default-image

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরিজীবী। মে মাসের মাঝামাঝি স্ত্রীর করোনা শনাক্ত হওয়ার পর রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করানো হয়। একপর্যায়ে স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে পড়ে। সংক্রমণের ভয়ে স্বামী এক দিনের জন্যও স্ত্রীকে দেখতে হাসপাতালে যেতে পারেননি। উদ্বিগ্ন স্বামী বাসাতেই থাকতেন। একসময় স্বামীর করোনা শনাক্ত হয়। হাসপাতালে স্ত্রী বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দুজন করোনামুক্ত হলেও পরিবারটির বিপর্যয় কাটেনি। আত্মীয়রা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন কি না, তা বুঝে উঠতে পারছেন না।

মানসিক বিপর্যয় শুধু এই দম্পতির ক্ষেত্রে দেখা গেছে তা নয়। চিকিৎসক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, বিচারক, রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহিণী, ছাত্র-শিক্ষক সব পেশা-শ্রেণির মানুষের ওপর গভীর মানসিক চাপ তৈরি করেছে মহামারি। গণমাধ্যমে এসেছে, সন্তানের আক্রান্তের খবরে মানসিক চাপে হঠাৎই বাবার মৃত্যু হয়েছে নারায়ণগঞ্জে। গণমাধ্যমে প্রচার পেলেও এমন ঘটনা কমাতে সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে, তা জানা যাচ্ছে না। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে হয়তো দুই লাখ মানুষ। কিন্তু সারা দেশের মানুষ মানসিক চাপে আছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, ‘মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মহামারির প্রভাব ইতিমধ্যে মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকা, সংক্রমণভীতি, পরিবারের সদস্য হারানোর দুঃখ-কষ্ট—এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উপার্জন ও চাকরি হারানোর ভয়।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মহামারির আগের অবস্থার তুলনায় এপ্রিলে দেখা গেছে ইথিওপিয়ার মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা তিন গুণ বেড়েছে। কানাডায় ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মদ্য পান বেড়েছে ২০ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারীদের ৩২ শতাংশ জানিয়েছে মহামারি মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি খারাপ করেছে। ইতালি ও স্পেনে শিশু ও কিশোরদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে।

দেশের পরিস্থিতি

দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার তুলনায় চিকিৎসার আয়োজন ও চিকিৎসক কম। মহামারির কারণে মানসিক চিকিৎসাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে মহামারি শুরুর আগে দৈনিক গড়ে ৩০০ রোগী চিকিৎসার জন্য আসতেন। এখন তা অর্ধেকের কম বলে জানিয়েছে ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও একই প্রতিষ্ঠানের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ও তাঁর সহকর্মীদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও রোগী কম আসছে।

একদিকে মানসিক রোগীরা সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকছে, অন্যদিকে করোনা নতুন মানসিক সমস্যা তৈরি করছে। তবে এ নিয়ে একাধিক গবেষণা শুরু হলেও তার চূড়ান্ত ফলাফল এখনো প্রকাশ পায়নি। এ রকম একাধিক গবেষণার প্রাথমিক ফলাফলের উদ্ধৃতি দিয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার প্রথম আলোকে বলেন, শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে করা অনলাইন জরিপে দেখা গেছে, করোনার কারণে ৪০ শতাংশ মানুষ মানসিক চাপে আছে। এই চাপের কারণে মেজাজ ঠিক থাকে না, উদ্বেগ বাড়ে, বিষণ্নতা বাড়ে, খাওয়ায় রুচি থাকে না, কাজে মনোযোগ থাকে না।

>

আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে প্রায় দুই লাখ। করোনা মানসিক চাপ ফেলেছে সারা দেশের মানুষের ওপর। অনেকে এই চাপে বিপর্যস্ত।

মনোরোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার প্রভাব বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর ভিন্ন ভিন্নভাবে পড়ছে। বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, ‘যার ভাতের সংস্থান আছে তিনি হয়তো করোনার কারণে ঘুম না হওয়ার দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। যার দারিদ্র্য বেড়েছে তিনি ভাতের চিন্তায় পড়েছেন।’

মহামারি শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষকে নতুন বাস্তবতা, নতুন মানসিক সংকটের মধ্যে ফেলেছে। এই বাস্তবতায় অফিসের কাজ করতে হচ্ছে ঘরে বসে। শিশুরা স্কুল করছে বাড়িতে। পরিবার সদস্য, প্রিয়জন, বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে শারীরিকভাবে মেলামেশা করা থেকে মানুষ দূরে থাকছে সংক্রমণের ভয়ে। এই ভয় দূর করে নতুন ব্যবস্থায় সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে না পেরে অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছেন বলে ধারণা করছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা।

গণমাধ্যমে এসেছে, চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ভান্ডারগাঁও গ্রামের মুকুন্দ বড়ুয়া ৩০ জুন রাতে কিশোরী দুই মেয়েকে মেরে ভোরে নিজে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন। এক দিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনি মারা যান। বিপত্নীক মুকুন্দ বড়ুয়া খুলনার একটি লাইটার জাহাজে বাবুর্চির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। মার্চে লকডাউন শুরু হলে তিনি খুলনা থেকে চট্টগ্রাম চলে যান। চাকরি চলে যাওয়ার কারণে এটি ঘটেছে বলে আত্মীয়দের ধারণা।

অন্যদিকে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার বলেন, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি সরাসরি মানসিক চাপে পড়ছেন, আক্রান্ত ব্যক্তির কাছের মানুষও মানসিক চাপে পড়ছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের যাঁরা চিকিৎসা দিচ্ছেন, তাঁদের ওপরও চাপ কম নয়।

জেনেশুনে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসতে হচ্ছে চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্টসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৫৪৪ জন সংক্রমিত হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসক ১ হাজার ৯৪৬ জন, নার্স ১ হাজার ৫০২ জন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ২ হাজার ৯৬ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৮০ জনের।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের একজন নারী চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘কখন কীভাবে সংক্রমণ ঘটছে, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। পিপিই (ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী) পরা থাকলেও সারাক্ষণ সংক্রমণের ভয়ে থাকি। আমার মাধ্যমে বাসায় বাচ্চারাও আক্রান্ত হয় কি না, সেই ভয়ে থাকি। ২৪ ঘণ্টা যেন মাথা ধরা অবস্থায় থাকে।’

মহামারি মোকাবিলার সামনের সারির কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির তথ্য দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাতে দেখা যাচ্ছে, চীনে করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত থাকা স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে ৫০ শতাংশ বিষণ্নতার রোগে, ৪৫ শতাংশ উদ্বেগজনিত রোগে এবং ৩৪ শতাংশ ঘুম না আসার সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। আর কানাডার স্বাস্থ্যকর্মীদের ৪৭ শতাংশের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজন হয়েছে।

পদক্ষেপ জরুরি

মহামারির মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাটিও বৈশ্বিক। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তনিও গুতেরেস তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এগুলো হচ্ছে: মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা, উন্নতি ও যত্নে গোটা সমাজকে যুক্ত করতে হবে; মানসিক স্বাস্থ্যের জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে; করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে নীতিগত পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দেশিকাও তৈরি করেছে। এই সময়ে শিশু মনের যত্ন মা-বাবা কীভাবে নেবেন বা মানসিক স্বাস্থ্যসংকটে ভোগা মানুষ কী করবেন, তার নির্দেশনা তারা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত মাসের ২৭ তারিখে এ বিষয়ে ১১ সদস্যের একটি কমিটি করেছে। কমিটি সূত্র জানায়, তারা গতকাল রোববার পর্যন্ত আটটি সভা করেছে। কমিটি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির খতিয়ান তৈরি করেছে, পজিটিভ রোগীদের রিপোর্ট দেওয়ার সময় মুঠোফোনে কাউন্সেলিং করার সিদ্ধান্ত হয়েছে, চিকিৎসকদের জন্য নির্দেশিকা তৈরির কাজ চলছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের সভাপতি ও করোনাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে সৃষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বাস্তব পরিস্থিতি জানতে দ্রুত একটি গবেষণা হওয়া দরকার। এ ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গণমাধ্যমে প্রচার চালানোর পাশাপাশি পেশাজীবীদের নিয়ে একটি মঞ্চ গড়ে তোলা দরকার। এই মঞ্চ থেকে টেলিফোনের মাধ্যমে যেন বিনা মূল্যে ২৪ ঘণ্টা সেবা পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন