default-image

করোনা পরিস্থিতিতে তিন মাস ধরেই চরম সংকটে দিন কাটছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার যমুনা নদীর দুর্গম চরের মানুষের। হাতে কাজ নেই। রোজগার নেই। ঘরে খাবার মজুত নেই। কোনোরকমে অর্ধাহারে দিন কাটছে তাদের।

এখন করোনার কষ্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যা। ১১ দিন ধরে জলমগ্ন তাদের বসতঘর। যমুনার ভাঙনে বিলীন অনেকের বাড়িঘর। বাড়ি ও চাষাবাদের জমি হারিয়ে নিঃস্ব চরের হাজারো মানুষ। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন চরের জেলে, দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষেরা। বসতঘর ডুবে যাওয়ায় নৌকায়, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা। শিশুদের ও গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপদে পড়েছেন চরবাসী।

এক সপ্তাহ ধরে যমুনা নদীর দুর্গম ৩৮টি চরের মধ্যে অন্তত ১৫টি চর ঘুরে মানুষের দুর্ভোগ কষ্টের এমন চিত্র দেখা গেছে। চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের ফাজিলপুর, আউচারপাড়া, শিমুলতাইড়, কাকলিহাটা, হাটবাড়ী, বিয়ামের পাঁচগাছী, দলিকা, মানিকদাইড়, চালুয়াবাড়ী, সুজালীপাড়া, বহুলাডাঙ্গা, খাটিয়া মারিসহ ইউনিয়নের ১৫টি চরে এ দুরবস্থা।

হাটবাড়ি চরের সহায়–সম্বলহীন নজরুল ইসলামের যমুনায় মাছ ধরে সংসার চলে। ১১ দিন ধরে পানিবন্দী নজরুল তাঁর স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়ে নিয়ে ডিঙি নৌকায় রাত কাটাচ্ছেন। নজরুল বলেন, ‘লদীত মাছ ধরা খাই। মাছ না জুটলে বউ-ছলের মুখত ভাত জোটে না। ভাইরাসের ভয়ে তিন মাস ধরে গঞ্জত যাতায়াত বন্ধ। লদীত মাছ ধরবারও যাবারও পারি না। হাতত কাম নাই। ঘরত ভাত নাই। ছলপল লিয়্যা খুব কষ্টে আচি।’

default-image

দশ দিন ধরে জলে ভাসছেন দলিকার চরের বানভাসি দিনমজুর লাল মিয়া। তাঁর বসতঘরে পানি। তিনি বলেন, ‘তিনডা মাস খুব কষ্টে আচি। হাতত কাজ নাই। কামাই নাই। খাবারের কষ্ট। কামলা জোটে না। ২ বিঘা জমি বর্গা লিয়ে পাট আবাদ করিচুনু, বানত স্যাকনাও শ্যাষ। সংসারত চারজন মানুষ। ঘরত মিচ্চি অ্যানা চাল আচে। নুন–তেল কিনবার মতো হাতত টেকা নাই। চরত ইংকা কষ্ট সহ্য করবার পারিচ্চি না।’

দিনমজুর শাজাহানের স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, ‘বানভাসা এই চরে সগলির ঘরত অভাব-কষ্ট। কামলাগেরে দিন যাবি ক্যামনে?’

চরের কৃষক কবির মোল্লা বলেন, ‘এই চরে কয়েক হাজার গরু-ঘোড়া। খড় নাই। ঘাসও যমুনার পানিতে ডুবে গেছে। লতা-পাতা সব পচে শেষ। মানুষই খেতে পারছে না। গরু-ঘোড়ার বাঁচবে কেমনে?’

খাটিয়ামারি চরের দিনমজুর জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘তিন মাস ধরে চরত কাম নাই। ধারদেনা করে সংসার চলিচ্চে। সংসারত পাঁচডা সদস্য। খাবার জোগাড় করা তো লাগবি। আধি লেওয়া ছয় বিঘা জমিনত পাট বুনচিনো। খ্যাত বানের জলত ডুবে গেচে। কী খামো, কী করমো কোন দিআ পাচ্চি না।’

তিন মাস ধরে কর্মহীন চরের দিনমজুর ছামিউল। তাঁর স্ত্রী রিক্তা বেগম বলেন, ‘দ্যাশত করোনা চলিচ্চে। করোনাত হামাকেরে খুব কষ্ট হচ্চে। করোনা না যাতেই আবার বানের ঢল। হামরা বাঁচমো কী খ্যায়া?’

default-image

জানতে চাইলে বগুড়ার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবর রহমান বলেন, যমুনা নদীর সারিয়াকান্দির মথুরাপাড়া পয়েন্টে বিপৎসীমা ধরা হয় ১৬ দশমিক ৭০ সেন্টিমিটার। গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় সেখানে ১৭ দশমিক ১৭ সেন্টিমিটার অর্থাৎ বিপৎসীমার ৪৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। তবে ২৪ ঘণ্টায় ১৩ সেন্টিমিটার পানি কমেছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাসেল মিয়া জানান, যমুনায় পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৬৮টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা ১২ হাজার ৪০০। দুর্গত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে প্রায় ৮০০। এ পর্যন্ত দুর্গতদের জন্য ৩৩ দশমিক ৫ মেট্রিক টন চাল ও আড়াই লাখ টাকা ত্রাণ বরাদ্দ মিলেছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজহার আলী বলেন, যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার ৯৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। দুর্গত এলাকার ১৮ হাজার ৮৭২ পরিবারের ৭৬ হাজার ৬২০ জন মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে ৮ হাজার ৭৫৪ হেক্টর জমির ফসল। এখন পর্যন্ত দুর্গত এলাকায় ৬০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকার ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0