বিজ্ঞাপন

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের কথা জানানো হয়। এর ১০ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে সরকার। আর সংক্রমণের ৪৯৯তম দিনে (গতকাল) এসে সর্বোচ্চ ২৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মোট মৃত্যু ১৮ হাজার ছাড়িয়ে গেল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত দেশে মোট ১৮ হাজার ১২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ এক হাজার মৃত্যু হয়েছে মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে। বয়সের দিক থেকে গতকাল পর্যন্ত মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৫ দশমিক ৩৮ শতাংশের বয়স ষাটের বেশি। আর ২১-৫০ বছর বয়সী ১৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। এর আগে গত ১ জুন পর্যন্ত মোট মৃত্যুতে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের হিস্যা আরও বড় ছিল। সেদিন পর্যন্ত মোট মৃত্যুর ৫৬ দশমিক ৮৮ শতাংশের বয়স ছিল ষাটের ওপরে। আর ২১-৫০ বছর বয়সী ছিল ১৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

সংক্রমণের ৪৯৯তম দিনে (গতকাল) দেশে রেকর্ড ২৩১ জনের মৃত্যু। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে সর্বশেষ এক হাজার মৃত্যু।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে চীনের উহানে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে চীন ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি যৌথ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখা যায়, চীনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশের বয়স ৩০ থেকে ৬৯ বছরের মধ্যে। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশের বয়স ছিল ৬০-এর ওপরে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬০ বছরের বেশি বয়সী এবং যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ ও দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ আছে, তাঁদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি।

এখন পর্যন্ত করোনায় বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। স্ট্যাটিস্টা ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ৭ জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৭৪০ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ১৮-৪৯ বছর বয়সী ছিলেন ৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ।

হঠাৎ কেন অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মৃত্যু বাড়ছে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি। করোনায় মৃত্যু নিয়ে খুব বেশি বিশ্লেষণও সরকারি পর্যায়ে হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যেসব তথ্য দিচ্ছে, সেগুলো খুব বিস্তারিত নয়। যদি বেশ কিছু মৃত্যুর ঘটনা বিশ্লেষণ করা যেত, যাঁরা মারা যাচ্ছেন, তাঁদের কী কী উপসর্গ ছিল, কত দিনের মধ্যে মারা গেলেন—এ ধরনের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেত, তাহলে কিছু বিষয় স্পষ্ট হতো। কিন্তু এ ধরনের তেমন কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণ নেই। এটি একটি সংকট।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত রোববার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে মোট ৪৫ হাজার ১২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৩২১ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়। পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ২৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। মাঝে দুই দিন শনাক্তের হার সামান্য কমলেও তিন দিন ধরে তা আবার ২৯ শতাংশের ওপরে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঠিক করা মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো দেশে পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার টানা অন্তত দুই সপ্তাহের বেশি সময় পাঁচ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা যায়। সে হিসাবে বাংলাদেশ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ থেকে এখনো অনেক দূরে।

গতকাল পর্যন্ত দেশে ১১ লাখ ১৭ হাজার ৩১০ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সুস্থ হয়েছেন ৯ লাখ ৪১ হাজার ৩৪৩ জন। আর মারা গেছেন ১৮ হাজার ১২৫ জন। মোট শনাক্তের সংখ্যা বিবেচনায় দেশে করোনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৬২ শতাংশ।

দেশে গত মার্চে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। মাঝে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। মে মাস থেকে সংক্রমণ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে পরিস্থিতির অবনতি হয়। জেলাভিত্তিক বিধিনিষেধ দিয়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। জুন নাগাদ সারা দেশেই সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। এ সময় দেশে ডেলটা ভেরিয়েন্ট (ভারতে উৎপত্তি) ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণের গতি ধীর করতে ১ জুলাই থেকে দুই সপ্তাহের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও এর কোনো ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি সংক্রমণচিত্রে। বিধিনিষেধ শিথিলের পর পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আয়োজিত পশুর হাটগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ভিড় করছেন। ঈদ সামনে রেখে গ্রামের পথে ছুটছে হাজার হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্যবিদেরা আশঙ্কা করছেন, ঈদের পর সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, এখন সংক্রমণ বেশি ছড়াচ্ছে ডেলটা ভেরিয়েন্ট। এতে শিশু ও তরুণেরা আগের চেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ডেলটা ভেরিয়েন্টের কারণে মৃত্যুও বাড়ছে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন