কাঁটাতারের ফাঁকে ফাঁকে স্বজনের মুখ

বিজ্ঞাপন
default-image

মাঝে কাঁটাতারের দীর্ঘ বেড়া। দুই ধারে হাজারো মানুষের সারি। তাঁরা একে অপরের স্বজন। সান্নিধ্য পেতে ছুটে যান সেখানে। দেখা পেয়ে সেরে নেন মনে জমানো হাজারো না-বলা কথা। বিনিময় করেন নানা উপহার।
গতকাল শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার কুলিক নদীর পাড়ে বসেছিল দুই বাংলার মানুষের মিলনমেলা। ক্ষণিকের জন্য হলেও দীর্ঘদিন পর দুই দেশের মানুষ স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হন, বিদায়ের সময় আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকেই।
এলাকার অনেকে জানান, কুলিক নদীর পাড়ে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী পাথর কালী মেলা উপলক্ষে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে যুগ যুগ ধারে দুই বাংলার হাজারো মানুষ স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হয়ে কুশল বিনিময় করে আসছেন। গতকালও হৃদয়ের টানে সীমান্ত এলাকার কাঁটাতারের বেড়ার কাছে দুই বাংলার মানুষ ছুটে গিয়েছিলেন।
এলাকাবাসী জানান, কয়েক যুগ ধরে হরিপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী গোবিন্দপুর গ্রামের কুলিক নদীর ধারে কালীপূজা আয়োজন করছেন হিন্দুধর্মাবলম্বীরা। শুরুতে এখানে একটি বড় কষ্টিপাথর দিয়ে তৈরি করা কালীর মূর্তিতে পূজা উদ্যাপিত হতো। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সেই মূর্তিটি চুরি হয়ে যায়। এরপর পাথরের মূর্তির আদলে আরেকটি মূর্তি তৈরি করে প্রতিবছর কালীপূজার আয়োজন করা হয়। আর কালীপূজার পরের শুক্রবার ওই এলাকায় বসে মেলা। পাথরের নির্মিত মূর্তির নাম অনুসারে মেলার নামকরণ হয় পাথর কালীর মেলা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকে এপারের শত শত মানুষ ভারতীয় স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে ভিড় করতে শুরু করেন নদীর বাঁধের ওপর। এদিকে মুঠোফোনে চলে ভারতে থাকা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নদী পেরিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার পাশে যেতে শুরু করেন নারী-পুরু-শিশু। তিন ঘণ্টাব্যাপী দুই বাংলার হাজারো মানুষ স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতে মিলিত হন। ফেরার সময় ভেঙে পড়েন কান্নায়।
দুই বছর পর নানিকে দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুরের রজত রায়ের মেয়ে রত্না রায় (৮)। সে বলে, ‘দিদিমাকে দেখার পর একটু ছুঁয়ে দেখার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়ার জন্য পারিনি।’
রানীশংকৈল উপজেলার বাচোর গ্রামের মাধবী রানীর (২৩) গত বছর ভারতের কাকরমনি গ্রামে বিয়ে হয়েছে। মাধবী তাঁর স্বামী অর্জুন রায়কে সঙ্গে নিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পর এই প্রথম মাকে দেখলাম। তবে তেমন কথা হয়নি। এখন একটু শান্তি লাগছে।’
ঠাকুরগাঁওয়ের গড়েয়া থেকে মেয়েকে দেখতে এসেছেন অতনু বর্মণ (৬৫)। তিনি জানান, আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় পাসপোর্ট-ভিসা করে ভারতে যাওয়া হয় না। তাই প্রতিবছর এই দিনটার অপেক্ষায় থাকেন।
হরিপুর উপজেলার ভাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম প্রধান বলেন, হরিপুর উপজেলার অধিকাংশ এলাকা পাকিস্তান-ভারত বিভক্তির আগে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার অধীনে ছিল। এ কারণে দেশ বিভাগের পর আত্মীয়স্বজনেরা দুই দেশে ছড়িয়ে পড়েন। তাই সারা বছর এঁরা সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারেন না। এ দিনটির অপেক্ষায় থাকেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন