দেশে করোনা সংক্রমণ

করোনায় মৃত্যু কমছে না

করোনাভাইরাসের  প্রতীকী ছবি
করোনাভাইরাসের প্রতীকী ছবি
বিজ্ঞাপন

দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মাঝে কিছুদিন মৃত্যু কমতির দিকে ছিল। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দৈনিক মৃত্যু আবার বাড়তির দিকে। এই অবস্থায় গতকাল মঙ্গলবার সংক্রমণ শনাক্তের ১৭১ তম দিনে করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় তিন লাখ মানুষ।


কোনো দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, তা বোঝার জন্য কিছু নির্দেশক নির্ধারণ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তার একটি হলো টানা তিন সপ্তাহ ধরে মৃত্যু কমতে থাকা। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন রোগী কমলেও মৃত্যু সেভাবে কমছে না। মূলত সংক্রমণ শনাক্তের পরীক্ষা কমায় নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যা কমছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কথা জানানো হয়। কোভিড-১৯-এ প্রথম মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয় এর ১০ দিনের মাথায় ১৮ মার্চ। শুরুর দিকে সংক্রমণ এবং মৃত্যু দুটোই কম ছিল। ক্রমে সেটি বেড়েছে।


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে মৃত্যুর হার এখনো কম। কিন্তু তাতে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ নেই। গা ছাড়া ভাব দেখালে যেকোনো সময় এটা আরও বেড়ে যেতে পারে।


মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সংক্রমণ পরিস্থিতি দ্রুত খারাপের দিকে যেতে শুরু করে। জুনে তা তীব্র আকার নেয়। এমন প্রেক্ষাপটে জুলাইয়ের শুরু থেকে সরকারের তরফে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপে সংক্রমণ শনাক্তের পরীক্ষার সংখ্যা কমে যায়। এতে নতুন রোগী শনাক্তের সংখ্যাও কমে আসে। কিন্তু মৃত্যু টানা কমতে দেখা যায়নি। মাঝে দৈনিক মৃত্যুর গড় ৪০-এর নিচে নামলেও বেশ কিছুদিন ধরে সেটা আবার ৪০-এর ওপরে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেশে এখন করোনা সংক্রমণের ২৫তম সপ্তাহ চলছে। সপ্তাহওয়ারি মৃত্যুর হিসাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সংক্রমণের ২০ তম সপ্তাহে (১৯-২৫ জুলাই) দৈনিক গড় মৃত্যু ছিল প্রায় ৪২। পরের টানা দুই সপ্তাহ সেটা কমতির দিকে ছিল। ২২ তম সপ্তাহে মৃত্যুর দৈনিক গড় নেমেছিল ৩৩-এ। কিন্তু এই নিম্নগতি স্থায়ী হয়নি। ২৩ তম সপ্তাহ (৯-১৫ আগস্ট) থেকে সেটা আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা গেছে। ওই সপ্তাহে মৃত্যুর দৈনিক গড় ৩৭। পরের সপ্তাহে সেটা আরও বেড়ে হয় ৪০। গতকাল পর্যন্ত সপ্তাহের প্রথম তিন দিনের হিসাবে দৈনিক মৃত্যুর গড় ৪০-এর বেশি।


সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরামর্শক মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা আক্রান্ত, তাঁদের শতভাগের নিয়মিত ফলোআপ করা যাচ্ছে না। নিয়মিত ফলোআপের মধ্যে রাখা গেলে কখন পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে, তা বুঝে চিকিৎসক হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। এতে মৃত্যু কমানো সম্ভব। এপ্রিল পর্যন্ত এটি হয়েছে। এই ফলোআপ জোরদার করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৪০২৮ জনের মৃত্যু, বাড়ছে মৃত্যুহার
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনায় আক্রান্ত আরও ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট ৪ হাজার ২৮ জনের মৃত্যু হলো। গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৫৪৫ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে মোট ২ লাখ ৯৯ হাজার ৬২৮ জনের দেহে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।


গতকাল পর্যন্ত দেশে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্তের সংখ্যার বিবেচনায় করোনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে থাকা দেশগুলোর তুলনায় এই হার কম। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের দেশ ভারত, পাকিস্তানেও মৃত্যুর হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। ভারতে ১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ২ দশমিক ১ শতাংশ।


দেশে মৃত্যুর হার কম হলেও ধীর গতিতে এই হার বাড়ছে। গত ৫ জুলাই দেশে করোনায় মোট মৃত্যু দুই হাজার ছাড়িয়েছিল। সেদিন পর্যন্ত করোনায় মৃত্যুর হার ছিল ১ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২৮ জুলাই তিন হাজার মৃত্যু পূর্ণ হওয়ার দিনে মৃত্যুর হার বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৩১ শতাংশে। আর গতকাল সেটা আরও বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অবশ্য দেশে সরকারিভাবে যেসব মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হচ্ছে, তার বাইরে প্রায় প্রতিদিন করোনার উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের হিসাবে, ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ১১০ জনের এমন মৃত্যু হয়েছে।


বৈশ্বিক চিত্র থেকে দেখা যায়, করোনায় তুলনামূলক বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ইউরোপের দেশগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতেও মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় এখন সংক্রমণ বেশি হলেও ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় মৃত্যুর হার কম।


যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিনস বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২৯ তম। তবে নতুন মৃত্যুর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও ওপরে। বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের তথ্য নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট আওয়ার ওয়ার্ল্ড ইন ডেটার হিসাবে, গত তিন দিনের গড় মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১৫তম।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মৃতদের বেশির ভাগ ষাটের নিচে
গত বছরের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। পরে সেটা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। চীনে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীনের একটি যৌথ মিশন গত ২৮ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, ষাটোর্ধ্ব এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসারে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। চীনে মারা যাওয়াদের ৮০ শতাংশের বয়স ছিল ষাটের ওপরে।


বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই দেখা যাচ্ছে, করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে বয়স্ক বিশেষত ষাটোর্ধ্ব এবং একই সঙ্গে অন্য রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশেও মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশ ষাটোর্ধ্ব। কিন্তু চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে কম বয়সী মানুষের মৃত্যু বেশি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫১ শতাংশের বয়স ৬০ বছরের কম।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাসায়ও মৃত্যু হচ্ছে
সাধারণত করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের বেশির ভাগেরই লক্ষণ উপসর্গ মৃদু। তাঁদের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় না। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের বাইরে বাড়িতেও অনেক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত এক সপ্তাহে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬ শতাংশের বেশি ছিল বাসায়। এর অর্থ পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ার পরও অনেকে হাসপাতালে যাচ্ছেন না।


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামানো সম্ভব। এ জন্য সংক্রমণ প্রতিরোধের উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু যেভাবে চলছে, শুধু কিছু পরীক্ষা করা হচ্ছে, আক্রান্তদের সেভাবে আইসোলেশন (বিচ্ছিন্ন রাখা), রোগীর সংস্পর্শে আসাদের কোয়ারেন্টিন (সঙ্গনিরোধ) করা, রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা—এসব হচ্ছে না। এগুলো নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা উচিত। গা ছাড়া ভাব দেখালে মৃত্যু হঠাৎ করে বেড়ে যেতে পারে। ভারতে এমনটা দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন