বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুই আসামির নিয়মিত আপিল সোমবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে। শুনানি নিয়ে আদালত মঙ্গলবার শুনানির পরবর্তী দিন রেখেছেন।

শুনানির একপর্যায়ে এ বিষয়ে আইনজীবীদের বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘অ্যাডভোকেট শিশির মনির কি আপিল বিভাগে তালিকাভুক্ত? সে যেভাবে মন্তব্য করেছে যে সবাই দোষী। অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, কোর্ট, বিচারক, এক্সিকিউট যারা করেছে, তারা সবাই দোষী। উনি কিছু না দেখে কেন এ রকম মন্তব্য করেন? সবারই মনে রাখতে হবে, আমরা কেউ প্রিজাইডিং অফিসার, কেউ কোর্ট অফিসার। এ রকমভাবে কোর্টকে আক্রমণ করা, এটা খুব খারাপ নজির। প্রয়োজনে তো সবাই কোর্টে আসে, সবাই প্রতিকার নেয় ও পায়। কোর্টের কোনো সামান্যতম ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে এ রকম করে আক্রমণ করা—এটা তো খুবই দুঃখজনক। আমরা তো কোনো অ্যাডভোকেট সাহেবকে এ রকমভাবে আক্রমণ করি না, শাস্তি দেই না। আমরা তো চেষ্টা করি, যেকোনো একটা ভুল হলে ভুলটা শুধরে কীভাবে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।’

১৯৯৪ সালে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা এলাকার সাবেক স্থানীয় মেম্বার মনোয়ার হোসেন খুন হন। এই হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে ঝড়ু ও মকিমের মৃত্যুদণ্ড হয়। এই রায় হাইকোর্টে বহাল থাকে। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে দুই আসামি পৃথক আপিল করেন। এর পাশাপাশি কারাগারে থেকে পৃথক জেল আপিল করেন তাঁরা। জেল আপিলের শুনানি শেষে ওই বছরের ১৫ নভেম্বর আপিল বিভাগ তা খারিজ করে রায় দেন। পরে তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন, যা ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর নামঞ্জুর হয়। ওই বছরের ১৭ নভেম্বর তাঁদের ফাঁসি কার্যকর হয়। এর আগে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা দেখা করেন।

তবে ঝড়ু ও মকিমের করা নিয়মিত আপিল ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ওঠে। যার নম্বর হচ্ছে ১০৭/২০১৩ এবং ১১১/২০১৩। সেদিন নিয়মিত আপিল দুটি ১১ নম্বর ক্রমিকে ছিল। এর আগের দিন ছিল ৩০ নম্বর ক্রমিকে। ৩ নভেম্বর ঝড়ু ও মকিমের আইনজীবী আসিফ হাসান ও হুমায়ুন কবির দাবি করেন, আসামির নিয়মিত আপিল নিষ্পত্তির আগেই দুই আসামির দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। তখন অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

এরপর আপিল বিভাগের সোমবারের কার্যতালিকায় ঝড়ু ও মকিমের নিয়মিত আপিল ২৬ নম্বর ক্রমিকে ছিল। ক্রম অনুসারে বিষয়টি উঠলে নিয়মিত আপিলে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ডের (আসামিপক্ষের আইনজীবী) উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘আপনি কি এটা জানেন না? যখন জেল আপিল করে তখন একটা আবেদন দিয়ে নিয়মিত আপিলসহ দুটি একসঙ্গে কনভার্ট করে নিতে হয়। জেলখানা থেকে আসামি জানায়নি?’

তখন অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড সুফিয়া খাতুন বলেন, মক্কেল তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি। কোনো ফাইলও দেননি। মামলা যিনি দিয়েছেন তাঁকে যথাসময়ে জানিয়েছেন। তবে তারপর আর কোনো সন্তোষজনক সাড়া পাওয়া যায়নি। আসামির পরিবারের কেউ যোগাযোগ করেনি। দুটি আপিল হলে সেকশনই তো যোগ করে দেয়।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সেকশন তো যোগ করে না। আমাদের এখানে তো ডিজিটাল সিস্টেম না। বরং আপিলকারীর আইনজীবী এসে বলেন, যে জেল আপিল আছে—এটা ওইটার সঙ্গে ট্যাগ করেন।’

দুই আসামির জেল আপিলে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড ছিলেন আইনজীবী নাহিদ সুলতানা। জেল আপিল খারিজ করে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় এবং ওই আইনজীবীর বক্তব্য তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি বলেন, আপিল বিভাগ ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর জেল আপিলের ওপর রায় দেন। রাষ্ট্রপতি ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর তাঁদের ক্ষমাপ্রার্থনার আবেদন নামঞ্জুর করেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাঁদের পরিবারকে দেখা করার জন্য ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর চিঠি দেয়।

রায়ের এক বছর পর কারা কর্তৃপক্ষ তাঁদের চিঠি দেয়। চিঠির পর তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাৎ করেন। ওই বছরের ১৭ নভেম্বর রায় কার্যকর হয়। এই এক বছর পর্যন্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী কিছু করলেন না।

শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, গত দুই সপ্তাহ আগে আইনজীবী হুমায়ুন কবির তাঁকে এ মামলায় যুক্ত করে ও মামলাটি করে দিতে বলেন। তিনি তাঁকে আসামিদের পরিবারের খোঁজ নিতে বলেন। পরে আইনজীবী হুমায়ুন কবির জানান, ওই মামলায় আসামিদের সাজা কার্যকর হয়ে গেছে। ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি শুনে তিনি বলেন, অসম্ভব, এটা তো হতে পারে না। পরে পত্রপত্রিকা ও অ্যাটর্নি জেনারেল থেকে জানতে পারেন, জেল আপিল হয়েছে। আসামির পরিবারের সদস্যরা অশিক্ষিত ও অজপাড়াগাঁয়ের। তাঁরা জেল আপিল কী, তা–ও মনে হয় বোঝেন না।

আইনজীবীর উদ্দেশে আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘বলেন দেখি, এখানে সব প্রক্রিয়া মানা হয়েছে কি না?’ জবাবে আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, দেখা যাচ্ছে সব প্রক্রিয়া হয়েছে। তবে কারা কর্তৃপক্ষের আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল।

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘তাদের উচিত ছিল, আপনার আইনজীবীর উচিত ছিল না, জেল আপিলের শুনানি শেষে নিষ্পত্তি হয়ে গেল?’

আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান বলেন, আপিল ফাইল করে আপনারা তো একটি দরখাস্ত করবেন স্থগিতাদেশ নেওয়ার জন্য। তখন আসিফ হাসান বলেন, ফাইল করলেই ধরে নেওয়া হয় যে ইনফর্মড হয়ে গেছে।

একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনার অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড আইনজীবীর বক্তব্য হচ্ছে যে তাঁর সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করেনি। আইনজীবী হয়ে কীভাবে আপিল বিভাগের মামলা হয়—এটি যদি না জানে তাহলে তো মহাঝামেলার কথা।

আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, ‘কিছু অবহেলা বা ভুল হতে পারে। মানুষের ভুল হতেই পারে। পৃথিবীতে এমন কেউ নাই যে ভুল হয় না। কিন্তু আমাদের চাওয়া হচ্ছে, জেল কর্তৃপক্ষ যাতে আরও সতর্ক হয়।’ প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা যখন আইনজীবী ছিলাম, জেল আপিল যখন থাকে, তখন আমরা এটি কনভার্ট করেছি—আবেদনের মাধ্যমে। এই প্র্যাকটিস এখন টোটাল বন্ধ হয়ে গেছে।’

একপর্যায়ে আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, জেল কর্তৃপক্ষকে ধৈর্যশীল হতে একটা গাইডলাইন দিয়ে দেন। সঙ্গে এই গরিবদের জন্য যদি কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়া যায়।
এ সময় বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ক্ষতিপূরণ কিসের জন্য? বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান বলেন, যে আইনজীবী ভুল করেছেন, ওনাকে বলেন। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, উনি কিছু দিয়ে দিক।

আসামিপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে বেঞ্চের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, জেল কর্তৃপক্ষের দোষটা কোথায়? আপিল বিভাগ থেকে অন মেরিটে জাজমেন্ট হয়েছে, সেটা কমিউনিকেশন হয়েছে। রায়ের পর মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা খারিজ হয়েছে। এরপর রায় কার্যকর হয়েছে। আইনজীবী আসিফ হাসান তখন বলেন, আইনগত কোনো ভুল নেই।

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, তাহলে কারা কর্তৃপক্ষকে দায়ী করছেন কেন? মামলা কার্যতালিকায় এসেছে, শুনানি হয়েছে। উপস্থিত থাকা উচিত ছিল, যেটি করেননি। জেল আপিলের সঙ্গে এটি (নিয়মিত আপিল) ট্যাগ করে দিতে প্রার্থনা করতে পারতেন। নিজের দোষটা স্বীকার করেন না কেন?

আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, ‘স্যরি। এমন মূর্খ ও গরিব মানুষ এরা, আইনজীবীকে জানায়ওনি কখন জেল আপিল হয়েছে বা করেছে।’ বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, এটা তো কোনো ব্যাখ্যা না। আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, দেখা যাচ্ছে আইনগতভাবে সবই ঠিক আছে। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, জেল আপিলের রায় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই আপিলটি (নিয়মিত আপিল) অকার্যকর হয়ে গেছে।

আসামিপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে এই পর্যায়ে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘নিচের আদালতে, হাইকোর্টে দণ্ডিত ও আপিল বিভাগে সব ধরনের প্রক্রিয়ায় দণ্ডিত। জেলখানায় তাদের স্বজনেরা দেখা করছে, সবকিছুই হলো। পত্রিকায় নিউজটা যেভাবে এল, আপনাদের এগিয়ে আসা উচিত ছিল। এগিয়ে এসে বলা উচিত ছিল, ঘটনাটা এ রকম।’ তখন আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, ‘সেটি বলার জন্য অপেক্ষা করছি।’

বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘আপনারা কিছুই করেননি। আমরাও আইনজীবী ছিলাম। জেল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা, তাদের সতর্ক করার কথা বলছেন। তাঁরা যথেষ্ট সতর্ক থাকেন, তাঁরা কিন্তু বিষয়গুলোকে ফলো করেন ও তাঁদের রেকর্ড ঠিক থাকে। যে পর্যন্ত দেখেছি, রেকর্ডে খুব একটা ভুল হয় না।...আইনজীবীদের ভুলের কারণে অনেক সময় এগুলো হয়।’

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘বলা হয়েছে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল সাহেব খবর নিলেন ও আমার এখানে আসলেন।’

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘শোনার পরপরই জেল কর্তৃপক্ষের ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা ফ্যাক্ট শিট ও নম্বর পাঠান। আপিল বিভাগের রায় (জেল আপিল) দেখি। যেভাবে (পত্রিকায়) আসছে, এটা ঠিক না। সাংবাদিকদের সঠিক তথ্য দেওয়া হয়নি।’

একপর্যায়ে বিচারপতি মো. নূরুজ্জামান বলেন, ‘এতগুলো মানুষ এটা পত্রিকায় দেখে আমাদেরকে, কোর্টকে কত সমালোচনা করেছে। তারা কি ভেতরের এসব ঘটনা এখন জানে? টক শোতে কত কথা বলা হয়েছে।’ আসামিপক্ষের আইনজীবী আসিফ হাসান বলেন, ‘এগুলো (দুই আসামির জেল আপিল ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমাপ্রার্থনার আবেদন নামঞ্জুরের পর ফাঁসি কার্যকর) কারোরই জানা ছিল না।’

অ্যাটর্নি জেনারেলের উদ্দেশে বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল সাহেব আপনার কলিগরা, অ্যাডভোকেট সাহেবেরা, তারা কমেন্ট করছেন। তারা কোনো কিছু না দেখে কমেন্ট করছেন—এটা কি ঠিক হল?’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন