default-image

অবশেষে আসামি না হয়েও কারাভোগ করা হাসিনা বেগম আজ মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এর আগে দুপুরে তাঁকে মুক্তির নির্দেশ দেন চট্টগ্রামের চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ শরীফুল আলম ভূঁঞা।

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম আজ বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের আদেশ পাওয়ার পরপরই ওই বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

হাসিনা যখন চট্টগ্রাম কারাফটক দিয়ে বের হচ্ছিলেন, তখন তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। জিজ্ঞাসা করতেই হাসিনা বেগম বললেন, ‘এত দিন কেঁদেছি দুঃখে। আজ খুশিতে। যারা আমার জীবন থেকে ১৬টি মাস শেষ করে দিয়েছে, তাদের শাস্তি চাই। তছনছ হয়ে গেছে আমার সংসার। আমি ফেরত চাই আমার হারানো ১৬ মাস।’

বিজ্ঞাপন

হাসিনা যখন গ্রেপ্তার হন, তখন টেকনাফ থানার ওসি ছিলেন প্রদীপ কুমার দাশ। সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এক মেজরকে খুন ও দুর্নীতির মামলায় বরখাস্ত হয়ে তিনি এখন কারাগারে।

হাসিনা বেগমকে আইনি সহায়তা দিয়েছেন আইনজীবী গোলাম মুরাদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসিনা বেগমের জীবন থেকে ১৬টি মাস হারিয়ে গেল। আমরা ক্ষতিপূরণের জন্য আদালতে আবেদন করব। ঘটনার পর তাঁর স্বামী তাঁকে ফেলে চলে যান। এক ছেলে মানুষের বাসায় কাজ করেন। দুই মেয়ে নানির কাছে বড় হচ্ছে। এই দুর্ভোগের দায়ভার কে নেবে?’

কারাফটকে দীর্ঘদিন পর মায়ের দেখা পেয়ে খুশি হাসিনার বড় ছেলে শামীম নেওয়াজ। মাকে জড়িয়ে ধরে রাখেন তিনি। শামীম নেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মা কারাগারে যাওয়ার পর মানুষের বাসায় কাজ নিয়েছি। যারা আমাদের এই ক্ষতি করেছে, তাদের বিচার চাই।’

আদালতের বেঞ্চ সহকারী ওমর ফুয়াদ প্রথম আলোকে বলেন, গত মার্চে হাসিনা বেগমের আইনজীবী আদালতে আবেদন করেন, তিনি (হাসিনা বেগম) এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। প্রকৃত আসামি হাসিনা আক্তার জামিনে গিয়ে পলাতক। পরে আদালত টেকনাফ থানার পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন। গত বৃহস্পতিবার আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে টেকনাফ থানার পুলিশ উল্লেখ করে, প্রকৃত আসামি হাসিনা আক্তার পলাতক। আসামি না হয়েও গ্রেপ্তার হয়েছেন হাসিনা বেগম। গত রোববার আদালত কারা কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে প্রতিবেদন চান। কারাগারে থাকা আসামির নিবন্ধন বই যাচাই-বাছাই করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন আদালত। কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রতিবেদন পাওয়ার পর আজ আদালত নিরপরাধ হাসিনা বেগমকে মুক্তির নির্দেশ দেন।

বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. শফিকুল ইসলাম খান আজ আদালতে এক পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরের কর্ণফুলী থানায় ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় ২০১৭ সালে কারাগারে আসা হাসিনা আক্তারের ছবির সঙ্গে ২০১৯ সালে কারাগারে আসা হাসিনা বেগমের ছবির মিল নেই। দুজনের বয়সের পার্থক্য রয়েছে।

default-image

গতকাল সোমবার প্রথম আলোয় ‘নামের মিলে এক নারীর সাজা খাটছেন আরেকজন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামে নামের মিল থাকায় এক নারীর সাজা খাটছেন আরেক নারী। ১৬ মাস ধরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নগরের কর্ণফুলী থানার একটি মাদক মামলায় সাজা খাটছেন হাসিনা বেগম নামের এক নারী। প্রকৃত আসামি হাসিনা আক্তার পলাতক।

থানার পুলিশ সূত্র জানায়, হাসিনা বেগম ও হাসিনা আক্তার, দুজনের বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। দুজনের স্বামীর নামও হামিদ হোসেন। তবে শ্বশুরের নাম ও বাড়ির ঠিকানা আলাদা। হাসিনা বেগমের শ্বশুরের নাম মৃত কবির আহম্মদ। আর হাসিনা আক্তারের শ্বশুরের নাম মৃত জলিল আহমেদ।

আদালত সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি নগরের কর্ণফুলী থানার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে পুলিশ হাসিনা আক্তার, তাঁর স্বামী হামিদ ও দুই সন্তানকে দুই হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে। তদন্ত শেষে হাসিনা আক্তার ও তাঁর স্বামী হামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ওই বছরের ২৭ নভেম্বর জামিনে মুক্তি পান তাঁরা। পরে স্বামী-স্ত্রী আত্মগোপনে যান। আসামিরা পলাতক থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ১ জুলাই পঞ্চম অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ হাসিনা আক্তার ও তাঁর স্বামী হামিদকে পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন। পরে তাঁদের সাজা পরোয়ানা আদালত থেকে টেকনাফ থানায় যায়।

টেকনাফ থানার পুলিশ ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে টেকনাফ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইসমাঈল হাজিবাড়ির হাসিনা বেগমকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। কিন্তু প্রকৃত আসামি একই এলাকার চৌধুরীপাড়ার হাসিনা আক্তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। সেই থেকে আসামি না হয়েও কারাভোগ করে আসছিলেন হাসিনা বেগম।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন