default-image

টিএসসির মোড়ে এসে শোনা গেল ভরাট কণ্ঠে আবৃত্তি ‘হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে...’। একটু এগিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ভেসে আসা কোকিলের কুহুকুহুও শোনা গেল। পঞ্জিকার হিসাবে বসন্ত আসতে বাকি আরও কয়েকটি দিন। কোকিল কি আর পঞ্জিকার হিসাব মানে? এরই মধ্যে বাতাসে বসন্তের গন্ধ। অন্তত বসন্তের দূত জানিয়ে দিচ্ছে, ফুরিয়ে এসেছে শীতের দিন।
আগেও বলা হয়েছিল, যাচাই-বাছাই করে যাঁরা বই কিনতে চান, তাঁদের জন্য এবারের মেলার পরিবেশ চমৎকার। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলে বাংলা একাডেমির পরিসর বেড়েছে, মেলায় স্টলের সংখ্যা বেড়েছে। তবে মেলার ভেতরের পরিসর যত বড়ই হোক না কেন, আগের দুই ছুটির দিনগুলোয় যে প্রচণ্ড ভিড়ভাট্টা হয়েছে, তাতে স্টলে স্টলে খোঁজ নিয়ে পছন্দমাফিক বই কিনতে কিছুটা হলেও বেগ পেতে হয়েছে। এই বিচারে রোববার ছিমছাম ছিল মেলার পরিবেশ। যাঁরা বই কেনার পরিকল্পনা করে এসেছিলেন, তাঁরা বেশ স্বস্তির সঙ্গেই কেনাকাটা করেছেন। আর যাঁরা বেড়াতে এসেছিলেন, তাঁরাও বেশ স্বচ্ছন্দে ঘুরেফিরে, গান শুনে সন্ধ্যা কাটিয়ে গেছেন। মেলার মঞ্চে লোকজ ঘরানার গান শুনিয়েছেন শিল্পীরা।
বিক্রি কোটি টাকা ছাড়িয়েছে: অমর একুশে গ্রন্থমেলার অষ্টম দিনে মেলার প্রথম সপ্তাহে (১ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি) বাংলা একাডেমির নিজস্ব স্টলে বিক্রির হিসাব দেওয়া হয়েছে। এই সপ্তাহে ২২ লাখ ৬১ হাজার ৩৬ টাকার বই বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে অভিধান বিক্রির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি। এ ছাড়া অন্যান্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের হিসাবেও এবার মেলায় প্রথম সপ্তাহের বিক্রি বেশ ভালো। বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি বলেন, ‘প্রকাশকদের কাছে প্রথম সপ্তাহের বিক্রির যথাযথ হিসাবটা পাওয়া যাবে না। তবে আমি বলতে পারি, এর পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে, যা গতবারের তুলনায় অনেক বেশি। পাঠকেরা মেলায় শুধু আসছে না, মনের মতো বইও কিনছে।’
মেলার ঘাড়ে আরেক মেলা: প্রথম সপ্তাহে প্রশংসা করার মতো নিয়ন্ত্রণে ছিল এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান তো বটেই, টিএসসি মোড় থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল মেলা কর্তৃপক্ষের। ইতিউতি দু-একজন হকারের দেখা মিললে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিনিধির বাঁশির কারণে সুবিধা করতে পারেননি তাঁরা। কিন্তু গতকাল ছিল ব্যতিক্রম। শাহবাগ থানা পেরিয়ে টিএসসি মোড়ের দিকে এগিয়ে এলে হাতের বাঁ পাশের ফুটপাতে মিলেছে অসংখ্যা বইয়ের দেখা। সেখানে দেশ-বিদেশের নকল ও নিম্নমানের বই বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ কমিশনে।
এসব পেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলার প্রথম প্রবেশপথটির কাছে এলে হাতের ডান পাশে দেখা গেল আরেক মেলার উপস্থিতি। নাগরদোলার কর্কশ আওয়াজে আগত ক্রেতা ও দর্শকেরা রীতিমতো হোঁচট খেয়েছেন: বইমেলা, না বারোয়ারি মেলার আয়োজন চলছে ওই এলাকায়? পুরি, পেঁয়াজু, চটপটি থেকে শুরু করে চাটি, ছিট রুটি, চালের রুটি, গরুর মাংস, হাঁসের মাংস—কী নেই সেখানে! কারা এসব দোকানের অনুমতি দিয়েছে জানতে চাইলে একটি দোকানের বিক্রয়কর্মী বললেন, ‘সবখানে ম্যানেজ করে এখানে বসছি, আপনারা লেখালেখি করে কিচ্ছু করতে পারবেন না।’ মেলায় আসা মিরপুরের মোস্তফা রানা বলেন, পত্রিকায় পড়েছি, এবারের মেলার মূল অংশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এখানে এসে বারোয়ারি মেলা দেখে আবার ফিরে গেছি বাংলা একাডেমির দিকে। এভাবে বারোয়ারি মেলার আয়োজন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবেশও নষ্ট করা হলো, বইমেলার সৌন্দর্যও নষ্ট করা হলো!’
মেলার ঘাড়ে আরেক মেলার আয়োজন আর বাইরের ‘পাইরেটেড’ বই বিক্রির বিষয়ে যোগাযোগ করতে চাইলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালককে পাওয়া গেল না। প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিভাগ থেকে জানানো হয়, তিনি দেশের বাইরে আছেন। একাডেমির সচিব ও অমর একুশে গ্রন্থমেলার পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. আলতাফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে অংশটুকু টিনের সীমানায় আছে, সেগুলো দেখার দায়িত্ব আমাদের। এর বাইরে দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়।’ এতে মেলার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এমন মন্তব্য শুনে তিনি বলেন, ‘ঠিক আছে, আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করব। পরে তিনি ফোন করে এই প্রতিবেদককে জানান, রমনা কালীমন্দির কর্তৃপক্ষ এই জায়গাটি আলাদা করে ভাড়া দিয়েছে এমন নথিপত্র তাঁর কাছে আছে।
নতুন বই, আলোচনা ও গান: মেলায় গতকাল এসেছে ১৩০টি নতুন বই। গতকাল নজরুল মঞ্চে পাঁচটি নতুন বইয়ের মোড়ক খোলা হয়। নতুন বইয়ের তালিকায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই পাঠকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। যেমন প্রথমা প্রকাশন থেকে আসা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কর্নেলকে কেউ লেখে না। এটি অনুবাদ করেছেন রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী। কর্নেলকে কেউ লেখে না গৃহযুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি দেশের উপাখ্যানই শুধু নয়, তছনছ হয়ে যাওয়া একটি মহাদেশের কাহিনিও বটে। একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে তাহমিমা আনামের দ্য গুড মুসলিম। বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে এসেছে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর শামসুর রাহমান ও বন্ধু, কাকলী থেকে এসেছে আনিসুল হকের মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, অ্যাডর্ন থেকে হাসনাত আবদুল হাইয়ের জাপানের সংস্কৃতি, শুভ্রপ্রকাশ থেকে আহসান হাবীবের কিশোর গল্প সমগ্র ও উপন্যাস সমগ্র ইত্যাদি।
বই বেচাকেনা আর আড্ডার পাশাপাশি গতকালও মেলার মঞ্চে ছিল আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিকেলে মেলার মূল মঞ্চে ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন জন্মশতবর্ষ’ শীর্ষক আলোচনায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিল্প সমালোচক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক ও অধ্যাপক নিসার হোসেন আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সাজেদ ফাতেমীর পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন নকশি কাঁথা পরিবেশন করে সংগীত। এ ছাড়াও গান শোনান কণ্ঠশিল্পী চন্দনা মজুমদার, দিল আফরোজ, আবু বকর সিদ্দিক, বিমান চন্দ্র বিশ্বাস, অনিমা মুক্তি গোমেজ, মো. নূরুল ইসলাম, এনামুল হক ও শাহ আলম।
আজ সোমবার মেলার দরজা খোলা হবে বেলা তিনটায়। চলবে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন