বগুড়ার বাস কাউন্টারগুলো গত শুক্রবার থেকে ঈদ শেষের ফিরতি পথের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু করেছে। প্রায় সব কাউন্টারেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম-সিলেট যাত্রাপথে ঈদ পরবর্তী এক সপ্তাহের টিকিট ফুরিয়ে গেছে শুরুর দিনেই।
অভিযোগ উঠেছে ঈদকে পুঁজি করে বগুড়ার ফিরতি পথের বাসযাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকার বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন পরিবহন মালিকেরা।
টিকিট সংগ্রহকারী ১০-১২ জন অভিযোগ করেন, ঈদের সুযোগ নিয়ে ফিরতি পথে যাত্রীপ্রতি ঢাকা পর্যন্ত ১০০ এবং চট্টগ্রাম-সিলেটের ভাড়া ২০০ টাকা বাড়তি নেওয়া হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের ভাড়াও ২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত আদায় করা হচ্ছে।
বাস মালিক ও কাউন্টার ব্যবস্থাপকদের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঈদের পর রাজধানী ঢাকার পথে নিয়মিত যাত্রাসূচির বাইরেও বিশেষ কোচ ছেড়ে যাবে। এসব কোচে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার যাত্রী গন্তব্যে পৌঁছিয়ে দেওয়া হবে। ফিরতি পথে যাত্রীদের চাপ থাকবে ঈদ-পরবর্তী ১০ দিন পর্যন্ত।
সেই হিসেবে ঈদকে পুঁজি করে প্রতিদিন ১০ হাজার যাত্রীর কাছ থেকে ১০০ টাকা বাড়তি ভাড়া আদায়ের মাধ্যমে কোচ মালিকেরা প্রতিদিন ১০ লাখ এবং ৩১ জুলাই পর্যন্ত ১০ দিনে এক কোটি টাকা বাড়তি নিচ্ছেন।
বাস মালিক ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বগুড়া থেকে রাজধানী ঢাকার দূরত্ব ২২৮ কিলোমিটার। সরকারের বেঁধে দেওয়া প্রতি কিলোমিটারে ১ টাকা ৪৫ পয়সা হসাবে যাত্রীপ্রতি ভাড়া হওয়ার কথা ৩৩০ টাকা ৬০ পয়সা। এর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল ভাড়া সমন্বয় করলে নির্ধারিত ভাড়া ৩৫০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। বছরের অন্য সময় কোচ মালিকেরা বগুড়া থেকে ঢাকার ভাড়া ৩৫০ টাকা আদায় করতেন। ঈদের সুযোগ নিয়ে সেই ভাড়া এখন ৪৫০ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
টিআর ট্রাভেলসের পরিচালক আবদুল মান্নান বলেন, ‘৩৫০ নয়, বগুড়া থেকে রাজধানী ঢাকার সরকার-নির্ধারিত ভাড়া ৩৮০ টাকা। তবে অন্য সময় যাত্রীদের কাছ থেকে ৩৫০ টাকা নেওয়া হতো। কিন্তু ঈদে এই ভাড়া ৪৫০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ৭০ টাকা আদায়ের কারণ ঈদে একমুখী ট্রিপ দিতে হবে। বগুড়া থেকে ঢাকার পথে যাত্রী মিললেও বগুড়ায় ফিরতি পথে খালি বাস নিয়ে আসতে হবে। এতে জ্বালানি খরচ, সেতুর টোল, চালক-শ্রমিকের বেতনসহ কয়েক হাজার টাকা খরচ হয়। যাত্রীদের সুবিধার্থেই টিকিট প্রতি কিছু ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে।’
শুক্রবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, বগুড়ার সাতমাথায় পূর্বঘোষণা অনুযায়ী সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বাস কাউন্টারগুলোতে আগাম টিকিট বিক্রির কথা থাকলেও যাত্রীরা সেহ্রি পর ভোর রাত থেকেই আগাম টিকিটের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
সাতানিবাড়ীর টিআর ট্রাভেলস, সাতমাথার এসআর ট্রাভেলস, শ্যামলী পরিবহন, হানিফ পরিবহন, ডিপজল পরিবহন, স্টেশন সড়কের শাহ ফতেহ আলী পরিবহন, একতা পরিবহনসহ প্রায় সব কাউন্টারেই যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিকিট প্রত্যাশীদের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে।
অধিকাংশ কাউন্টারে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে ঈদ-পরবর্তী এক সপ্তাহের টিকিট ফুরিয়ে যায়। কাউন্টারগুলো থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, ২১ থেকে ২৭ জুলাই যাত্রা তারিখের টিকিট নেই। এতে করে কাঙ্ক্ষিত যাত্রা তারিখের টিকিটের জন্য দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে শেষ পর্যন্ত খালি হাতে ফিরতে হয়েছে অনেককেই।
সকাল নয়টার দিকে শ্যামলী কাউন্টারের সামনে ছিল ফিরতি টিকিট প্রত্যাশীদের প্রচণ্ড ভিড়। এই কাউন্টারে আগাম টিকিট কিনতে আসা সূত্রাপুরের শোভন আহমেদ বলেন, ব্যবসার কাজে ২৩ জুলাই তাঁকে ঢাকায় যেতে হবে। কিন্তু ২৬ তারিখের আগে কোনো টিকিট নেই।
শ্যামলী পরিবহনের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক উত্তম কুমার সাহা বলেন, ঈদ শেষে ফিরতি পথে বগুড়া কাউন্টার থেকে প্রতিদিন ৩২০টি সিট বরাদ্দ রয়েছে। সকাল আটটা থেকে আগাম টিকিট ছাড়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে সাত দিনের টিকিট সব ফুরিয়ে গেছে। এখন ২৭ জুলাই পর্যন্ত কোনো টিকিট নেই। অথচ ২১ থেকে ২৭ জুলাইয়ের আগাম টিকিটের জন্য যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন।
টিআর ট্রাভেলসের পরিচালক আবদুল মান্নান বলেন, প্রতিদিন বগুড়ার যাত্রীদের জন্য ৪৮০টি করে সিট বরাদ্দ। সকাল সাড়ে সাতটায় আগাম টিকিট বিক্রি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই টিকিট শেষ। যাত্রীদের ২৩, ২৪ ও ২৫ জুলাইয়ের টিকিটের জন্য সবচেয়ে বেশি চাপ।
এসআর ট্রাভেলসের সহকারী কাউন্টার ব্যবস্থাপক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, বগুড়া কাউন্টার থেকে প্রতিদিন গড়ে বরাদ্দ ৪৫০ টিকিট। এখন পর্যন্ত ২৫ জুলাই পর্যন্ত কোনো টিকিট নেই। তিনি বলেন, ঈদ শেষে বগুড়া থেকে ঢাকায় সব কোম্পানির কোচ মিলে গড়ে প্রতিদিন ১০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হবে।
শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের কাউন্টারের লাইনে দাঁড়ানো সেউজগাড়ির শাহানা জেসমিন অভিযোগ করেন, সব কাউন্টার ঘুরেও ২৩ জুলাইয়ের টিকিট পাইনি। সবই কাউন্টারের লোকজনের কারসাজি। সব টিকিট তাঁরা কালোবাজারে বিক্রির জন্য রেখে দিয়েছেন। এ ছাড়া অন্য কাউন্টারে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের কোনো টিকিটই ছাড়া হচ্ছে না।
বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘২৫ জুলাই পর্যন্ত এসি-নন এসি কোনো বাসেরই টিকিট নেই।’ বাড়তি ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে তিনি বলেন, অন্য সময় যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া কিছুটা কম নেওয়া হতো, এখন প্রকৃত ভাড়ার সঙ্গে ফিরতি ট্রিপের খালি গাড়ির খরচের সামান্য কিছু খরচ যুক্ত করে টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0