১২ দিন ধরে কাজ পাচ্ছেন না কাঠমিস্ত্রি অজিত মণ্ডল
১২ দিন ধরে কাজ পাচ্ছেন না কাঠমিস্ত্রি অজিত মণ্ডলছবি: আসাদুজ্জামান

কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাত–মুখ ধুয়ে হালকা খাবার খেয়ে কেরানীগঞ্জ থেকে পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজার মোড়ে এসে বসেন রাজমিস্ত্রি আলী আহমেদ। সকাল গড়িয়ে দুপুর। তবু তিনি কাজ পাননি। ঠায় সেখানে বসে ছিলেন। ভ্যাপসা গরমে মুখে তাঁর ক্লান্তির ছাপ। আলী আহমেদ সর্বশেষ কাজ পেয়েছিলেন, তা–ও এক সপ্তাহ পার হয়েছে। রোজ কাজ পাওয়ার আশায় ভোরবেলা এসে বসে থাকেন তিনি। কিন্তু কাজ না পেয়ে হতাশ মন নিয়ে বাসায় ফিরে যান সন্ধ্যায়।

করোনায় কঠোর সরকারি বিধিনিষেধে আয়শূন্য জীবনে এখন কীভাবে সংসার খরচ মেটাবেন, তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত ভোলার আলী আহমেদ। গতবারের লকডাউনে কাজ না পেয়ে বাড়ি ফিরে যান। সংসার খরচ মেটাতে গিয়ে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই ঋণের টাকা এখনো শোধ দিতে পারেননি।

আলী আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছর এক সপ্তাহের লকডাউনের কথা বলল। তিন মাস পর্যন্ত বাড়িতে গিয়া ঋণ কইরা চললাম। গাছের আম পাইড়া, বাজারে বিক্রি কইরা, মানুষের থেকে ঋণ করে সংসার চালালাম। লকডাউন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার ঢাকা শহরে এলাম। ঋণ যা হইছিল, তা শোধ দেওয়ার জন্য কাজ শুরু করলাম। এখন আবার লকডাউন। কোনো কাজ পাচ্ছি না।’

বিজ্ঞাপন

করোনায় সরকারি বিধিনিষেধে রাজমিস্ত্রি আলী আহমেদের মতো আরও কয়েক শ ভাসমান শ্রমিকের দেখা মেলে, যাঁরা কাজ পাওয়ার আশায় ভোরবেলা বসেছিলেন নগরের রায়সাহেব বাজার, সায়েদাবাদ, নয়াবাজার, দয়াগঞ্জ ও যাত্রাবাড়ী মোড়ে। বেশির ভাগ ভাসমান শ্রমিকেরই কাজ জোটেনি। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে পুড়ে দিনভর বসে থাকলেও কাজ না পাওয়ার হতাশা তাঁদের ঘিরে ধরেছে। আবার নতুন করে কঠোর সরকারি বিধিনিষেধের খবর জেনে সবাই আতঙ্কিত।

default-image

আয়শূন্য জীবনের যন্ত্রণা

নগরের নয়াবাজার মোড়ে ফুটপাতে কাঠের তৈরি বাক্সের ওপর বসে ছিলেন কাঠমিস্ত্রি অজিত মণ্ডল। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল চারটা, কাজ পাননি। একজন মানুষও এসে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেননি, ‘আমার একজন কাঠমিস্ত্রি দরকার।’
এক সপ্তাহ ধরে অজিত মণ্ডল রোজ সকালে নয়াবাজার মোড়ে আসেন, আবার সন্ধ্যায় ফিরে যান বাসায়। ২০ বছরের কাঠমিস্ত্রির জীবনে এমনটা কখনো হয়নি তাঁর। গেল বছরের লকডাউনে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে নিজ গ্রামে ফিরে যান। সেখানেই তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে আর এক মেয়ে থাকে। প্রথমে কিছুদিন ধানকাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। পরে আর কোনো কাজ সেভাবে পাননি। তাই সংসার চালানোর জন্য ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন। অজিতের বড় ছেলে গত বছর উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। কিন্তু অর্থের অভাবে আর লেখাপড়ার খরচ জোগাতে পারছেন না তিনি।

শনিবার বিকেলে অজিত মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। জমি–জায়গা নেই। তবে ছোটবেলায় কাঠের কাজ শিখেছি। সেই কাজ কইরা ছেলেমেয়ের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিচ্ছি। কিন্তু করোনায় কাজ পাচ্ছি না। আমার এমন অবস্থা হয়েছে যে টাকার অভাবে সংসার চালাতে পারি না। ছেলেকেও এইচএসসি পাস করিয়ে আর লেখাপড়া করাতে পারছি না। গত বছরের লকডাউনে তো আর শহরে থাকা যায়নি। বাড়িতে গিয়ে কিস্তি উঠিয়েছিলাম। দেনা–দায়িক হয়েই চলছি।’

default-image

করোনায় সরকারি বিধিনিষেধে রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রিসহ ভাসমান এসব শ্রমিক হঠাৎ করে কাজ পাচ্ছেন না। আবার নতুন করে কঠোর বিধিনিষেধের ঘোষণায় তাঁরা রীতিমতো দিশেহারা। দূরপাল্লার বাস বন্ধ, লঞ্চ বন্ধ। ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করলেও তাঁরা ফিরতে পারছেন না। রোজ কাজ পাওয়ার আশায় নগরীর মোড়ে মোড়ে ঘুরছেন।
রাজমিস্ত্রি মোহাম্মদ ইউনুস প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে কোনো কাজ পাচ্ছি না। আমরা দিন আনি দিন খাই। পকেটে কোনো টাকা নেই। খানাদানা কোনো কিছু মিলাইতে পারছি না। এখন কী করব, কীভাবে সংসার চালাব, কিছুই মাথায় আসছে না। গত বছরের লকডাউনে দুই মাসের ঘরভাড়া বাকি আছে। তা এখনো শোধ দিতে পারিনি।’
কাজ হারিয়ে চরম বিপদে পড়া এসব শ্রমিকের মুখে এখন একটাই কথা, কাজ নেই। তাই আয়ও নেই। কিন্তু সংসার তো আছে। ছেলেমেয়ের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে তো হবে।

default-image

কাঠমিস্ত্রি কৃষ্ণ বালা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বহুত (বহু) টেনশনে আছি। কোনো কূলকিনারা পাচ্ছি না। কাজ নেই, ডেলি আসি, ডেলি যাই। গতবারের লকডাউনে ৩০ হাজার টাকা দেনা হয়েছি। তবে সরকারি কোনো সাহায্য–সহযোগিতা পাইনি। এখন আবার কাজ না থাকলে খাব কী?’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, করোনায় গত বছরের লকডাউনে নগরের অনেক রাজমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রিসহ ভাসমান শ্রমিক গ্রামে ফিরে যান। কিন্তু সংসার চালাতে গিয়ে বেশির ভাগ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আবার লকডাউন শুরু হয়েছে। কোনো কাজ পাচ্ছেন না তাঁরা। কিন্তু গতবারের অভিজ্ঞতায় তাঁরা এবার আর ঢাকা ছেড়ে যেতে চাচ্ছেন না। সত্যিকারের ভাসমান শ্রমিকদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া জরুরি। এই মানুষগুলো বড় বিপদে আছেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন