default-image

প্রথম আলো: সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের এক যুগ পালন করছে। ডিজিটালের পথে বাংলাদেশ কতটা এগোল? ডিজিটাল বাংলাদেশের পরিকল্পনা নিয়ে যে প্রকল্পগুলো নেওয়া হয়েছিল, তা কতটা কাজে লেগেছে?

সুমন আহমেদ: অবকাঠামোগত দিক থেকে আমরা অনেক এগিয়েছি। অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। দুটো সাবমেরিন কেব্‌ল যুক্ত হওয়ায় ইন্টারনেট সক্ষমতা বেড়েছে। স্যাটেলাইটও আমাদের এক অর্জন। যদিও এর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। টেলিভিশন ছাড়া আর তো কোনো ব্যবহারই দেখা যাচ্ছে না। স্যাটেলাইটভিত্তিক চিন্তাভাবনার আরও বহু সুযোগ আমাদের রয়ে গেছে।

প্রথম আলো: প্রকল্পগুলোতে উল্লেখযোগ্য বাজেট ছিল। সেসব ব্যয় করে যে পরিমাণ উন্নয়ন সম্ভব ছিল, তার কতটা পেলাম? প্রকল্পগুলোর পেছনে কতটা দূরদৃষ্টি ছিল?

সুমন আহমেদ: যে অর্থ আমরা ব্যয় করেছি, তাতে গত ১২ বছরে যেখানে পৌঁছানোর সুযোগ ছিল, তার তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের আশপাশের দেশ এর চেয়ে কম অর্থ ব্যয় করে অনেক ভালো জায়গায় যেতে পেরেছে। কারণ, তাদের উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার ছিল। তারা যেটা করতে চেয়েছে, সেটা করেছে। প্রতিটি প্রকল্পের পেছনে একটি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। প্রকল্পের ব্যয় শেষ, প্রকল্পও শেষ—এমন বিলাসিতা করার মতো অবস্থা তো আমাদের নেই। ধরুন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে যদি আমরা ইন্টারনেটের আওতায় আনতে চাই, তাহলে সেখানে কী দেখতে চাই? সেখানে কী ধরনের রোগী এল, কার কী অসুস্থতা—এসব দেখতে হলে এখনো সেই কাগজে-কলমে লিখে লিখে সব করতে হয়। এত ইন্টারনেট সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা ডিজিটালি পুরো বিষয়টা দেখতে পাব না? যাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ে সেবা দিচ্ছেন কিংবা নিচ্ছেন, তাঁরা যেন তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সহজে ও স্বচ্ছন্দে সব সুবিধা দিতে ও নিতে পারেন, সেটাই তো লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল।

প্রথম আলো: তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারি সেবা সহজ করা এবং তাতে স্বচ্ছতা আনার ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হলো?

সুমন আহমেদ: আমরা শুধু আমাদের প্রচলিত কাজগুলোকে কম্পিউটারাইজড করেছি। আমরা অটোমেশনের কথা ভাবিনি, নিয়ম পাল্টাইনি। সেবা এখনো সহজ হয়নি। প্রতিটি কাজের সঙ্গে নানা কিছুর পরস্পর সংযোগ দরকার। একটা কাজের জন্য এখনো নানা জায়গায় ঘুরতে হয়। ডিজিটাল সংযোগের সদ্ব্যবহার হলে মানুষের এসব দুর্ভোগ কমত।

প্রথম আলো: সরকার জেলায় জেলায় যে হাইটেক পার্ক করেছে, সেগুলো তেমন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারল না কেন? সমস্যা কোথায়?

সুমন আহমেদ: কোনো ব্যবসা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হোক বা যা-ই হোক, অবকাঠামোই সেটি বিকাশের একমাত্র শর্ত নয়। আমাদের ছয় বছর পরে ভিয়েতনাম স্বাধীন হয়েছে। ভিয়েতনামে আইফোন ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সেটা হচ্ছে না কেন? আমরা তাদের চেয়ে কোথায় পিছিয়ে? বাস্তবতা হলো, ইন্টারনেট ব্যবহারে ভিয়েতনাম আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। কারণ, তারা তাদের সেবাগুলোকে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের ব্যবহারযোগ্য করেছে। আমাদের দেশে একটি প্রতিষ্ঠান করতে গেলে অনেক ঝক্কি। ত্রুটিপূর্ণ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও আরেক বড় সমস্যা। অফলাইনে যে কথা বললে কিছু হয় না, অনলাইনে বললে তার জন্য অজামিনযোগ্য অপরাধ হয়ে যাচ্ছে। এটা মারাত্মক একটা হুমকির জায়গা। বেশ কিছু অস্পষ্টতাও আছে। কেউ রাষ্ট্রবিরোধী কিছু পোস্ট করলে মনে হয়, যে পোস্ট করেছে তার পাশাপাশি যে প্ল্যাটফর্ম সে ব্যবহার করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানও অপরাধী। অনেক বড় কোম্পানির এখানে অফিস না করতে চাওয়ার এটাও অন্যতম কারণ।

এসব কারণে আমাদের দেশে উত্তম মানবসম্পদও আমরা ধরে রাখতে পারছি না। কারণ, তাদের সে রকম কাজের সুযোগ দিতে পারছি না। ওই রকম বড় কোম্পানিগুলো যদি এ দেশে থাকত, তাহলে এই মানবসম্পদ চলে যেত না। গাজীপুরে যে হাইটেক পার্ক করেছে, সেখানে যেতে-আসতে প্রচুর সময় লাগে। হাইটেক পার্কের ভেতরে এখনো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। কালিয়াকৈরে ফাইবার অ্যাট হোম একটা ডেটা সেন্টারের কাজ করছে। সেখানে ডেটা সেন্টার হয়ে গেছে, দুই বছর আগে বিদ্যুৎ চাওয়া হয়েছে, এখনো তা দেওয়া হয়নি। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন একটা মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরকেন্দ্রিক হলে হবে না। এর বিকাশের জন্য সব বিভাগের সমন্বিত উন্নয়ন হতে হবে। মেধাভিত্তিক চিন্তা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রথম আলো: প্রতিবছর দেশে অনেক আইটি গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। অথচ আইটি খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বলে আসছে যে দেশে এখনো এ খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। ফাঁকটা কোথায়?

সুমন আহমেদ: এর একটা বড় কারণ হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি খাতের শিল্পের দূরত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার অংশ হচ্ছে না। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মান নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু গবেষণার অংশ না হতে পারায় পড়াশোনার সঙ্গে বাস্তব চাহিদার একটা দূরত্ব থেকে যাচ্ছে। সেই পুরোনো সিলেবাসই সেখানে চলতে থাকে। কোথাও কোথাও অবশ্য পরিবর্তন হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের সেরা শিক্ষার্থীদের ২/৩ শতাংশও দেশে থাকে না। শিক্ষাজীবন থেকেই তারা বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তারা চলে যায়। বাকিরা পড়াশোনা করতে গিয়েও ফেরে না। এ ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সারির কিছু ছাত্র বাদে যে কেউ চাইলেই যেকোনো বিষয়ে পড়তে পারে। কোনো কোনো বিষয় পড়তে গেলে তার জন্য তো প্রাথমিক কিছু জ্ঞান থাকতে হয়।

প্রথম আলো: ইন্টারনেটের সুফল বাংলাদেশে এখনো শহরকেন্দ্রিক এবং মূলত মুঠোফোননির্ভর। ব্রডব্যান্ড সেবা কেন আরও ছড়িয়ে পড়ছে না?

সুমন আহমেদ: আমরা প্রাথমিক সুবিধা পাচ্ছি। গ্রামে তো সেটুকুও নেই। গ্রামে একজন মানুষের ৫০০ টাকা দিয়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারের সামর্থ্য আছে কি না, তা দেখতে হবে। সরকার যদি গ্রামে সহজ উপায়ে ইন্টারনেট সুবিধা দিতে চয়, তাহলে সাশ্রয়ী মূল্যে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন দিতে হবে। তাহলে মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী হবে।

প্রথম আলো: এ দেশের ৬০ শতাংশ মুঠোফোন ব্যবহারকারী এখনো ফিচার ফোন ব্যবহার করেন। করোনাকালে আমরা দেখতে পেলাম, তথ্যপ্রযুক্তির বৈষম্যের কারণে অনেক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস থেকে বঞ্চিত হলো। আপনি এ বিষয়ে কী বলবেন?

সুমন আহমেদ: করোনার মধ্যে দেশের সব মানুষকে কিন্তু ডিজিটাল সেবার অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। মানুষের যে জিনিস ব্যবহারের সামর্থ্য আছে, সে ধরনের প্রযুক্তি দিতে হবে। টিভিতে যে ক্লাস চালু হলো, সেটা নিয়ে আরও ভাবার সুযোগ ছিল। এখানে ১০টা ক্লাসের জন্য ১০টা চ্যানেল চালু করা যেত। দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা তাতে ক্লাস নিতেন। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং বাস্তবতা বিবেচনায় সে ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়।

প্রথম আলো: আমরা এমন কথা শুনতে পাই যে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের দাম বেশি। এ অভিযোগ কতটা সত্য? বেশি হলে দাম আরও সাশ্রয়ী করার উপায় কী?

সুমন আহমেদ: ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের দাম বাংলাদেশে বেশি নয়। এখানে দাম বেশি মোবাইল ইন্টারনেটের। এখানে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের একটা বড় ভূমিকা আছে। আবার টেলিকমগুলোর ওপর সরকারের শুল্কও অনেক বেশি। এখানে সরকারকে শুল্কের বিষয়ে ছাড় দেওয়ার কথা ভাবতে হবে।

প্রথম আলো: ২০২০ সালে বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের কিছুটা উন্নতি হয়েছে, ৭৩তম স্থান থেকে ৬৫তম স্থানে এসেছে। সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

সুমন আহমেদ: এখানে প্রতিনিয়ত খুঁজে দেখতে হবে যে আমাদের সাইবার হুমকি আছে কি না। সংগঠিত একটা দল হয়ে এ কাজটা করতে হবে। এশিয়ায় সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কাজ করছে কোরিয়া, জাপান আর মালয়েশিয়া। এদের মডেলগুলো থেকে আমরা শিখতে পারি। সবার ঝুঁকি এক মাত্রার নয়। এখানে প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দিতে হবে। খাত ধরে ধরে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতে হবে।

প্রথম আলো: হ্যাকিংয়ের অভিযোগে দুটি বাংলাদেশি গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ফেসবুক। ব্যাপারটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সুমন আহমেদ: এটা তো নৈতিকতা ও দুর্নীতির বিষয়।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে? বাংলাদেশের আইনি কাঠামো কি এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী?

সুমন আহমেদ: এখন যেভাবে ফোনে আড়ি পাতা হয়, ৯/১১-এর আগ পর্যন্ত তা নিষিদ্ধ ছিল। অনেক জায়গাতেই এখন এটি হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশের স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঝোঁক আছে কিংবা যেখানে মানবাধিকার-পরিস্থিতি ভালো নয়, সেসব দেশে এসব বেশি করা হয়। বাংলাদেশেও আইন করে তা করা হলো। এটি স্বাধীন একজন নাগরিকের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ। আমার ব্যক্তিগত কথোপকথন তো সরকার বা অন্য কারোরই শোনার কোনো অধিকার নেই।

আমরা প্রচুর বিনা মূল্যে সেবা নিয়ে থাকি। এটি যারা দিচ্ছে, তারাও কোনো না কোনোভাবে আয় করছে। আমাদের তথ্যগুলো বেচেই তারা এ আয় করছে। পশ্চিমা দেশগুলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে বেশ সোচ্চার। তারা কিছু আইন করেছে। যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানে আমরা আইন করেছি, আর যেখানে দরকার সেখানে করিনি। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য আইন দরকার। চুরি তো চুরি। সাইবার চুরি আর সশরীর চুরির জন্য তো আলাদা আইনের দরকার নেই। আমাদের দরকার ছিল সাইবার প্রমাণাদি সংগ্রহ করার সক্ষমতা।

প্রথম আলো: প্রায়ই ভিডিও ভাইরাল, ফাঁদে ফেলা, অর্থ হাতিয়ে নেওয়াসহ নানান ধরনের সাইবার অপরাধের খবর আসছে। অনেকেই ডিজিটাল জগতে তথ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখার ব্যাপারে সচেতন নন। এ ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন?

সুমন আহমেদ: ব্যবহারকারীরই আগে সতর্ক হতে হবে। এর বাইরে অপরাধ হয়ে গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে, বিচার করতে হবে। কারও এ রকম কিছু হয়ে থাকলে প্রথমেই পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি জানাতে হবে।

প্রথম আলো: আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশের তরুণেরা ভালো করছে। তাদের আরও এগিয়ে নিতে কী করা দরকার?

সুমন আহমেদ: আউটসোর্সিংয়ে বাংলাদেশ ভালো করছে, কিন্তু বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। এই ফ্রিল্যান্সারদের বাইরে থেকে দেশে টাকা আনার ব্যাপারটা এখনো অনেক জটিল। এটি ঠিক করা খুব দরকার। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আরও কাজ করতে হবে।

প্রথম আলো: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সুমন আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন