default-image

পাহাড়ি জনপদের প্রত্যন্ত দুর্গম গ্রাম ফুলতলায় জন্ম নুরুল ইসলামের। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীরা আশ্রয় নেয় তাঁদের বাড়িতে। বাবার সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের খাওয়াতেন কিশোর নুরুল ইসলাম। স্বাধীনতার পর আবার স্কুলে ভর্তি হয়ে ১৯৭৩ সালে এসএসসি পাস করেন। অভাবের তাড়নায় এরপর আর পড়াশোনা হয়নি। কিন্তু শিক্ষকতা আর কৃষকদের সহায়তা করে বদলে দিয়েছেন গ্রাম।

স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশ, গ্রামে বিদ্যুৎ নেই, রাস্তাঘাট নেই, চারপাশে লাল মাটি, বন-জঙ্গল। দেশ গঠনের কাজ চলছে চারপাশে। যুবক ছেলেটিকে সাংঘাতিক ভাবিয়ে তোলে গ্রামের মানুষদের দরিদ্র জীবনযাপন। তখন চিন্তা করেন, ফুলতলা গ্রামের মানুষের মুক্তির জন্য দুটো পথ খোলা—এক. মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা, দুই. কৃষিতে স্বাবলম্বী করে মানুষের দারিদ্র্য ঘোচানো। এতে অন্তত ক্ষুধার তাড়নায় কাউকে ডুকরে কাঁদতে হবে না। চ্যালেঞ্জ দুটো সামনে নিয়ে মাঠে নামেন নুরু নামের যুবা ছেলেটি।

default-image

নুরুল ইসলাম গ্রামের শিক্ষিত সহপাঠীদের নিয়ে ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ফুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে বিনা খরচে গ্রামের হতদরিদ্র শিশুদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে থাকেন। পাশাপাশি গ্রামের কৃষকদের অনাবাদি জমি আবাদের জন্য পরামর্শ দিতে থাকেন। যেহেতু পাহাড়ি এলাকা, সেহেতু সবাইকে মৌসুমি সবজি যেমন লেবু, বেগুন, কলা, হলুদ, আনারস, আখ, লাউ, করলাসহ বিভিন্ন জাতের মৌসুমি ফল এবং সবজি আবাদের পরামর্শ দেন তিনি।


পরে কৃষির ওপর উন্নত প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি চলে শিক্ষকতাও। এরপর কৃষকদের বিভিন্ন ফসল চাষপদ্ধতির নানা কৌশলগত দিক, কৃষিতে উন্নত সেচব্যবস্থাসহ সনাতন যন্ত্রপাতি ব্যবহার বাদ দিয়ে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে হাতে–কলমে সরেজমিন প্রশিক্ষিত করে তোলেন।

default-image

গ্রামের ক্ষুধার্ত কৃষকেরা নুরুল ইসলাম মাস্টারের কথায় আশার আলো দেখতে শুরু করেন। গ্রামের সবাই যার যেটুকু জমি আছে, সেই জমিতে শুরু করেন মৌসুমি সবজির আবাদ। দিনে দিনে মাস হয়, মাসের পর বছর, আর বছর ঘুরে যুগ। এত বছর পর সেদিনের পাথরের মতো কঠিন মাটির বুক এখন উর্বর, এ গ্রামের কৃষকের জমিতে এখন সোনা ফলে, কৃষক জমির ফসলের দাম পায়। গ্রামে এরই মধ্য পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ। ছোটখাটো রোগশোকে এখন আর মানুষকে মরতে হয় না বিনা চিকিৎসায়, গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিকে বিনা পয়সায় চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এখন প্রতিটি সূর্যাস্তের ভোরে বাড়ির বারান্দাগুলোয় মুখরিত হয়ে ওঠে ছোট শিশুদের ঠোটের ডগায় বুলির শব্দে। তবে এত কিছু একদিনে হয়নি কিন্তু। এর পেছনে রয়েছে মেধা, শ্রম আর সাহসী পদক্ষেপ।


এসব পদক্ষেপ সাদা মনের যুবা সাহসী মানুষ ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুরুল ইসলামের। শুধু কৃষিকে অবলম্বন করে বদলে দিয়েছেন পুরো গ্রামের চিত্র। ফুলতলা গ্রামের কঠিন মাটিতে ফসল ফলাতে ঘর থেকে বের করেছেন কৃষককে। যে ফুলতলা গ্রামের জমি চষতে গিয়ে কৃষক হতেন নাস্তানাবুদ, এখন সেই ফুলতলা গ্রামের মাটিই উপজেলায় সবচেয়ে উর্বর। ফুলতলায় এখন ফুল ফোটে, সেই ফুলের সুবাসে ভ্রমর গুঞ্জরিত হয়, মৌমাছিরা সুপ্ত পরাগ থেকে ফুলে ফুলে ঢোলে ঢোলে এ যেন এক সবুজ–শ্যামল সুফলা ছবির মতো চিরায়িত বাংলার গ্রাম।


নুরুল ইসলাম শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন বেশ কয়েক বছর আগেই। তাতে কী? এখনো তিনি লড়ে যাচ্ছেন কৃষি নিয়ে, দেশের নতুন নতুন ফসলের জাত, নতুন নতুন উদ্ভাবন তাকে আন্দোলিত করে। নতুন কোনো উচ্চ ফলনশীল ফল কিংবা সবজির খবর পেলেই সে বিষয়ে তিনি প্রশিক্ষণ নেন। সেই প্রশিক্ষণের সব মেধা কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দেন। সেই ফসল ফলাতে উদ্বুদ্ধ করেন গ্রামের কৃষককে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কৃষির মাঝেই, কৃষকের মাঝে বেঁচে থাকতে চান তিনি।

default-image

বলা হয়ে থাকে, বাংলাদেশের মানুষ ভিটামিন ‘সি’র অভাব পূরণের জন্য যে লেবু খাবার হিসেবে খায়, তার প্রায় ৫০ শতাংশই লেবু ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়ের ফুলতলা গ্রামের মাটিতে চাষ হয়। কথিত আছে, লেবুর সাম্রাজ্য ফুলতলা গ্রাম। এই ফুলতলার জমিতে কলম্বো, সিডলেস লেবু, পাতিলেবু, লাচিসহ বিভিন্ন জাতের লেবুর সর্বপ্রথম চাষ করেন নুরুল ইসলাম। তাঁকে দেখে লেবু চাষের প্রতি কৃষকেরা উদ্বুদ্ধ হন। ঠিক তখন থেকে নুরুল ইসলাম নিজে তদারক করে কৃষকদের সঙ্গে থেকে লেবু চাষে এক বিপ্লব ঘটান এ গ্রামে। লেবুর চারা লাগানো থেকে শুরু করে গাছের পরিচর্যা, সেচ, রোগবালাই এবং তার প্রতিষেধকসহ প্রতি মাসে নিজ উদ্যোগে ঘরোয়াভাবে কৃষককে প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ দেন নুরু মাস্টার, যা তিনি এখনো অব্যাহত রেখেছেন। শুধু লেবুই না, কলা, বিভিন্ন জাতের আম, আনারস, লিচু, মাল্টাসহ বিভিন্ন ফল ও সবজির সফল চাষ করে নিজে যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন। গ্রামের বেশির ভাগ কৃষকই তাঁর পরামর্শে এখন কৃষিকাজ করে লাভবান হচ্ছেন।

আমের পোকা মারার ফাঁদ গাছে
এবার নুরুল ইসলাম তাঁর ১০ একর জমির মধ্যে ৮ একরে লেবু এবং বাকি ২ একরে আম, কলা, মাল্টা বেগুনসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজির চাষাবাদ করছেন। ফুলতলা গ্রামের নুরু মাস্টারের বাগান ঘুরে দেখা যায়, এবার তিনি আমের জাত বারি ৩, ৪, ৬–সহ বেনানা ম্যাঙ্গো, লিচু, মাল্টা ও লেবুর চাষ করেছেন। বাগানে আমের পাশাপাশি লেবুর ফলনও বাম্পার। (Russell IPM) নামের একটি বিশেষ আমের পোকা মারার ফাঁদ লাগিয়েছেন প্রতিটি গাছে। এতে কোনো কীটনাশক ছাড়াই বিষমুক্ত আম পাওয়া যাবে গাছ থেকে।


করোনার মহামারিকালে মৌসুমি সবজির বাজার কম থাকলেও বাজারে লেবুর দাম তুলনামূলক ভালো, তবে যাতায়াত আর স্থানীয় কিছু অসাধু সিন্ডিকেট না থাকলে লেবুসহ মৌসুমি সবজির দাম ভালো পেতেন বলে জানান নুরুল ইসলাম।


এক ছেলে, এক মেয়ে নুরুল ইসলামের। ছেলে ইলিয়াস উদ্দিনকে কৃষিতে ডিপ্লোমা করে স্থানীয় এনায়েতপুর বাজারে সার, বীজ, কীটনাশকের দোকান দিয়েছেন। সেখানে দোকানের পাশাপাশি কৃষকদের বিনা পারিশ্রমিকে কৃষকের ফসলের খোঁজ নিয়ে বিভিন্ন রোগবালাই থেকে ফসলকে রক্ষার পরামর্শ দেন ইলিয়াস।

কৃষক নুরুল ইসলামের চাওয়া
নুরুল ইসলাম বলেন, ‘জীবনের একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। জীবনের কাছে খুব একটা বেশি চাওয়া–পাওয়া নেই। কৃষিতে নিজেকে বদলেছি, বদলে দিয়েছি ফুলতলা গ্রামকে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কৃষি এবং কৃষকের ভাগ্যবদলের জন্য কাজ করে যাব। ফুলতলা অবহেলিত গ্রাম।’ রাস্তাঘাটে এখনো সমস্যা রয়েছে। কৃষক তাঁর প্রয়োজনীয় ইউরিয়া সার, কীটনাশক সব সময় পান না, এ নিয়ে অভিযোগ করেছি কৃষি অফিসে। করোনার সময় কৃষককে আম লিচু, কলা, লেবুসহ মৌসুমি সবজি বিক্রি করতে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। তাই সরকারের কাছে আবেদন থাকবে, কৃষক যেন তাঁর আবাদকৃত ফসলের দামটা পান, তার পণ্যগুলো যেন সিন্ডিকেটের কবলে না পড়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে সে ব্যবস্থা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেন করা হয়।

default-image

এরশাদের হাত থেকে প্রথম পুরস্কার নেন নুরুল
নুরুল ইসলাম কৃষির ওপর নিয়েছেন সরকারি-বেসরকারি নানা প্রশিক্ষণ। কুমিল্লার বার্ড, ঢাকার খামারবাড়ি, ময়মনসিংহ কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, বগুড়া খামারবাড়ি উপজেলা কৃষি অফিসসহ বিভিন্ন কৃষি গবেষণাকেন্দ্র থেকে বিভিন্ন জাতের ফসলের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ১৯৮৮ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের শ্রীপুর তুলা উন্নয়ন ফার্ম থেকে বৃহত্তর ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে বাছাইকৃত ৩০০ জন চাষির ২১ দিনব্যাপী কৃষি প্রশিক্ষণ শেষে মূল্যায়ন পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রয়াত এইচ এম এরশাদের হাত থেকে এ পুরস্কার গ্রহণ করেন নুরুল ইসলাম।
ফুলবাড়িয়া উপজেলার কৃষি অফিস জানায়, এ বছর প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয় বিভিন্ন মৌসুমি ফলের। এর মধ্যে ৩৬৫ হেক্টর জমিতে লেবুর চাষ হয়েছে।


ফুলবাড়িয়া কৃষি কর্মকর্তা জেসমিন নাহার বলেন, নুরুল ইসলাম একজন সাদা মনের মানুষই নন, একজন আদর্শ কৃষক। ফুলবাড়িয়ায় কৃষিতে তাঁর অবদান রয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কৃষকেরা সবজি কিবাং ফলমূল চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে দেশে খাদ্যঘাটতিসহ পুষ্টিহীনতার একটা বড় সংকট দেখা দিতে পারে।


পৃথিবীতে হানা দিয়েছে করোনাভাইরাস। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থানীয় কৃষি বিভাগ এবং প্রশাসনের সহায়তায় প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের পণ্য যাতে সুষ্ঠুভাবে বাজারজাত করা হয়, তার ব্যবস্থা করা দরকার। পাশাপাশি চাষিদের তালিকা করে প্রণোদনা এবং সুদমুক্ত ঋণের মাধ্যমে চাষাবাদে আরও উদ্বুদ্ধ করে তোলা দরকার কৃষকদের।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0