খন্দকার আল মঈন বলেন, করোনাকালে সরকার নির্ধারিত হাসপাতালে নির্দিষ্ট ফি জমা দিয়ে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনার নমুনা পরীক্ষা করানোর আদেশ জারি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশগামী যাত্রীরা সরকার নির্ধারিত হাসপাতালে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে করোনা পরীক্ষা করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিদেশগামী ব্যক্তিদের টার্গেট করে তাঁদের করোনা পরীক্ষার ফল পজিটিভ হয়েছে জানিয়ে নেগেটিভ সনদ দেওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। কিছু ভুক্তভোগী প্রতারক চক্রকে টাকা দেওয়ার পরও করোনার ফল পজিটিভ আসায় তাঁদের সন্দেহ হয়। পরে তাঁরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুঝতে পারেন তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

র‌্যাবের পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, বিদেশগামী যাত্রীরা বিভিন্ন হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ, সিভিল সার্জন অফিস ও র‌্যাবের কাছে এ ধরনের প্রতারণার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করেন। এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রতারকদের আইনের আওতায় আনতে র‌্যাব তৎপর হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার রাতে র‌্যাব-১১-এর একাধিক দল প্রথমে কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালি এলাকায় প্রতারক জসিম উদ্দিন (২২) ও মো. সুলতান মিয়াকে (১৯) আটক করে। তাঁদের তথ্যের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, রাজধানী সায়েদাবাদ, রমনা ও মতিঝিল এলাকা থেকে বেলাল হোসেন (৩১), আবুল হোসেন (২৪), আবদুল নুর (২১), আলফাজ মিয়া (১৯), মো. শামিম (৩২) ও আহাম্মদ হোসেনকে (১৯) আাটক করে। তাঁদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে মুঠোফোনের সিমের জোগানদাতা ইমরান উদ্দিন ওরফে মিলনকে (১৯) নোয়াখালী থেকে আটক করা হয়। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অভিযান চালিয়ে চক্রের অন্যতম হোতা সবুজ মিয়া (২৭), আব্দুর রসিদ (২৮), আবদুল করিম চৌধুরী (৩২), আঙুর মিয়া (২৫) ও আলমগীরকে হোসেনকে (২০) আটক করে র‌্যাব।

আটক হওয়া প্রতারকদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব জানায়, প্রতারক চক্রের সদস্যরা কেউ প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পার হয়নি। তবু তাঁরা নিখুঁতভাবে সুকৌশলে শত শত মোবাইল সিম নামে-বেনামে তুলে প্রতারণা করে আসছিলেন। জিজ্ঞাসাবাদে চক্রের অন্যতম হোতা কাজী বেলাল হোসেন বলেছেন, এই অভিনব প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৬ শতাধিক বিদেশগামী যাত্রীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০-১৫ হাজার টাকা করে করে তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। চক্রের হোতা সবুজ মিয়া জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, গত ১০ মাসে তিনি সহস্রাধিক বিদেশগামী যাত্রীর প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০-১৫ হাজার করে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যরাও প্রতারণার মাধ্যমে প্রত্যেক মাসে ২৫-৩০ হাজার টাকা আয় করতেন বলে জানান তাঁরা।

চক্রের মূল হোতা বেলাল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাবকে বলেন, তিনি গত বছরের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে কুমিল্লা জেলার একটি হাসপাতালে করোনা টেস্ট করার পর অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ওই হাসপাতালের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে তাঁর করোনা টেস্টের ফলাফল পজিটিভ এসেছে বলে জানায়। ওই ব্যক্তি দশ হাজার টাকায় বেলালের করোনা টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ করার প্রতিশ্রুতি দিলে তিনি তাঁকে মুঠোফোন নম্বরে দশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মুঠোফোনে খুদে বার্তায় তাঁর করোনা ফল পজিটিভ বলে জানায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এক মাস পর গত এপ্রিলে করোনার ফল নেগেটিভ হলে বেলাল ওমানে চলে যান। কিন্তু প্রতারণার এই কৌশল তিনি রপ্ত করে তাঁর বন্ধু সবুজকে নিয়ে প্রতারক চক্র গড়ে তোলেন। ওই বছর আগস্টে বেলাল ওমান থেকে দেশে ফেরেন। মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর ভিসা সচল রাখতে তিনি সেখান থেকে দেশে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকেন এবং তাঁর চক্র প্রতারণা চালিয়ে যায়।

default-image

র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তার আবুল হোসেন নারায়ণগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, আবদুর নূর নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলায়, আহাম্মেদ হোসেন চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে আবদুর রসিদ রাজধানী ও নারায়ণগঞ্জ, আবদুর করিম কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা জেলায়; আলমগীর সিলেট, মৌলভি বাজার এবং হবিগঞ্জ জেলায়; আঙুর মিয়া কুমিল্লা, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ জেলায় সরকার নির্ধারিত বিদেশগামীদের করোনা পরীক্ষা করা হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত বিদেশগামী যাত্রী ছদ্মবেশে অবস্থান করতেন। তাঁরা কৌশলে সাধারণ যাত্রীদের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে নিতেন। ওই মুঠোফোন নম্বর চক্রের হোতা বেলাল ও সবুজকে দিতেন। বিদেশগামী যাত্রীরা তাঁদের করোনার ফল হাতে পাওয়ার আগে বেলাল ও সবুজ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের করোনা বিভাগের চিকিৎসক-হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীদের পরীক্ষার ফল পজিটিভের মিথ্যা তথ্য দিতেন।

পরে প্রতারকেরা করোনার ফল নেগেটিভ করে দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঁচ থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিতেন। ভুক্তভোগীরা চক্রের হোতা বেলাল ও সবুজের দেওয়া মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠালে চক্রের হোতা আলফাজ, জসিম, শামিম ও সুলতান সশরীরে উপস্থিত থেকে তা সংগ্রহ করতেন।

র‌্যাবের পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, আটক প্রতারকেরা একটি সিমকার্ড একদিন ব্যবহার করে তা কিছুদিন বন্ধ রেখে আবার চালু করতেন। কোনো নম্বর নিয়ে সন্দেহ হলে তা ফেলে দিতেন তাঁরা। প্রতারণার এই পদ্ধতিটি সম্পন্ন করতে চক্রের সদস্য মিলন ১২০ টাকার সিম বেলাল ও সবুজের কাছে এক হাজার টাকা করে বিক্রি করে সেগুলোর ভুয়া নিবন্ধন করে দিতেন। এই কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে আটককৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন