১৯৭৭ সালে বিয়ের পর নিঘাত ইয়াসমিন বাংলা সাহিত্যে স্নাতক করেছেন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। পুরোদস্তুর গৃহী এই নারীকে পাঠ্য হিসেবে পড়তে হয়েছে চর্যাপদ। বড় মেয়েকেও চর্যাপদ পড়তে শিখিয়েছেন। সে মেয়ে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পুরোনো দিনের বইমেলা নিয়ে নিঘাত ইয়াসমিনের কাছে জানতে চাইলে প্রথম আলোকে বললেন, তাঁর মা রওশন জাহান রহমান ছিলেন লেখিকা ও সমাজকর্মী। বাসায় বই পড়ার চল ছিল খুব। আর সে সময় তো টেলিভিশনে এত চ্যানেল ছিল না। বই-ই ছিল আশ্রয়।

default-image

নিঘাত ইয়াসমিন বিয়ের পর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন। সেই আশির দশকে প্রতি বছরই মেলায় যেতেন। তখন সাধ্য আর শখ অনেক সময়ই মিলতো না। যত বই কিনতে মন চাইতো তত কিনতে পারতেন না। সেই সময়ের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘মেলায় গিয়ে বইপত্র নাড়াচাড়া করতাম, নতুন বই এর গন্ধ শুকতাম। তারপর যা কিছুই কিনতে পারতাম তা নিয়ে দুই জন মনের আনন্দে বাসায় ফিরতাম। কোনো কোনো দিন কিছু না কিনে শুধু ঘুরতাম।’

এরপর এক সময় সন্তান আসে তাঁদের সংসারে। তারপর মেলায় গিয়ে মেয়ের পছন্দের বই খুঁজতেন। তিনি বলেন, ‘একবার এক স্টলে বাবা-মেয়ে বই রেখে চলে এসেছিল। বাসায় ফিরে মেয়ের সেকি কান্না! আমার সেই ছোট্ট মেয়েটি মা হয়েছে। এখন ওর মেয়েরই বই পছন্দ অপছন্দ শুরু হয়েছে। আগে বাচ্চাদের অনেক ভালো বই পাওয়া যেত। এখন বাচ্চাদের পছন্দমতো বই পাই না।’

মেলায় গেলেই প্রথমে মনে পড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের নজরুল মঞ্চের কথা। মনে হয় ওই মঞ্চটাই যেন গ্রন্থমেলার প্রতীক।
––শায়লা সুলতানা, শিক্ষক, সরকারি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা মহাবিদ্যালয়, টাঙ্গাইল

সাহিত্য পড়াশোনা করা নিঘাত ইয়াসমিনের মতে, আগের মেলায় সবার আন্তরিকতা বেশি ছিল। তিনি বলেন, ‘লেখকেরা নিজেরা এসে আলাপ করতেন পাঠকের সঙ্গে। একটা পরিচ্ছন্ন শিক্ষিত ভাব ছিল। এখন বইমেলা পরিসরে বেড়ে অনেক জাঁকজমকও হয়েছে, কিন্তু পাঠক মনে হয় কমেছে। চারদিকে ছেলেমেয়েরা দেখি বই হাতে শুধু সেলফি তুলে। চারদিকে চটপটি আর বারোয়ারি জিনিসপত্রের দোকান। তবুও তিন প্রজন্ম মিলে বইমেলায় যাই, ভালো লাগে।’

default-image

নিঘাত ইয়াসমিন পুরোনো বইমেলার যে সময়ের কথা বলছেন, তখন ‌‘চারদিক’ নামে একটি প্রকাশনী ছিল। এ প্রকাশনীর প্রথম বই ছিল ‘টাপুর টুপুর’ নামে এক উপন্যাস।

১৯৮৪ সালের দিকে কয়েকজন বন্ধু মিলে শুরু করেছিল চার দিক। টাপুর টুপুর উপন্যাসের লেখক সিরাজুল ইসলাম ছিলেন এই প্রকাশকদের একজন। এখন তাঁর বয়স হয়েছে। তিন যুগ আগের বইমেলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বললেন, ‌‘আমাদের সে প্রকাশনার দলে ছিলেন চিত্রশিল্পী কাজী হাসান হাবিব, ইমদাদুল হক মিলন, মুহম্মদ জুবায়ের, ফিরোজ সারোয়ার। তখনকার স্মৃতিময় সে বইমেলা মুড়ির মোয়ার মতো ছিল। মুচমুচে, মিষ্টি যেন মুঠোয় নেওয়া যায়। বইয়ের স্টলে আমরা নিজেরাই বিক্রেতা। কয়টাই বা বই হয় তখন, বেশি আবার হয় কবিতার বই। 'চারদিক'-এর বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি, তখন দেখি এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে টেনে স্টলের কাছে নিয়ে গেছে, দেখি যে 'টাপুর টুপুর' উঠিয়ে বন্ধুকে দেখাচ্ছে। স্পষ্ট শুনলাম বলছে, এই লেখক হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখে। ওটাই যে কতখানি প্রাপ্তি হয়েছিল, বলে বোঝানো যাবে না। সে বইটাও আর এখন আমার কাছে নেই। হঠাৎ সেদিন ফেসবুকে একজন পোস্ট দিয়েছে। দেখে তখনকার বইমেলার কথা মনে এলো।’

আশির দশকের বইমেলার কথা বলতে বলতে সিরাজুল ইসলাম জানালেন, একুশের সংকলনের সঙ্গে বইমেলার সম্পর্কের কথা। বললেন, ‘১৯৭২/৭৩ সালে বুয়েটের ছাত্র ছিলাম, হলে থাকি। মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা কয়েকটা বই নিয়ে বসেছিলেন বর্ধমান হাউসের সামনে। আলাদাভাবে কারই বা তখন চোখে পড়েছে? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একুশে ফেব্রুয়ারি ঘিরে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, কলেজপাড়া, অফিস থেকে বেরোনো ছোট আকারের একুশে সংকলন। একুশের মাঝরাত থেকে শহীদ মিনারের সামনে ব্যাগে নিয়ে চলতো সংকলন বেচা। দিনের শুরুতে এই সংকলন বেচা ছড়িয়ে যেত মিছিল আসা–যাওয়ার পথ ধরে। শহীদ দিবসের সঙ্গে সাহিত্য ও বইয়ের যোগ এই একুশে সংকলন প্রকাশ থেকে। আজকের বইমেলা একুশের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে আছে একুশের সংকলনগুলোর কারণে।’

default-image

সিরাজুল ইসলাম ১৯৭৪ সালে বুয়েট থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি করেছেন। সেটা ছেড়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ খাতে কাজ করেছেন। ২০১৭ সাল থেকে অবসরে গিয়ে ৭১ বছর বয়সী এই মানুষ এখন শুধু সাহিত্য পড়েন ও লেখার কাজ করেন।

সিরাজুল ইসলামদের প্রজন্মের পরও অমর একুশে বইমেলার বয়স বেড়েছে কয়েক বছর। নব্বইয়ের দশকের অমর একুশে বইমেলায়ও এক দিক দিয়ে ঢুকে আরেক দিক দিয়ে ঘুরে আসা যেত বলে জানান টাঙ্গাইলের শায়লা সুলতানা। তিনি সরকারি শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক। নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি মেলায় নিয়মিত যাওয়া শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তেন। থাকতেন রোকেয়া হলে। শায়লা সুলতানার বাবা ছিলেন হাইস্কুলের হেডমাস্টার। সন্তানদের বইমেলায় যাওয়ার কথা শুনলে তিনি খুশি হয়েই টাকা দিতেন বই কিনতে। তবে সে টাকা হিসাব করেই দিতে হতো। তাই শায়লা সুলতানা বছর ধরে একটু একটু করে টাকা জমাতেন মেলা থেকে বই কিনবেন বলে।

default-image

নব্বইয়ের দশকের মেলা কেমন ছিল জানতে চাইলে শায়লা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভিড়টা বেশি ছিল না বলে এখনকার চেয়ে বেশি আপন মনে হতো মেলা।

একবার মেলায় দেখি হুমায়ুন আজাদ স্যার। তিনি তখন আমার সরাসরি শিক্ষক। এটুকু ঘটনাও আমার ভালো লাগল। তবে সে সময়ের বইয়ের সঙ্গে এখনকার বইয়ের কিছু পার্থক্য চোখে পড়ে। আগের দিনের লেখায় তুলনামূলকভাবে গভীরতা বেশি ছিল মনে হয়। এখন কেমন চটজলদি শেষ হয়ে যায় বইগুলো। মেলার পরিসর বড় হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এখন অধিকাংশ বইয়ের স্টলগুলো হয়। এত বই একসঙ্গে পেয়ে ভালো লাগে। তবুও মেলায় গেলেই প্রথমে মনে পড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের নজরুল মঞ্চের কথা। মনে হয় ওই মঞ্চটাই যেন গ্রন্থমেলার প্রতীক।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন