কান্নার বদলে খুশিতে হাসছে অর্থি। নতুন সঙ্গী পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত মেয়েটি। গত সোমবার (৩ আগস্ট) দুপুরে দাদা ও বাবার সঙ্গে নিজে হাটে গিয়ে বাছাই করেছিল আগের গরু নবাবের মতো দেখতে একটা ছোট্ট গরুকে। তারপর অর্থি চলে এসেছিল বাড়ি। সেদিন বিকেলে সেই গরুই চলে এল তার বাড়িতে। তুলে দেওয়া হলো তারই হাতে। খুশিতে ডগমগ অর্থি নতুন গরুটার নাম রেখেছে ‘ছোট নবাব’।

ঈদের আগের দিন ৩১ জুলাই প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয় ফটোসাংবাদিক রাফিদ ইয়াসারের তোলা অর্থির কান্নার ছবি।
নিজের খেলার সঙ্গী নবাবকে বিক্রি করে দেওয়ার পর তাকে জড়িয়ে ধরে সে হাউমাউ করে কাঁদছিল।

‘অর্থি কেন কাঁদছিল’ শিরোনামে সে খবর দেশজুড়ে সাড়া ফেলে। অনেকে প্রথম আলোর ঢাকা অফিস, বগুড়া অফিস আর রাফিদ ইয়াসারকে ফোন করে মেয়েটিকে সাহায্য করতে চান। মো. মাহবুবুর রহমান (এইচএসবিসি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী) ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেন প্রথম আলোর সঙ্গে। তাঁরই আর্থিক সহযোগিতায় ঈদের দুদিনের মাথায় সোমবার অর্থিকে নতুন গরু কিনে দেওয়া হয়।

নবাব নামের গরুটির গল্প

এক বছর আগের কথা। বগুড়া সদরের ঘোড়াধাপ হাট থেকে ৮৬ হাজার টাকায় শাহিওয়াল জাতের একটি নাদুসনুদুস বাছুর কিনে আনলেন অর্থির বাবা আকরাম হোসেন। অর্থি হয়ে উঠল বাছুরটির বন্ধু। নিজ হাতে খড়-পানি, ভাত-কুঁড়া খাওয়াতে শুরু করল। বাছুরের নাম রাখল নবাব।

এক বছর পর গত ২৪ জুলাই সেই নবাবকে ঈদের আগে বিক্রির জন্য তোলা হয় আবারও ঘোড়াধাপ কোরবানির হাটেই। বন্ধু নবাবকে বিক্রি করে দেওয়ার কথা শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়ে অর্থি। বন্ধুকে হারানোর শোকে নাওয়াখাওয়া ছেড়ে দেয় মেয়েটি।

নবাবকে হাটে নেওয়ার সময় দাদা খবির উদ্দিন আকন্দের সঙ্গে অর্থিও পিছু নেয়। হাটে নেওয়ার পর নবাবের দাম ওঠে ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। ক্রেতার হাতে গরুটিকে তুলে দেওয়ার সময় নবাবকে বিদায় জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে অর্থি। হেঁচকি দিয়ে কান্নার সেই ছবি ও খবর ৩১ জুলাই প্রথম আলোতে ছাপা হলে দেশজুড়ে সাড়া পড়ে।

নবাবকে কান্নাভেজা শেষ বিদায়যাত্রার পর থেকেই অর্থি ছিল বিষণ্ন। ১ আগস্ট ঈদের দিন সারাক্ষণ নবাবের জন্য কান্নাকাটি করে সে।

নবাবের শোকে কাতর অর্থির কান্না অবশেষে থেমেছে। ঈদের দুই দিনের মাথায় গত সোমবার অর্থিকে পাঁচ মাস বয়সী লাল রঙের শাহিওয়াল জাতের একটি এঁড়ে বাছুর উপহার দেওয়া হয়েছে। মাহবুবুর রহমানের অনুদানে প্রথম আলো ট্রাস্টের পক্ষ থেকে অর্থিকে নতুন এই গরু উপহার দেওয়া হয়। সোমবার দুপুরে বাবা আকরাম হোসেন ও দাদা খবির উদ্দিনের সঙ্গে হাটে গিয়ে অর্থি নিজেই গরুটি পছন্দ করে। গরু পছন্দ করলেও সে জানত না, সেই গরুই তাকে উপহার দেওয়া হবে।

default-image

বিকেলে অর্থিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, নবাবের শোকে গালে হাত দিয়ে বিষণ্ন মনে পড়ার ঘরে বসে আছে অর্থি। ছলছল চোখ তার নবাবের ঘরের দিকে। প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা যখন নতুন গরুটি অর্থির হাতে তুলে দেন, তখন চোখেমুখে তার খুশির উচ্ছ্বাস। গরু পেয়েই আদরযত্ন করতে লেগে গেল সে।

অল্প সময়ের মধ্যেই হাট থেকে আনা গরুটির সঙ্গে ভাব জমে গেল মেয়েটির। দেখতে হুবহু নবাবের মতো চেহারা হওয়ায় সে গরুটির নাম দিয়েছে ছোট নবাব।

মা আইরিন সুলতানা বলেন, ‘অর্থি আমাদের একমাত্র সন্তান। নবাব ছিল ওর খেলার সঙ্গী, ভালো বন্ধু। সাংসারিক প্রয়োজনে গরুটি বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। কিন্তু গরুটা বিক্রির পর বন্ধুকে হারানোর শোকে অর্থি এতটা ভেঙে পড়বে, তা কখনো ভাবিনি। ছোট নবাবকে পেয়ে মেয়েটা নিমেষেই বদলে গেছে। নতুন গরু পেয়ে খুব খুশি সে।’

অর্থির চাচা নজরুল ইসলাম বলেন, প্রথম আলোতে অর্থির ছবি ছাপা হওয়ার পর রাতারাতি তারকা বনে গেছে মেয়েটা। ঈদের দিনেও টেলিভিশনের সাংবাদিকেরা এসে অর্থির পরিবারের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। নানাজনে ফোন করে অর্থিকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, গরু কিনে দিতে চেয়েছেন।

অর্থির লেখাপড়ায় আর্থিক সহায়তারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অনেকে। প্রথম আলো ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় অর্থিকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হবে। যত দিন সে লেখাপড়া করবে, তত দিনই সে মাসিক বৃত্তি পাবে। ইউএস–বাংলা এয়ারলাইনস অর্থির এই শিক্ষাবৃত্তির ব্যয়ভার বহন করবে বলে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন