বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলোর বার্তাকক্ষও এসবের বাইরে ছিল না। দেশে গত বছরের মার্চের শুরুতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে প্রথম আলোতে সিদ্ধান্ত হয়, ঝুঁকি কমাতে এবং সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অফিসে সব কর্মীকে একসঙ্গে রাখা যাবে না। কিছু কর্মীকে বাসায় থেকে অফিসের কাজ করতে হবে। গত বছরের ২৬ মার্চ সীমিত আকারে বাসা থেকে কাজ বা হোম অফিস শুরু হয়। এরই মধ্যে বার্তাকক্ষের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মী করোনায় আক্রান্ত হন। এক দিনের মাথায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে ২১ এপ্রিল শুরু হয় শতভাগ ‘হোম অফিস’। প্রথম আলোর তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি, মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের সহায়তায় বার্তা, বিশাল বাংলা, সম্পাদকীয়, বাণিজ্য, খেলা, বিনোদন, ফিচারসহ সব বিভাগ বাসা থেকে কাজ শুরু করে।

বাসায় থেকে যে দৈনিক সংবাদপত্র বের করা সম্ভব, তা ছিল আমাদের কাছে অকল্পনীয়। কাজের ধারা কী হবে, তা স্পষ্ট ছিল না। রাতারাতি সশরীর বা ফিজিক্যাল বার্তাকক্ষ থেকে ভার্চ্যুয়াল বার্তাকক্ষে পরিবর্তন হওয়ার বিষয়টি ছিল অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা। কর্মীদের কেউ সামনাসামনি নেই। ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রুপে বার্তা দেওয়া-নেওয়া এবং কথা বলে চলতে থাকে কাজ। অফিসের কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হয় বাসার ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ। বার্তাকক্ষের কাজ শুরু হতো সকাল থেকে, চলত গভীর রাত পর্যন্ত। দিনের সংবাদ পরিকল্পনা নিয়ে নির্ধারিত সময়ে বার্তা ব্যবস্থাপকদের বৈঠক, সংবাদ সম্পাদনা, ছবি বাছাই, গ্রাফিকস তৈরি, পৃষ্ঠাসজ্জার মতো কাজগুলো চলে ভার্চ্যুয়াল নিউজ রুমে। ভার্চ্যুয়াল নিউজ রুমের বাইরে অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি সত্ত্বেও কাজ চালিয়ে গেছেন ঢাকা ও ঢাকার বাইরের প্রতিবেদকেরা।

বাসায় থেকে যে দৈনিক সংবাদপত্র বের করা সম্ভব, তা ছিল আমাদের কাছে অকল্পনীয়। রাতারাতি সশরীর বা ফিজিক্যাল বার্তাকক্ষ থেকে ভার্চ্যুয়াল বার্তাকক্ষে পরিবর্তন হওয়ার বিষয়টি ছিল অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা।

অনেকে খবর সংগ্রহের জন্য সরাসরি হাসপাতালেও গেছেন। এ ক্ষেত্রে যাঁর ভূমিকার কথা বলতেই হয়, তিনি আমাদের মিজান ভাই। মিজানুর রহমান খান ছিলেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক। তাঁর কাজের ক্ষেত্র সম্পাদকীয় বিভাগ হলেও রিপোর্টিং করতেন নিয়মিত। করোনার ভয়ে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার তাগিদে মানুষ যখন ঘরে ঢুকে গিয়েছিল, মিজান ভাই তখন মাঠে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছেন। অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার চিত্র তুলে ধরেছেন। ছবি তুলেছেন, ভিডিও করেছেন। এসব অনলাইন ও পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। মিজান ভাই ছিলেন সার্বক্ষণিক সাংবাদিক। ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও তিনি চমৎকার। মুখে হাসি লেগেই থাকত। তাঁর মতো মানুষ আমরা আর পাব না। গত ১১ জানুয়ারি তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

করোনার মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আম্পান আঘাত হানল। এমন দুর্যোগে পত্রিকা প্রকাশ যাতে বিঘ্নিত না হয়, সে জন্য আমরা অল্প কয়েকজন কর্মী ১৮ ও ১৯ মে কারওয়ান বাজারে অফিসে এসে কাজে যুক্ত হই। এরপর আবার হোম অফিস। সব সময়ের মতো পুরো হোম অফিসে বার্তা ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রথম আলো সম্পাদকের যুক্ত থাকার বিষয়টি ছিল অন্য রকম উৎসাহের। তাঁর নির্দেশনা আমাদের সব সময় সাহস জুগিয়েছে।

এভাবে ৪৬ দিন শতভাগ হোম অফিসের পর ৬ জুন (২০২০) আবার সীমিত পরিসরে সশরীর অফিস শুরু করলাম। এরপর থেকে শতভাগ হোম অফিস না থাকলেও করোনা সংক্রমণ রেখার ওঠানামার মধ্য দিয়ে বার্তাকক্ষের কাজের পরিকল্পনা সাজাতে হয়েছে। সংক্রমণ পরিস্থিতির অবনতি হলে ঝুঁকি কমাতে কিছু কর্মী বাসায় থেকে কাজ করেছেন। মানুষকে সচেতন করার জন্য, মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেসব বার্তা দিয়েছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে আমরা প্রথম আলোর পাঠকের জন্য তুলে ধরেছি। দেশীয় বিশেষজ্ঞরা যেসব পরামর্শ দিয়েছেন, আমরা সঙ্গে সঙ্গে তা প্রকাশ করেছি। রোগ পরীক্ষা, হাসপাতালে চিকিৎসাব্যবস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় প্রতিদিন কী করছে, তা পাঠককে সব সময় জানানোর চেষ্টা করেছি। মানুষকে সহায়তা করার জন্য সরকারের ত্রাণের উদ্যোগের খবর যেমন জানিয়েছি, একই সঙ্গে ত্রাণ নিয়ে দুর্নীতির খবরও প্রকাশ করেছি। এই মহামারিকালে হাসপাতালের বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার চিত্রও তুলে ধরেছি। টিকা ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, দুর্বলতা ও প্রাপ্তির খবরও নিয়মিত প্রকাশ করছি।

এই মহামারি অনেকের জীবন কেড়ে নিয়েছে। সবার নাম, ছবি প্রকাশ করা কোনো গণমাধ্যমের পক্ষে সম্ভব নয়। তারপরও ১৭ জুন (২০২০) প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে করোনায় মারা যাওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ১২০ জনের ছবি, নাম ও পেশা প্রকাশ করা হয়। শুধু ওই দিন নয়, পরপর চার দিন প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে ছিল এই আয়োজন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, সাংবাদিকসহ নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ। বাংলাদেশে সংবাদপত্রের ইতিহাসে এটি ছিল ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

করোকালে পাঠকের নানা অভিজ্ঞতার কথাও আমরা প্রকাশ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বছরজুড়ে প্রতিদিনই থাকছে আয়োজন। ৫০ বছরে স্বাস্থ্য খাতের অর্জন তুলে ধরে আমরা প্রতি সপ্তাহে বিশেষ প্রতিবেদন ছাপছি।

করোনা পরিস্থিতি এখনো পুরো স্বাভাবিক হয়নি। সংবাদপত্রের আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন কমেছে। আয় কমেছে। বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে কাজের জন্য কর্মীদের মানসিক চাপ তো আছেই। তবু এই করোনাকালে প্রথম আলো নতুন ধারায় নিজেদের কর্মপরিকল্পনা ও কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এরই মধ্যে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর আমাদের সমন্বিত বার্তাকক্ষের যাত্রা শুরু হয়। আগে ছাপা পত্রিকা ও অনলাইনের কাজ হতো আলাদাভাবে, ভিন্ন ভিন্ন তলায়। এখন ডেস্ক, রিপোর্টিং ও অনলাইন একই তলায়, একই বিভাগের অধীন। অনলাইনের নতুন সিএমএসও চালু হয়েছে।

সমন্বিত বার্তাকক্ষের বদৌলতে আমরা পাঠকের সঙ্গে আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি যুক্ত। সকাল আটটা থেকে শুরু হয়ে চার পালায় (শিফট) এখন ২৪ ঘণ্টাজুড়ে সচল থাকে বার্তাকক্ষ। কর্মীদের কাজে সব সময় অগ্রাধিকার থাকে অনলাইন, যাকে আমরা বলছি ‘ডিজিটাল ফার্স্ট’ নীতি। অনলাইন ও ছাপা কাগজে সর্বশেষ খবর, ঘটনার পূর্বাপর, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, মতামত, সাক্ষাৎকার, ভিডিও, ছবি প্রকাশের মাধ্যমে দেশ ও দেশের বাইরে বাংলাভাষী পাঠকেরা এখন সার্বক্ষণিক প্রথম আলোর সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

  • রাজীব হাসান: উপবার্তা সম্পাদক

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন