লঞ্চমালিকের প্রতিষ্ঠান খন্দকার এন্টারপ্রাইজে চাকরি করতেন রতন সরকার। এই প্রতিষ্ঠানের লঞ্চ এমভি মোস্তফায় চেপে পেশাগত কারণে গত রোববার পাটুরিয়া ঘাট থেকে দৌলতদিয়া যাচ্ছিলেন। কিন্তু লঞ্চটি ঘাট ছাড়ার ১৫ মিনিটের মধ্যেই কার্গোর ধাক্কায় পদ্মা নদীতে তলিয়ে যায়। এরপর লাশ হয়ে ঘরে ফেরেন তিনি।
পরিবারের উপার্জনক্ষম রতনের মৃত্যুতে পরিবারটিতে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শিবালয়ের সাতঘর তেওতায় রতন সরকারের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্ত্রী জয়ন্তী ঘরের বারান্দায় পাগলের মতো বিলাপ করছেন। আর একমাত্র ছেলে রাজীব নির্বাক। জয়ন্তীর পরনে সাদা কাপড়। ছিল না সিঁদুর আর হাতের শাঁখা। মায়ের পাশে বসে রাজীব বিড়বিড় করে কিছু বলার চেষ্টা করছিল।
জয়ন্তীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতেই তিনি বুক চাপড়ে বলতে থাকেন, ‘যে লঞ্চ আর নদী আমাগো সংসার চালাইতো, হেই লঞ্চ আর নদীই আমাগো সব শেষ কইরা দিলো।’
মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটের অদূরে পদ্মা নদীতে গত রোববার এমভি মোস্তফা লঞ্চ ডুবে যায়। এর পর থেকে গত সোমবার রাত নয়টা পর্যন্ত ৭১টি মরদেহ উদ্ধার হয়। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন অনেকে।
রতনের মতোই লঞ্চে চাকরির ওপরই নির্ভরশীল ছিল মানিকগঞ্জের শিবালয়ের এলাচিপুরের সোহরাব শেখ ও দক্ষিণ তেওতার আবুল হাসেমের পরিবার। লঞ্চডুবির পর রতনের মরদেহ পাওয়া গেলেও ওই দুজনের সন্ধান মেলেনি গতকাল পর্যন্ত। তাঁরা বেঁচে আছেন না মরে গেছেন, জানেন না তাঁদের পরিবার।
গতকাল বেলা তিনটার দিকে সোহরাব শেখের বাড়ির উঠানে পা রাখতেই দৌড়ে এসে জাপটে ধরে স্ত্রী রোকেয়া বেগম জানতে চান তাঁর স্বামীকে পাওয়া গেছে কি না। না বলতেই কান্নার রোল পড়ে যায় পরিবারটিতে। কারও সঙ্গে কথা বলারই সুযোগ ছিল না।
কান্নার ফাঁকে ফাঁকে রোকেয়া বলতে থাকেন, ‘খ্যাত-খামারে কাজ করবার পারত না। তাই লঞ্চে (এমভি মোস্তফা) বাবুর্চির কাজ করত। পানি ছাড়া হ্যার ভাল লাগত না। হেই পানিই তাঁরে খাইলো।’
নিখোঁজ আবুল হাসেমের পরিবারের অবস্থা একই। পাটুরিয়া লঞ্চঘাটে টিকিট কাউন্টারে সুপারভাইজারের চাকরি করতেন তিনি। ডুবে যাওয়া লঞ্চে টিকিট চেক করতে গিয়েই নিখোঁজ হন তিনি। পরিবারের সদস্য আর স্বজনেরা তাঁর মরদেহের সন্ধানে তিন দিন ধরে ঘটনাস্থলসহ পদ্মা ও যমুনা নদী চষে বেড়াচ্ছেন। এর পরেও তাঁর হদিস করতে পারেননি তাঁরা।
বাবার মরদেহের সন্ধান না মেলায় ক্ষোভের সঙ্গে তাঁর ছেলে পাভেল মৃধা বলেন, ‘জীবিত না হোক, লাশটা তো দিবো আমাগো। হেইডাওতো দেয় না। লাশটা পাইলেও তো মনেরে বুঝ দিবার পারতাম।’

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন