default-image

দেশে করোনা সংক্রমণের হার ঝুঁকিমুক্ত নয়। সামনে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি ও পশুর হাটের ভিড় এই ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে, এমন আশঙ্কা আছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে কঠিন সময় পার করছে স্বাস্থ্য খাত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরুরি উদ্যোগ নিয়ে ঝুঁকি কমিয়ে আনতে হবে।

গতকাল শনিবার চারজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চারজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, দুর্নীতি–অনিয়মের ঘটনায় নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি মহামারি থেকে অন্যদিকে সরে গেছে। সব পক্ষ মহামারি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে মনোযোগী না হলে স্বস্তি ও স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসার সম্ভাবনা বিলম্বিত হবে। এই সময় স্বাস্থ্য খাতের কাজে সমন্বয়, করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা ও হাসপাতাল সেবার ওপর জোর দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন।

সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এমন সময় দেখা দিয়েছে যখন মহামারি নিয়ন্ত্রণে মূল দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য খাত অনেকটাই অগোছালো এবং বিশৃঙ্খল। করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা, শনাক্তকৃত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষকে চিহ্নিত করা (কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং) ও তাঁদের নজরদারিতে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসক–নার্স আছেন অথচ ৭২ শতাংশ শয্যা শূন্য পড়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের পদে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদে এবং অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার পরিচালকের পদে নতুন মানুষ এসেছেন।

নানা অদক্ষতা, অক্ষমতার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতিতে ডুবে থাকা স্বাস্থ্য খাতের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কার্যকরভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। করোনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করার জন্য কিছু ব্যক্তির অপসারণ ও বদলির দাবি জোরালো হওয়ার মুখে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পদে পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সদ্য অপসারিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করা সহকর্মীদের সহায়তা নতুনেরা কতটুকু পাবেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা–বিতর্ক লক্ষ করা গেছে।

মহামারির এই জরুরি সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বিশেষ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কোনো ছুটি ছিল না। গত ফেব্রুয়ারি থেকে এটা দেখা গেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এমনকি গত ঈদের দিনেও সরকারি কর্মকর্তারা কাজ করেছেন। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকক্ষের সামনের খোলা জায়গায় একজনও কর্মকর্তা–কর্মচারী চোখে পড়েনি। দোতলার একজন কর্মকর্তা বলেন, কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এখন অফিসে আসতে লজ্জা পাচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপপরিচালক বলেন, মহামারির মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যম, উদ্যোগ, কর্মব্যস্ততার কোনো কিছুই নেই। একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা ঈদের কয়েক দিন পরই অবসরকালীন ছুটিতে যাবেন। আরেকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বদলি হওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বিভিন্ন মহাপরিচালকের সময় অনিয়ম–দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এবারও পার পেয়ে যাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম পরিচালকদের নিয়ে সভা করেছেন।

সহজ সময় নয়

নমুনা সংগ্রহের সংখ্যা ও পদ্ধতি, রোগ শনাক্তের হার, রোগীর সুস্থ হওয়া—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকলেও বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ ধারণা করছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাফিউন শিমুল এপ্রিল মাস থেকে সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে আসছেন। গতকাল তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দেশে সংক্রমণের হার দশমিক ৯। এর অর্থ একজন সংক্রমিত ব্যক্তির মাধ্যমে একজনের কম মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন।

তবে এতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো কারণ নেই বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, ইরান, সৌদি আরব, অস্ট্রেলিয়ায় সংক্রমণ কমে এসেছিল। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সংক্রমণ বেড়ে যেতে দেখা গেছে। দ্বিতীয়ত, নতুন এই ভাইরাসের সংক্রমণের চরিত্র–বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে বিজ্ঞানীরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। সুতরাং সংক্রমণ প্রতিরোধ কর্মকাণ্ড জোরালো ও অব্যাহত রাখা দরকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সময়ে সংক্রমণঝুঁকির প্রধান কারণ দুটি। প্রথমত, কোরবানির পশু কেনার জন্য মানুষের ভিড় জমবে রাজধানীসহ সারা দেশের হাটগুলোতে। এসব হাটে উপচে পড়া ভিড় থাকে। ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘ সময় থেকে পশু বাছাই ও দরদাম করতে হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা বা অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশু কেনাবেচা প্রায় অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, ঈদের ছুটিতে বহু মানুষ ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ বা গাজীপুর থেকে নিজ নিজ গ্রামে ফিরবেন। এসব শহরে সংক্রমণ বেশি। করোনায় আক্রান্ত উপসর্গহীন বহু মানুষ গ্রামে যাবেন। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে একই ঘটনা ঘটেছিল। ওই ছুটির পর কোনো কোনো এলাকায় সংক্রমণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার নজির আছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘গত ঈদের সময় মানুষের মধ্যে যে ধরনের ভয়, আতঙ্ক ছিল, এখন তা অনেকটাই কমে এসেছে। মানুষ মাস্ক কম পরছে, স্বাস্থ্যবিধির ধার ধারছে না। ঝুঁকি এই কারণে বেশি।’

দরকার জোর সমন্বয়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য তারেক মাহমুদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই সময় কাজের সমন্বয় খুব দরকার। সমন্বয় বাড়াতে হবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখা ও পরিচালকের মধ্যে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সারা দেশের সিভিল সার্জনদের মধ্যে।’

তারেক মাহমুদ হোসেন ইউনিসেফের প্রতিনিধি হিসেবে আফ্রিকার লাইবেরিয়াতে ইবোলা মহামারি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কাজে অংশ নিয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে মহামারি নিয়ন্ত্রণে মূল ভূমিকায় থাকার কথা ছিল অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি)। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সিডিসিকে বা তার পরিচালককে সক্রিয় দেখা যায়নি বা তাদের সক্রিয় করা হয়নি। এটি অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের ঘাটতি।

এদিকে বরিশাল বিভাগের দায়িত্ব থাকা স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, লকডাউনের সিদ্ধান্ত সরাসরি মন্ত্রণালয় থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলো কি না, তা নজরদারি করার ব্যবস্থা মন্ত্রণালয়ের নেই। কাজটি মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গেলে ভালো হতো।

উদাহরণ আরও আছে। ২৩ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সেবা বিভাগ করোনা প্রতিরোধ ও করোনা রোগীদের চিকিৎসা বিষয়ে আট বিভাগ ও ৬৪ জেলার কাজের সমন্বয়ের জন্য ৪৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে অফিস আদেশ জারি করেছে। অথচ একই ধরনের কমিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও আছে। তবে তাতে সদস্য কম।

মন্ত্রণালয় করোনা বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণের জন্য ১৯ সদস্যের জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটিকে নিয়ে মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের নতুন সচিব গত সপ্তাহে সভা করেছেন। অন্যদিকে মার্চ থেকে ৮ সদস্যের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নানা বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে আসছিল। আবুল কালাম আজাদ মহাপরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগের পর এই কমিটির অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কমিটির একাধিক সদস্য বলেছেন, তাঁরা কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন।

চাই রোগ নিয়ন্ত্রণ, সেবা

ওই দুই কমিটির সদস্যরা বলছেন, স্বাস্থ্য খাতের এই সময়ের প্রধান কাজ হওয়া উচিত মহামারিতে মনোযোগ ফিরিয়ে আনা। বিশেষ জোর দেওয়া উচিত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসার ওপর।

জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে হবে। পরীক্ষা থেকে কেউ যেন বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। কী করে পরীক্ষা বাড়ানো যাবে, তা নিয়ে অধিদপ্তরের সভা–পরামর্শ করা উচিত। যথাযথ পরীক্ষা না হলে মহামারির সঠিক চিত্র পাওয়া যাবে না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ও একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করোনার রোগী জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সব হাসপাতালে পর্যাপ্ত অক্সিজেনের সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। সূত্র বলছে, ৩০ মে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দ্রুততম সময়ে (১৫ জুনের মধ্যে) হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা (দ্রুত বেশি পরিমাণ অক্সিজেন সরবরাহের প্রযুক্তি) কেনার কথা বলা হয়েছিল। গতকাল পর্যন্ত তা কেনা হয়নি। কেন কেনা হয়নি, তা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন মহাপরিচালককে খতিয়ে দেখতে অনুরোধ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তবে জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলছেন, ‘১০০ শতাংশ মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। এ নিয়ে আবারও ব্যাপক প্রচারণা চালানো দরকার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাস্ক না পরে ঘরের বাইরে আসা দু–একজনকে শাস্তি দিলে কাজ হবে বলে আশা করা যায়।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন