default-image

করোনা মোকাবিলায় ২০২০ সালের শিক্ষাটা পুরোপুরি নেওয়া হয়নি। গত বছর বিভিন্ন পর্যায় থেকে করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষজ্ঞরা নানা পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু সরকার নিজেদের সুবিধাঞ্চল ছাড়া কারও কথা শোনে না। করোনা মোকাবিলার বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারের নিচের দিকে চলে গেছে। প্রস্তুতির ব্যর্থতাই এবারের সংকট।

আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ‘প্রাণ–প্রকৃতি সুরক্ষা মঞ্চ’ আয়োজিত এক ওয়েবিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে জীবন ও জীবিকা বাঁচাতে পূর্ণ রেশনিং চালু ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের ওপর জোর দিয়েছেন বক্তারা।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও ধারণাপত্র পাঠ করেন প্রাণ–প্রকৃতি সুরক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

বিজ্ঞাপন

ধারণাপত্রে বলা হয়, করোনার বর্তমান ঢেউয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই ব্যাপকভাবে বাড়ছে। আগের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। এক বছর পর করোনা যখন আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে, তখন দেখা গেল, স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোনো উন্নতি ঘটেনি। করোনা মোকাবিলায় কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। এ সময়ে সরকার প্রায় ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ নিয়েছে করোনা মোকাবিলা করার জন্য। পাশাপাশি এ সময়ে সরকার ২১টি খাতে ১ লাখ ২০ হাজার ১৫৩ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে, যা দেশের জিডিপির ৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বিশাল প্রণোদনা করোনাকালে জীবিকা হারানো নিম্ন আয়ের মানুষের তেমন উপকারে আসেনি। বরং বিদ্যমান উন্নয়ন মডেলকেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রণোদিত করেছে। মহামারি করোনা বুঝিয়ে দিয়েছে বিদ্যমান উন্নয়ন কাঠামো কতটা অন্তঃসারশূন্য ও প্রাণ–প্রকৃতিবিরুদ্ধ। স্বাস্থ্য খাত, প্রকৃতি, অর্থনীতিসহ সব খাতেই করোনা মহামারিকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন আঙ্গিকে নীতি নির্ধারণের দাবি উঠেছে বিশ্বজুড়ে।

অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দুঃখজনক যে এক বছরের আলোচনায় আশাবাদের বদলে হতাশার সুর আরও জোরালো হয়েছে। ২০২০ সালের শিক্ষাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনা হয়নি। চিন্তা–মনোযোগ ও নীতি সহায়তার জায়গায় বড় ঘাটতি রয়েছে। লকডাউন বা বিধিনিষেধ এমনভাবে আসতে হবে যেন জীবন ও জীবিকা দুটোকেই সমর্থন করতে পারে। নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কোনো শ্রোতা নেই, তাঁরা শুধুই বক্তা। এক বছর আগে করোনা নিয়ে আতঙ্ক ছিল অজানার ভয়। মানুষ দ্রুত সেই অজানার ভয় থেকে বেরিয়ে গেছে। এবার সংকট প্রস্তুতির ব্যর্থতা। মৃত্যু অনেক বেড়ে গেছে। করোনা পরীক্ষার চলমান প্রক্রিয়া করোনার নতুন ধরন ধরতে পারছে না। ফলস নেগেটিভ বেশি হচ্ছে।

অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সরকার বলতে পারবে না যে করোনা মোকাবিলায় কেউ পরামর্শ দেয়নি। গত বছর মার্চ–এপ্রিলে তিন–চার দফা সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের একটি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অবস্থান যে নিজেদের সুবিধা অঞ্চল ছাড়া কারও কথা শুনবে না। দেশের শ্রমশক্তির মধ্যে তারুণ্যের আধিক্য ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল এখানে। তখন দেওয়া পরামর্শ শুনলে আজ এ পরিস্থিতিতে পড়তে হতো না। পি কে হালদার যে পরিমাণ টাকা নিয়ে চলে গেছেন, তার চেয়ে কম দুই–তিন হাজার কোটি টাকায় সহায়তা দেওয়া যেত কয়েক কোটি মানুষকে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও গত বছরের বাজেটে কোনো পরিবর্তন ছিল না। থোক বরাদ্দ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চেয়েছে সরকার।

প্রাণ রক্ষায় প্রাকৃতিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে পরিবেশবিদ সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘এক বছর আগে আলোচনাগুলোতে উঠে এসেছিল যে প্রাণ–প্রকৃতি ব্যবস্থাপনায়, খাদ্য ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব নেতৃত্বের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসবে। প্রকৃতির ক্ষমতা যে অন্য সব ক্ষমতার চেয়ে বেশি, সেটা উপলব্ধি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সরকার প্রাণ–প্রকৃতিবান্ধব হয়েছে, এমন কোনো দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে নেই। এবার ধানের ফলন কম হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। কৃষক দাম না পেয়ে উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন