বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বুধবার বেলফুলিয়া ইসলামিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে স্কুলে ২ হাজার ৩০৭ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। ২০২০ সালে বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৮২৫ জন ছাত্রী ছিল। এ বছর সেই সংখ্যা ৭৮৪ জনে নেমেছে। খাতা–কলমে কমেছে ছাত্রীর সংখ্যা। আবার খাতায় থাকা ৭৮৪ জনের মধ্যে বিদ্যালয় খোলার পর ৭২ জন ছাত্রী একবারের জন্যও ক্লাসে আসেনি। স্কুল কর্তৃপক্ষ খোঁজ নিয়ে দেখেছে, এদের মধ্যে অনেকের বিয়ে হয়ে গেছে। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থী অনেক ছাত্রীরও বিয়ে হয়েছে।

বিদ্যালয়টি থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ওই বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ২, এসএসসি পরীক্ষার্থী ২৬, অষ্টম শ্রেণির ২০ জনসহ করোনাকালে মোট ৭০ জন ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে। স্কুলে থাকা তথ্য অনুসারে, এসব ছাত্রীর বয়স ১৪ থেকে ১৭ বছর। বেশির ভাগ শিক্ষকের অভিমত, বাল্যবিবাহের প্রকৃত সংখ্যা তাঁদের কাছে থাকা তথ্যের চেয়ে আরও বেশি হতে পারে।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে ওই বিদ্যালয়ের অন্তত ২৬ জন ছাত্রীর বাল্যবিবাহের ঘটনা নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রধান শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন কার্যক্রম চলার সময় থেকেই পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানানো হয়েছে, মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, তারা আর পড়বে না। এখনো নতুন নতুন বাল্যবিবাহের ঘটনা জানতে পারছি। আসলে এসব বিয়ে খুব গোপনে হয়েছে। বেশির ভাগ বিয়ে অন্য এলাকায় নিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাল্যবিবাহ হওয়া মেয়েদের কেউ কেউ এখনো পড়াশোনার মধ্যে আছে। ওই ধরনের শিক্ষার্থীদের স্কুলে আনার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছি।’

ষষ্ঠ শ্রেণির একজন ছাত্রীর বোন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের বাবা নেই, ভাই নেই। মা অসুস্থ। বোন বড় হয়ে যাচ্ছিল, তাই তাঁরা বোনকে বাড়িতে রাখার ঝুঁকি নিতে চাননি। এলাকার মুরব্বি ও স্থানীয় ইউপি সদস্যকে জানিয়েছিলেন। তাঁরা মানা করলেও বিয়েটা হয়ে যায়। তবে হলফনামায় বয়স বাড়িয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে বিয়ের কাজ সেরেছেন তাঁরা।

ওই স্কুলের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর বাবা বলেন, ‘স্কুল খোলার কোনো খোঁজ ছিল না। দিনমজুরি করে দিন চলে। কত দিন মেয়েকে বসিয়ে খাওয়ানো যায়। ভালো পাত্র পাওয়ায় বিয়ে দিয়েছি। নিজ বাড়িতেই বিয়ে হয়েছিল। প্রথমে অনেকে বাধাও দিয়েছিল। তবে বুঝিয়ে বলার পর কেউ আর কিছু বলেনি।’

ওই এলাকার অন্তত ১০ জন লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেলফুলিয়া বিদ্যালয় ওই ইউনিয়নের একমাত্র উচ্চবিদ্যালয়, যেখানে ছাত্র ও ছাত্রীরা একসঙ্গে পড়াশোনা করে। আশপাশের রাজাপুর, আইচগাতি ও মিল্কি এলাকার ভাসমান অনেক মানুষের বাস। ভাসমান মানুষের বেশির ভাগই দিনমজুর ও শ্রমিক। করোনার সময় কাজ হারিয়ে তাঁদের অনেকে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

আইচগাতি ইউনিয়নের নিকাহ রেজিস্ট্রার মোস্তাক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বাল্যবিবাহ আইনসংগত না হওয়ায় নিবন্ধনও হয় না। বিয়ে পড়ানোর জন্য নানা তদবির আসে। কাজিরা যখন বাল্যবিয়ে পড়াতে চান না, তখন কোনো নিবন্ধন ছাড়াই ‘কবুল’ ও দোয়ার মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করা হচ্ছে। ভুয়া জন্মসনদ দিয়ে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে দিচ্ছে। আইচগাতিতে যেসব বাল্যবিবাহ হচ্ছে, তার বেশির ভাগ হচ্ছে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে।

এদিকে খুলনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, করোনা মহামারির দেড় বছরে খুলনার ৪২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ১২৫টি মাদ্রাসার ৩ হাজার ৯ জন ছাত্রী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। বিদ্যালয়গুলো থেকে পাওয়া তথ্যমতে, করোনার দেড় বছরে ডুমুরিয়ায় ৭৫১, কয়রায় ৬৮১, পাইকগাছায় ৪৮৩, দাকোপে ২৯১, রূপসায় ২১৭, খুলনা নগরে ১৫৮, তেরখাদায় ১৪৯, ফুলতলায় ২৪০, বটিয়াঘাটায় ৩৩ ও দিঘলিয়ায় ৬ শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহ হয়েছে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে বিদ্যালয় থেকে পাঠানো তালিকায় দেখা গেছে, রূপসার বেলফুলিয়া ছাড়াও কয়রার কালনা মহিলা দাখিল মাদ্রাসার ৫২, মদিনাবাদ মহিলা মাদ্রাসার ৫০, ডুমুরিয়ার মহিলা দাখিল মাদ্রাসার ৩৮, ডুমুরিয়ার এনজিসি অ্যান্ড এনসিকে স্কুলে ২৫, তেরখাদার কুশলা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৭, পাইকগাছার গজালিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৩৫ জনের বাল্যবিবাহ হয়েছে।

উপজেলাগুলোর মধ্যে বেশি বাল্যবিবাহ হয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলায়। ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুল ওয়াদুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি যোগদানের পর ১০ মাসে প্রায় ৫০টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছি। অভিনব পন্থায় বাল্যবিবাহ হচ্ছে, এটা ঠিক। তবে ডুমুরিয়ায় ৭৫১ জনের বাল্যবিবাহ হয়েছে বলে যেটা বলা হচ্ছে, সেই সংখ্যার সঙ্গে আমরা একমত নই। সঠিক সংখ্যা যাচাইয়ের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে আটটি টিম কাজ করেছে। সঠিক সংখ্যা শিগগির পাওয়া যাবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন