বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

চিকিৎসকদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘প্ল্যাটফর্ম অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল সোসাইটি’ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক্তন-বর্তমান শিক্ষার্থীদের দাতব্য সংগঠন ‘অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনাল’ মিলে চিকিৎসাসেবার এই উদ্যোগ নেয়। উদ্যোক্তাদের দাবি, দেশের ইতিহাসে এই প্রথম চিকিৎসক ও প্রকৌশলীরা মিলে এ ধরনের কোনো সেবা দিচ্ছেন।

সাড়া-এর সমন্বয়ক চিকিৎসক ফয়সাল বিন সালেহ জানান, স্বাভাবিক সময়ে দিনে রোগীদের কাছ থেকে ৬০ থেকে ৭০টি ফোন আসে। তবে কোভিডের ঢেউগুলোর সময় এসব ফোনের সংখ্যা ছিল গড়ে ১০০। এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ ১৪২ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

বর্তমানে সাতজন চিকিৎসক নিয়মিত রোগীদের সেবা দিচ্ছেন। সংখ্যাটা শুরুতে ছিল ১২। কোভিডের ঢেউ কমে আসায় চিকিৎসকদের সংখ্যা কিছুটা কমানো হয়েছে।
দেশে-বিদেশে যেকোনো স্থান থেকে ‘সাড়া’-এর হটলাইন নম্বর ০৯৬১২৩০০৯০০-এ ফোন করে ২৪ ঘণ্টাই বিনা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে এই চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা।

চিকিৎসক ফয়সাল বিন সালেহ বলেন, রোগীদের ফোন এলে কেটে দেওয়া হয়। পরে রোগীর নম্বরে ফোন করা হয়। রোগের বর্ণনা শুনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে ব্যবস্থাপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বেশি অসুস্থ রোগীদের পরে আবার ফোন করে খোঁজখবর নেওয়া হয়।

এই চিকিৎসক জানান, সাধারণত স্ত্রীরোগ, সাধারণ জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা—এ ধরনের সমস্যা নিয়ে রোগীদের ফোন এসে থাকে। এর বাইরে শিশুরোগ নিয়েও ফোন করা হয়। রোগীর অবস্থা খুব বেশি গুরুতর না হলে ‘সাড়া’র চিকিৎসকেরা চিকিৎসা করেন। অন্যথায় হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

রোগীদের ৬০ থেকে ৬২ শতাংশ নারী বলে জানায় সাড়া। কিশোর থেকে মধ্যবয়সী রোগীরা বেশি ফোন করেন। আর সবচেয়ে কম ফোন আসে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা—এই টেলিমেডিসিন সেবার একটি অংশ। এখন পর্যন্ত ৫০০ জনের মতো ব্যক্তিকে মানসিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

সাড়া-এর সমন্বয়ক ফয়সাল বিন সালেহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আত্মহত্যার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মাঝে বেশি। সেই জায়গা থেকে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শ দিই। অনেক তরুণ ফোন দেয়। তাদের উৎসাহিত করি। প্রয়োজন হলে তাদের আরও উদ্বুদ্ধ করি দেশের আড়াই শর মতো মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে।’

সাড়া-তে ‘উচ্চ প্রযুক্তির’ ব্যবহার

উন্নত দেশগুলোর মতো দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায়ও উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটানোর পক্ষে ‘সাড়া’-এর উদ্যোক্তারা। এ লক্ষ্যে রোগীদের সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত (ডেটা) সংগ্রহ করতে চায় তারা।

অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শায়েস্তাগীর চৌধুরী বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইন্টেল করপোরেশনের প্রিন্সিপাল ইঞ্জিনিয়ারের দায়িত্বে আছেন। বুয়েটের প্রাক্তন এই ছাত্রও ‘সাড়া’- উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শায়েস্তাগীর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সাড়া টেলিমেডিসিনের রোগীদের ও রোগের ডেটাগুলো (উপাত্ত) একটা ডেটা সেন্টারে জমা রাখা হচ্ছে মাইক্রোসফট এক্সেল শিটে। কোন এলাকায় কোন ধরনের রোগী বেশি, কোন বয়সীদের মধ্যে বেশি, কোনো রোগ বিশেষ কোন এলাকায় কেন হচ্ছে, কাকে কখন ও কী ওষুধ দেওয়া হলো—প্রতিটি বিষয় বিস্তারিত আকারে জমা আছে।

রোগীর বয়স, লিঙ্গ, এলাকা–সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে ভবিষ্যতে দেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি আনা সম্ভব বলে মনে করেন শায়েস্তাগীর চৌধুরী। তিনি জানান, আমেরিকায় অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হচ্ছে, ‘সাড়া’-এর মাধ্যমে তাঁরাও সেদিকে এগোনোর চেষ্টা করছেন।
শায়েস্তাগীর চৌধুরী জানান, তাঁরা প্রথমে যে সফটওয়্যার ব্যবহার করছিলেন, তাতে ডেটাবেইসের বিষয়টিই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। বর্তমানে সেখানে আরও উন্নত প্রযুক্তির সংযোগ ঘটেছে। সাড়ার ক্লাউড (অনলাইনে তথ্য জমা রাখার স্থান) করা হচ্ছে, এখানে রাখা তথ্য চিকিৎসকেরা সরাসরি দেখতে পারবেন। বুয়েটের একটা দল সফটওয়্যার উন্নয়নের কাজটা করছে।

প্রকৌশলী শায়েস্তাগীর চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের (পরীক্ষাগার) মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই। উন্নত বিশ্বে রোগীর পরীক্ষার ফলাফল ক্লাউডে রেখে দেওয়া হয়, যেখানে শুধু নির্দিষ্ট চিকিৎসক ও রোগীর প্রবেশাধিকার থাকে। সাড়াতেও তেমন হবে। তবে বাংলাদেশে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে যেহেতু এমন সুবিধা নেই, তাই রোগীরাই পরীক্ষার ফলাফলের ছবি তুলে ই–মেইল করবে। সম্ভব না হলে দেশের বিভিন্ন অংশের স্বেচ্ছাসেবীরা সেগুলোর ছবি তুলে তা ক্লাউডে পাঠাবেন। তা দেখেই চিকিৎসকেরা রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেবেন।’

এভাবে সাড়ার পক্ষে কত রোগীর পরীক্ষার ফলাফল সংগ্রহ সম্ভব—এমন প্রশ্নের জবাবে শায়েস্তাগীর চৌধুরী বলেন, এই পদ্ধতিটা দেশে পরিচিত করানোটা তাদের বড় উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতে ডিজিটাল বাংলাদেশে কাজে লাগবে। তাই কাজটা করে রাখছেন।
এ ছাড়া সফটওয়্যারে ভিডিও কলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা চিকিৎসায় আরও নতুন মাত্রা যোগ করবে।

অঙ্কুর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শায়েস্তাগীর চৌধুরী বলেন, ‘ধনীরাও চাইলে এ সেবা নিতে পারেন। তবে গার্মেন্টশিল্প ও চা–বাগানের শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রমিক, পার্বত্য এলাকার চিকিৎসা সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে এ চিকিৎসাসেবা আরও পৌঁছে দিতে চাই। যাঁরা ফার্মেসির হাতুড়ে চিকিৎসকদের হাতে মারা যান, তাঁদের চিকিৎসা দিতে চাই।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন