default-image

করোনায় আতঙ্কে সারা বিশ্ব। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিক্ষা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অর্থনীতির চাকা নেতিবাচকভাবে চলছে। জনমনে তৈরি হয়েছে এক ভীতিকর পরিস্থিতি। বিভিন্ন দেশ নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে। ইতিমধ্যে চীনের উহান শহর এবং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হংকং করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে তাদের প্রচেষ্টায় সফল হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ, ইরান, ইতালি, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়াসহ ১৪০টির মতো দেশ বা অঞ্চল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাসকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করছেন। বাংলাদেশে নতুন তিনজনসহ মোট আটজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। সারা দেশে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় হোম কোয়ারেন্টিনে প্রায় ২ হাজারের বেশি জনকে রাখা হয়েছে। করোনার কারণে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতির হার কমে গিয়েছিল। বাবা-মা সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। এমনকি অনেক অভিভাবক বাসায় পড়াতে আসা টিউটরকে সাময়িকভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন বলে খবর মিলছে।

করোনা মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকেরা সরাসরি শিক্ষা দিতে আগ্রহী নন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের বসন্তকালীন ছুটি পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে আসা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। ক্যামব্রিজ ও ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী সেমিস্টার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পাসে না যেতে বলেছেন। করোনার উৎপত্তিস্থল উহানসহ চীনের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ।

ডেনমার্ক, পোল্যান্ড, জাপান, ইতালি, স্পেনে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানিতে সংক্রমণ এলাকায় স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সর্বশেষ দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার করোনার কারণে ৩১ মার্চ পর্যন্ত সব স্কুল, কলেজ ও সিনেম হল বন্ধ রাখার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। ইউনেসকোর তথ্য অনুসারে এ পর্যন্ত ৬১টি দেশ সব স্কুল বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং এর মধ্যে ৩৯টি দেশ জাতীয়ভাবে স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। কিছু দেশ কিছু এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে।

কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষার সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো পদক্ষেপ ছিল না। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেশ কিছু নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। যেমন স্কুল-কলেজ মাঠে সমাবেশ না করা, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াসহ অন্য যে কোনো অনুষ্ঠানের সূচি পুনর্বিন্যাস করতে বলা, অ্যাসেম্বলি বন্ধ রাখা ইত্যাদি।

দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হলগুলোতে গণ রুম আছে যা করোনা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য ব্যাপক ঝুঁকিপূর্ণ। স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যানিটেশনের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশেষ করে স্কুল কলেজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট সচেতন, তারা ভালো মন্দ বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে অনশন করছিলেন। তারা মনে করছে ছোট ক্যাম্পাসে অত্যধিক শিক্ষার্থী বসবাস করায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এ ছাড়া করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী রিট করেছিলেন। যাতে করোনা ভাইরাসে’র সংক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীরা রক্ষা পেতে পারে। এরাই সবাই আজ সফল। কারণ সার্বিক বিবেচনায় সরকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী ও যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছি। তবে সেশনজট নিরসনের লক্ষ্যে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ করলেও সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম যথারীতি চলমান রাখা উচিত। ৩১ মার্চের মধ্যে করোনা ভাইরাস যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে এবং তা আরও মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে তবে এই ছুটি বর্ধিত করে পুনরায় সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করলেই করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনে সব শিক্ষার্থীদের করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা উচিত। স্ব-স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে করোনা ভাইরাস মোকাবিলার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান ও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সহযোগিতা করা একান্ত প্রয়োজন। সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্তটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। সেই সঙ্গে ব্রিটিশ কাউন্সিল ও আইডিপি কর্তৃক ইংরেজি ভাষার দক্ষতা মূল্যায়নের আইইএলটিএস পরীক্ষার কার্যক্রমও বন্ধ রাখা উচিত। এ ছাড়া সকল নিয়োগ পরীক্ষাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে মনে করছি।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা কোনো নাগরিক কোয়ারেন্টিনে অনুসরণ না করলে ব্রিটেন সরকারের মতো বাংলাদেশ সরকার এক লাখ টাকা জরিমানা গ্রহণের কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, যাতে সকল নাগরিক ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকতে পারে। মানুষকে সতর্ক করার জন্য সরকার ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম চালানো উচিত এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সবাইকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে।

*লেখক: পিএইচডি ফেলো, জংনান ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ল, চীন এবং সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন