default-image

করোনাকালে গ্রাম ও শহরের ৪৮ শতাংশের বেশি পরিবারের অন্তত একজন কাজ হারিয়েছেন বা কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। শহরে এ হার ৪৬ শতাংশ। গ্রামে আরও বেশি, প্রায় ৫১ শতাংশ। শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষ আর্থিক সংকটে বেশি পড়েছেন। এ হার শহরে ৭৩ এবং গ্রামে প্রায় ৯৩ শতাংশ। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীরা বেশি অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। সেই সঙ্গে গৃহস্থালি কাজে নারীর মজুরিবিহীন অংশগ্রহণ আগের চেয়ে অনেক বেশি বেড়েছে।

শনিবার সকালে এক ওয়েবিনারে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রকাশিত ‘করোনাকালে সংসারের কাজের দ্রুত বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক জরিপ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। নয় জেলায় স্থানীয় সহযোগী এনজিওগুলোর মাধ্যমে ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫০ জন নারী-পুরুষের ওপর জরিপটি করা হয়। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশই নারী।

পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ফোরাম ‘ফরমাল রিকগনিশন অব দ্য উইমেনস আনঅ্যাকাউনটেড ওয়ার্ক’-এর উদ্যোগে জরিপটি পরিচালনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শারমিন্দ নিলোর্মি। এই ফোরামের সদস্য সংস্থাগুলো হচ্ছে একশনএইড বাংলাদেশ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ, অক্সফাম ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

গত বছরের নভেম্বর থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপের তথ্য উপস্থাপন করে শারমিন্দ নিলোর্মি বলেন, করোনাকালে দারিদ্র্যের গভীরতা অনেক বেড়েছে। সন্তানের পড়াশোনাসহ স্বামী, সন্তান, বয়স্ক ব্যক্তি সবার যত্ন নেওয়ার চাপ নারীর ওপর অনেক বেড়েছে। শহরের ক্ষেত্রে প্রায় ৫৪ শতাংশ নারী ৬ ঘণ্টা বা এর বেশি সময় সংসারের কাজ করছেন। গ্রামে এ হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

করেনাকালের আগে এই পরিমাণ সংসারের কাজ করা নারীর সংখ্যা ১০ শতাংশ কম ছিল। শহরের নারীদের মধ্যে পরিবারের লোকদের যত্ন নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাচ্ছে স্বামী, ২৯ শতাংশ; এরপরই সন্তান, প্রায় ২৩ শতাংশ। গ্রামের নারীদের কাছে অগ্রাধিকার পেয়েছে রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ধোয়ার কাজ।

জরিপ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রায় ৮৩ শতাংশ জানিয়েছেন, করোনা মহামারি তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছে। শহরের প্রায় ২৮ শতাংশ নারী বলেছেন, শিশুদের পড়াশোনার সঙ্গে তাঁদের আর কোনো সম্পর্ক নেই। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, গ্রামে অভিভাবক ও শিশুদের মধ্যে পড়াশোনা নিয়ে কোনো কার্যক্রম নেই। কন্যাশিশুর পড়াশোনা বন্ধ মানেই বাল্যবিবাহের হার বেড়ে যাওয়া এবং পরিবার ও সমাজে নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, নারীর মজুরিবিহীন যেসব কাজ অবমূল্যায়িত থেকে যাচ্ছে, সেগুলো জাতীয় হিসাব পদ্ধতির ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে আসছে অর্থবছরেই। প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় নারীর কাজেরও পর্যবেক্ষণ মূল্য বের করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইউএন উইমেনের এ দেশীয় প্রতিনিধি সোকো ইশিকাওয়া বলেন, করোনাকালে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও সংসারের মজুরিবিহীন কাজ বাড়ছে। এ বিষয়গুলোতে নজর দিতে হবে। নারীরা কাজ হারাচ্ছেন, তাই অর্থসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

জরিপের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এ সময়ে নারীর জন্য প্রণোদনা ও ঋণসহায়তা বাড়ানো উচিত। সরকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল, তা নারীদের কথা মাথায় রেখে করা হয়নি। নারী উদ্যোক্তাদের ৯৩ শতাংশই আবেদন করেননি। ঋণের শর্তগুলো আরও সহজ হওয়া প্রয়োজন।

default-image

একশনএইড বাংলাদেশের এ দেশীয় পরিচালক ফারাহ কবীর বলেন, যে নারীরা বাসায় কাজ করেন তাঁদের কাজগুলোর কোনো স্বীকৃতি নেই। নারীর পরিবারের সদস্যরা তাঁর পরিচয় দেন, ‘তিনি কিছু করেন না, বাড়িতে থাকেন’। নারীর এসব কাজের স্বীকৃতির জন্য পুরুষদেরও সচেতন হতে হবে।

অর্থ বিভাগের উপসচিব মেহেদী মাসুদুজ্জামান বলেন, জরিপ প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য জেনে নীতিনির্ধারকেরা বাস্তবায়ন করতে পারেন, সে জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে সুপারিশগুলোকে ভাগ করা যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর, অক্সফাম, গ্রেট ব্রিটেনের উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড কেয়ার প্রকল্পের ব্যবস্থাপক সারা হল, ঢাকায় কানাডীয় হাইকমিশনের হেড অব এইড (উন্নয়ন সহকারী) ফেদ্রা মরিস।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, নারীর কাজের বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসতে হবে। কোভিড নারীর ওপর কী কী প্রভাব ফেলেছে, তার ওপর ভিত্তি করে আগামী বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন