবির লেখনীতে উঠে আসা নদটির নাম কপোতাক্ষ। সেই কপোতাক্ষ আজ মৃতপ্রায়। দখল, দূষণ আর ভরাটের কারণে মুমূর্ষু নদটির দিকে এখন দখলদারদের শ্যেন দৃষ্টি।
মৎস্য আড়ত তৈরির নামে এ নদের জমি দখল করে ৪০ কক্ষের একটি বিশাল পাকা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পাঁচ ফুট উঁচু ৭০টি আরসিসি পিলার দাঁড়িয়ে গেছে। এ ইমারত নির্মিত হচ্ছে তালা ও পাইকগাছা উপজেলার সীমানায় কপিলমুনি (বিনোদগঞ্জ) বাজারের পশ্চিম পাশে কপোতাক্ষ নদের বুকে। জানা গেছে, খুলনা-৬ আসনের সাংসদ শেখ নুরুল হকের নেতৃত্বে কপিলমুনি ও হরিঢালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ইমারতটি নির্মাণকাজের তদারক করছেন।
পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি বাজার বণিক সমিতি ও হরিঢালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সরদার গোলাম মোস্তফা জানান, আগে রাস্তার ধার দিয়ে মাছের আড়তের মাত্র ১০টি ঘর ছিল। সেগুলো ছিল বাঁশ ও চাটাইয়ের তৈরি। আড়ত সম্প্রসারণের জন্য বণিক সমিতির পক্ষ থেকে এ বছর ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় সাংসদের কাছে আবেদন করা হয়। আবেদনপত্রে আড়ত নির্মাণের জন্য নদের ভরাট হওয়া সাড়ে চার একর জমি দাবি করা হয়। একই মাসের ২০ তারিখে স্থানীয় সাংসদ শেখ নুরুল হক বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ীকে নিয়ে বৈঠক করেন। আড়ত তৈরির জন্য ‘মৎস্য আড়ত উন্নয়ন কমিটি’ নামে একটি কমিটি করা হয়। কমিটির পাঁচজন সদস্যের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়ে নদের ধারে তড়িঘড়ি করে পাকা ইমারত নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। তিনি বলেন, ‘বাজার উন্নয়নের স্বার্থে কপোতাক্ষ নদের ভেতরের ৭০ ফুট জায়গা নেওয়া হয়েছে।’
গত শনিবার সরেজমিনে কপিলমুনি গিয়ে দেখা যায়, সাতক্ষীরার তালা ও খুলনার পাইকগাছা উপজেলাকে বিভক্তকারী কপোতাক্ষ নদের বুকে শতাধিক শ্রমিক আরসিসি পিলার তৈরির কাজ করছেন। কেউ রড বাঁধছে, কেউ দখলকৃত জায়গায় মাটি ভরাট করছে। হরিঢালী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সরদার গোলাম মোস্তফা সমগ্র কাজের তদারক করছেন। আরিফ শেখ ও মফিজুল শেখ নামে দুজন শ্রমিক জানান, দুই সপ্তাহ ধরে সরদার গোলাম মোস্তফা তাঁদের দিয়ে এ কাজ করাচ্ছেন।
স্থানীয় লোকজন বলছেন, এই ইমারত নির্মাণ হলে সরকারের গৃহীত ২৬২ কোটি টাকার কপোতাক্ষ খনন প্রকল্প হুমকির মুখে পড়বে। নদের তীরবর্তী কয়েক লাখ মানুষ স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হবে। সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সাংসদ ও কপোতাক্ষ বাঁচাও আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়কারী মুস্তফা লুৎফুল্লাহ জানান, এ নদ ৫০০ ফুট চওড়া ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তা ভরাট হয়ে মৃত নদে পরিণত হয়েছে। কপোতাক্ষ খননের জন্য ২০১১ সালে সরকার ২৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। পর্যায়ক্রমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। তিনি বলেন, এ জনপদ ধ্বংস করতে ভূমিদস্যুরা কপোতাক্ষ নদ দখল করছে। বাজার বণিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ আসাদুর রহমান বলেন, সম্পূর্ণ কপোতাক্ষ দখল করে মৎস্য আড়ত তৈরি করা হচ্ছে। এতে এ অঞ্চল স্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ নেবে। পাশাপাশি সরকারের নেওয়া ২৬২ কোটি টাকার কপোতাক্ষ খনন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হবে।
হরিঢালী ইউপি চেয়ারম্যান আবু জাফর সিদ্দিক জানান, তাঁরা বৈঠক করে নদ দখলের বিরুদ্ধে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি চিঠির খসড়া তৈরি করেছেন। শিগগির তা বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হবে।
পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কবিরউদ্দিন বলেন, ‘ইমারত নির্মাণকাজের মূল তদারককারী সরদার গোলাম মোস্তফাকে ইমারতের কাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছে।’ যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, ‘সমাজের সবচেয়ে সচেতন মানুষেরা নদ দখল করে ওই ইমারত নির্মাণ করছেন। বিষয়টি শোনার পর একজন সেকশন অফিসারকে মাপ-জরিপ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নদটি দখল অভিযোগের তির যার দিকে, সেই খুলনা-৬ আসনের সাংসদ শেখ নুরুল হকের সঙ্গে এ ব্যাপারে দুদিন ধরে কথা বলার জন্য সময় চেয়েও পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনে অনেকবার চেষ্টার পর একবার ফোনটি ধরেন। ‘আপনি কপোতাক্ষ নদ দখলে জড়িত কি না’ জানতে চাইলে তিনি সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলেননি। তবে একবার বলেন, ‘বণিক সমিতির সদস্যরা আমার কাছে মাছের আড়ত সম্প্রসারণের অনুমতি চেয়েছে। আমার লোকজন এ কাজ করছে। তবে তারা একটু বেশি করে ফেলেছে।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন