default-image

বিশ্বজুড়েই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এখন একধরনের সংকটের মধ্যে আছে; বৈশ্বিকভাবে গণতন্ত্রের এই সংকটের সূচনা হয়েছে ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এবং তা অব্যাহত আছে ১৪ বছর ধরে। দেশে দেশে এই সংকটের প্রকৃতি এবং মাত্রার পার্থক্য আছে এবং অগণতান্ত্রিক শাসনের বিভিন্ন রূপ তৈরি হয়েছে; কিন্তু এর কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্যও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এযাবৎকাল বিভিন্ন দেশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে এবং এ বিষয়ে সম্পাদিত বিভিন্ন গবেষণায় এসব সাধারণ প্রকৃতি, কারণ এবং পথরেখা নির্ধারণের চেষ্টা হয়েছে, গত কয়েক বছরে গণতন্ত্রের পশ্চাৎ-যাত্রা নিয়ে একাদিক্রমে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এবং বিভিন্ন দেশের সুনির্দিষ্ট পটভূমি বিষয়ে গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। যেসব দেশে গণতন্ত্রের ক্ষয় হয়েছে, যেসব দেশ উল্টোযাত্রায় শামিল হয়েছে, তা নতুন গণতন্ত্র কিংবা প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র যা-ই হোক, সেখানেই এ অবস্থার সূচনা এক দিনে হয়নি, নাটকীয়ভাবেও হয়নি। নতুন কর্তৃত্ববাদ গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে বজায় আছে—আগের যেকোনো সময়ে গণতন্ত্রের সংকটের চেয়ে এ সময়ের সংকটের এই ভিন্নতা লক্ষণীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন কর্তৃত্ববাদ গণতন্ত্রের এক অনিবার্য উপাদান নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সমর্থন ও বৈধতা লাভ করেছে—অনেক ক্ষেত্রে সেসব নির্বাচন হয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, অনেক ক্ষেত্রে সাজানো; গণমাধ্যমের ওপরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ তৈরি হয়েছে, তথ্য নিয়ন্ত্রণের বহুবিধ পথ ক্ষমতাসীনেরা তৈরি করেছেন, ‘ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ’-এর প্রসার ঘটেছে। নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংকুচিত হয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা বিপদের মুখে পড়েছে। কেবল যে নির্বাহী বিভাগের হাতে ক্ষমতার এককেন্দ্রীকরণ ঘটেছে তা-ই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতা এক ব্যক্তির হাতেই অর্পিত হয়েছে। সেসব ব্যক্তিকে তাঁর দল, সমর্থক এবং গণমাধ্যম উপস্থাপন করেছে দেশের সংকটে ত্রাতা হিসেবে, বিকল্পহীন হিসেবে। জনতুষ্টিবাদ বা পপুলিজম, বিশেষত দক্ষিণপন্থী জনতুষ্টিবাদ, রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। এসব ক্ষেত্রে শাসনব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনই প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংবিধানের বিধিবিধানকে বদলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে, আইনসভা হয়ে উঠেছে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হয় সীমিত হয়েছে অথবা বিচার বিভাগ হয়ে উঠেছে নির্বাহী বিভাগের অনুগত প্রতিষ্ঠান।

■ নতুন কর্তৃত্ববাদ গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে বজায় আছে। ■ করোনাভাইরাস ক্ষমতাসীনদের হাতে তুলে দিয়েছে নিপীড়নের ক্ষমতা, ভিন্নমত দমনের ‘যৌক্তিকতা’ ■ বাংলাদেশে সরকারের দেওয়া তথ্যের ব্যাপারে আস্থার অভাব সর্বব্যাপ্ত রূপ লাভ করেছে।
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের তিন দশক

বাংলাদেশের গত তিন দশকের রাজনৈতিক পথপরিক্রমা বিবেচনা করলে দেখা যায়, যে আশাবাদ এবং প্রতিশ্রুতি নিয়ে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রায়ণের সূচনা হয়েছিল, তা থেকে যাত্রাপথ ভিন্ন হয়ে গেছে বললে সামান্যই বলা হয়। এই শাসনব্যবস্থা এখন এমন এক পর্যায়ে এসে উপস্থিত হয়েছে যে এর সমর্থকেরা পর্যন্ত একে আর ‘উদার গণতন্ত্র’ এমনকি ‘নির্বাচনী গণতন্ত্র’ বলতে পারছেন না এবং চাইছেন না। ২০১৪ সালে তাঁদের প্রত্যাশিত শাসন ছিল, তাঁদের ভাষায়, ‘গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব’; ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের আগে একে দেখানো হয়েছিল ‘কর্তৃত্ববাদ এবং উগ্রবাদ’-এর মধ্যে পছন্দ হিসেবে; ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা ও পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় শেখ হাসিনার ‘কর্তৃত্ববাদী’ বলে চিহ্নিত হওয়াকে ‘ব্যাজ অব অনার’ বা ‘সম্মাননা স্মারক’ বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং ২০২০ সালে এসে ক্ষমতাসীন দলের ওপরে প্রভাবশালী বলে পরিচিত একজন লেখক বলছেন, ‘দুর্বল ও আপসকামী গণতন্ত্রের বদলে কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র চাই’, শেখ হাসিনা ‘প্রকৃত কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র এখনো অনুসরণ করছেন না’ এবং ‘শেখ হাসিনাকে কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র আরও কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে’। তারপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগের প্রচলিত একদলীয় ব্যবস্থা ‘বাকশাল’কে ‘জাতীয় ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম’ বলে বর্ণনা করেছেন; একে ‘সর্বোত্তম পন্থা’ বলে মনে করছেন, নির্বাচনে স্বল্পসংখ্যক ভোটার উপস্থিতির সমাধান বলে দাবি করে বলেছেন, ‘(বাকশাল) কার্যকর থাকলে নির্বাচন নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকত না, প্রশ্ন উঠত না।’ ২০১৬ সালে স্ট্র্যাটেজিক ফোরকাস্ট এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে বাংলাদেশ একদলীয় কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ২০১৮ সালে একটি আন্তর্জাতিক সাময়িকী একই উপসংহারে পৌঁছায়। আরেকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ২০১৮ সালে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, ‘বাংলাদেশ কি একদলীয় ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে?’। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে একজন বিশ্লেষক বলেন, বাংলাদেশ এখন কার্যত একদলীয় রাষ্ট্র।

বৈশ্বিক পর্যায়ে গণতন্ত্রের সংকটের এসব বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষাপটে ক্রমান্বয়ে এই প্রশ্নই এখন সামনে আসছে যে এই সংকট থেকে বেরোনোর পথ কী? একইভাবে বাংলাদেশের ক্ষয়িষ্ণু গণতন্ত্রের ধারা, যা ইতিমধ্যে হেজিমনিক ইলেকটোরাল অথরিটারিয়ানিজম বা আধিপত্যশীল নির্বাচনী কর্তৃত্ববাদে রূপ নিয়েছে—তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন হচ্ছে: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে?

সংকটে নতুন মাত্রা: কোভিড-১৯

default-image

গণতন্ত্রের এই সংকটে ২০২০ সালে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯-এর কারণে। মার্চ মাসে মহামারি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পটভূমিকায় এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনায় অনেকেই এটা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে জনস্বাস্থ্যের কথা বলে একনায়কি শাসকেরা এমনকি উদার গণতন্ত্রের কোনো কোনো শাসক জনগণের অধিকার সংকুচিত করবেন। মার্চ মাসে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান যখন সংসদের মাধ্যমে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য জরুরি অবস্থাকালীন ক্ষমতা লাভ করেন, সেই সময়ে এই আশঙ্কা আরও স্পষ্ট হয়। পরে বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নাগরিকের অধিকার সংকুচিত হতে থাকে। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে চীনের ‘সাফল্য’ এবং বিপরীতে ইউরোপের ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্যর্থতা’ এই প্রশ্নের জন্ম দেয় যে মহামারি মোকাবিলায় গণতন্ত্রের চেয়ে কর্তৃত্ববাদ অধিকতর কার্যকর কি না, যা আসলে ‘সহনীয় মাত্রায় কর্তৃত্ববাদের’ দিকেই ইঙ্গিত করতে চাইছে। এই বিতর্কের কোনো চূড়ান্ত উত্তর আমরা এখনো পাইনি, তবে এটা ঠিক, গণতন্ত্রকে আদর্শিকভাবে দুর্বল করতে যাঁরা উৎসাহী, তাঁরা এভাবেই বিতর্কের অ্যাজেন্ডা তৈরি করতে চান। কারণ, এই সুযোগে গণতন্ত্রের ক্ষয় নিশ্চিত করা সম্ভব এবং কর্তৃত্ববাদীদের বৈধতা দেওয়া সহজ।

যেসব দেশে গণতন্ত্রের উল্টোযাত্রা চলছে, সেসব দেশে, যেমন বাংলাদেশেও, ঠিক তেমনভাবেই করোনাভাইরাস ক্ষমতাসীনদের হাতে তুলে দিয়েছে নিপীড়নের ক্ষমতা, ভিন্নমত দমনের ‘যৌক্তিকতা’। প্রচলিত ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ২০১৮-কে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে সরকারের সমালোচকদের শায়েস্তা করতে। এ অবস্থাকে আমি ‘নিপীড়নের মহামারি’ বলে বর্ণনা করেছি। মার্চ মাসে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পর থেকে এই আইনের ব্যবহার হয়েছে। ১ মার্চ থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত কমপক্ষে ১৪৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এই অভিযুক্তদের ২১ শতাংশ হচ্ছেন সাংবাদিক, ২ শতাংশ হচ্ছেন এনজিও-সংশ্লিষ্ট এবং অধিকারকর্মী। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় নেওয়া বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপে অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতি প্রমাণ করে জবাবদিহিহীন শাসনব্যবস্থার ভয়াবহ ক্ষতি এবং কী করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনেরা আনুকূল্যের নেটওয়ার্ক টিকিয়ে রাখেন। মহামারির সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে কেবল যে জনস্বাস্থ্যই অবহেলিত হয়েছে তা নয়, একই সঙ্গে তথ্য নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। যেসব দেশে দো-আঁশলা শাসন গড়ে উঠেছে, সেখানেই দেখা গেছে যে মহামারিতে আক্রান্তের সংখ্যা সঠিকভাবে জানা যায়নি। বাংলাদেশে সরকারের দেওয়া তথ্যের ব্যাপারে আস্থার অভাব সর্বব্যাপ্ত রূপ লাভ করেছে।

গণতন্ত্রের এই সংকটের বিভিন্ন দিক নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, সেখানে এ বিষয়ও গুরুত্ব পাচ্ছে যে এই সংকটের কারণ কী। অবশ্যই প্রতিটি দেশে রাজনীতির বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ এই সংকটের গভীরতা ও ব্যাপ্তি তৈরি করেছে। কিন্তু সাধারণভাবে এর কতগুলো কারণও সুস্পষ্ট। এর অন্যতম দিক হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো। ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা যায় তার উৎস যুক্তরাষ্ট্রে, কিন্তু তা যে কেবল সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছিল তা নয়, এর মধ্য দিয়ে বিরাজমান বৈষম্য এবং কাঠামোগত দুর্বলতা উৎকটভাবে চোখে পড়ে। এর অন্তর্নিহিত কারণ হচ্ছে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এবং মধ্য ১৯৮০-এর দশক থেকে যে অর্থনৈতিক আদর্শ-নিওলিবারেলিজম—দেশে দেশে নীতিনির্ধারণে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ২০০৯ সালে পৃথিবীর ৩৫ শতাংশের বেশি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয় ইঙ্গিত দিয়েছিল যে বিরাজমান ব্যবস্থায় নাগরিকেরা অসন্তুষ্ট। যদিও এক বছর পরে ২০১০ সালে এসে কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, গণতান্ত্রিক দেশগুলো এই সংকট মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে সফল, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত তখনই দেখা গিয়েছিল।

অর্থনৈতিক সংকট ক্ষমতার ওপরে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে অতীতের গবেষণাগুলোর অন্যতম হচ্ছে মিন্সিন পেই এবং ডেভিড এডেনিস্ক-এর ২০০০ সালের গবেষণা। যেখানে তাঁরা দেখান, ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত ৯৩টি অর্থনৈতিক সংকটের ঘটনায় মাত্র ৩০টি ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকট সরকারের বদল ঘটিয়েছে; আর এর মধ্যে ৬টি ক্ষেত্রে ঘটেছে সঙ্গে সঙ্গে, বাকিগুলো ১৮ থেকে ৩০ মাস সময়ের মধ্যে। এই অর্থনৈতিক সংকটগুলো ছিল প্রধানত অভ্যন্তরীণ। ২০০৮ সালের সংকটের মাত্রা এমন ছিল যে সেটা কেবল অর্থনৈতিক সংকট ছিল না, এতে যে বৈশ্বিক ব্যবস্থা এই অর্থনীতির চালক সেটা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল, পুঁজিবাদের এই কাঠামো যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সে বিষয়ে তৈরি হয় সংশয়। কিন্তু লক্ষণীয় যে উদার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভ এবং অসন্তোষ আসলে আরও গণতন্ত্রের দাবি তুলেছে—গণতন্ত্রকে পরিহারের নয়। সংস্কার বা পরিবর্তন যেভাবেই এই দাবিকে প্রকাশ করা হোক না কেন, তার সারমর্ম অংশগ্রহণের, জবাবদিহির। এর অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ২০২০ সালের গ্রীষ্মকালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলন। শুধু তা-ই নয়, মহামারির বিস্তার সত্ত্বেও ২০২০ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে স্মরণকালের মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ এই ইঙ্গিতও দেয় যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নাগরিকেরা তাঁদের রায় দিতে চান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদিও নির্বাচনের ব্যাপারে নভেম্বরের ভোটের আগেই সংশয়-সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা নির্বাচনের ওপরে আস্থা রেখেছেন এবং প্রেসিডেন্টের হুমকি সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচন এবং নতুন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে গণতন্ত্রের যে ক্ষয় ঘটেছে, তাকে সম্ভবত বদলাতে সক্ষম হবে, কিন্তু সমাজের ভেতরে যে গভীর বিভাজন, তা ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের জন্য আরও বড় ধরনের হুমকি তৈরি করবে কি না, সেটা একটা প্রশ্ন। উপরন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আর বৈশ্বিক পর্যায়ে গণতন্ত্রের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও বিবেচ্য। অথচ এ পর্যন্ত বিশ্বে যখনই উদার গণতন্ত্রের প্রসার ঘটেছে, তার প্রতিটি পর্যায়েই গণতন্ত্রের একটি আদর্শিক আধিপত্যশীল বা হেজিমনিক শক্তি উপস্থিত থেকেছে। নতুন বিশ্বব্যবস্থায় সেই ধরনের অবস্থা থাকবে কি না এবং তা উদার গণতন্ত্রের প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারবে কি না, সেটাই এখন গণতন্ত্রের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা দীর্ঘমেয়াদি; কিন্তু এখন করণীয় কী? একসময় যেসব দেশে গণতন্ত্র সুসংহত ছিল এবং যেসব দেশে দো-আঁশলা ব্যবস্থা এখনো প্রবল কর্তৃত্ববাদী রূপ নেয়নি, সেখানে গণতন্ত্রের এই উল্টোযাত্রাকে কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে গণতন্ত্রকর্মী এবং আন্তর্জাতিক সিভিল সোসাইটির মধ্যে চিন্তাভাবনা আছে।

বিজ্ঞাপন

গণতন্ত্রের উল্টোযাত্রা ও করণীয়

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউট কর্তৃক ২০১৯ সালের নভেম্বরে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সমাজ ও রাজনীতির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কী করণীয়, সে বিষয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। গণতন্ত্রের উল্টোযাত্রায় বাধা দেওয়া এবং তার গতিমুখ বদলে দেওয়ার ব্যাপারে সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের, বিরোধী দল বা গোষ্ঠীর, সিভিল সোসাইটি ও স্বাধীন গণমাধ্যমের, ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসা বা প্রাইভেট সেক্টরের, আন্তর্জাতিক সমাজের এবং বিদেশি সরকারের করণীয় বিষয়ে এই গ্রন্থের সুপারিশগুলো লক্ষ করা যেতে পারে। সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাঁরা বলেছেন, তার মধ্যে আছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখার জন্য রাজনীতিতে অর্থের ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ করা, প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা সমুন্নত রাখা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারে সংযম দেখানো; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং বিচারপতিদের নিয়োগ ও বহাল রাখার ব্যাপারে স্বচ্ছ পদ্ধতি তৈরি করা; স্বচ্ছ বিচার বিভাগীয় পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা।

বিরোধী রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাঁদের সুপারিশ হচ্ছে অন্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করা। তাঁরা এই নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে বলেছেন সিভিল সোসাইটির গোষ্ঠীগুলোকে এবং যেখানে সম্ভব যথোপযুক্ত আন্তর্জাতিক সংগঠন ও ব্যক্তিদের। তাঁদের দ্বিতীয় সুপারিশ হচ্ছে যেখানেই সম্ভব সেখানেই বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক বিরোধী জোট গঠন করা এবং গণভোটের জন্য চাপ দেওয়া। নির্বাচন মনিটরিংয়ের জন্য সক্ষমতা তৈরি এবং নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কারের জন্য দাবি তুলতে নির্বাচনের সময় সংঘটিত ব্যত্যয়গুলো প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা। সিভিল সোসাইটি এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের করণীয় তালিকায় আছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাঁরা কী অর্জন করতে চান সাংগঠনিকভাবে তার মডেল তৈরি করা; সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, সুস্পষ্ট ভিশন এবং অর্জনযোগ্য (বা অ্যাকশনেবল) অ্যাজেন্ডা তৈরি করা এবং সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য এবং মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের অহিংস কৌশল গ্রহণ করা। স্বাধীন গণমাধ্যমকে যে চারটি প্রধান বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তাতে আছে গণমাধ্যমগুলোর নিজস্ব পরিচালনা পদ্ধতিতে উন্নয়ন ও স্বচ্ছতা আনা এবং গণমাধ্যমের আত্মসমালোচনার এবং সমালোচক গোষ্ঠী তৈরি করা। আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, তার একটি দিক হচ্ছে মিথ্যা তথ্য প্রচারের মুখোশ খুলে দেওয়ার কাজে স্থানীয় স্বাধীন গণমাধ্যম ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনকে সাহায্য করা এবং এগুলোকে শনাক্ত করার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা।

এই পরামর্শগুলোর কিছু কিছু ক্ষীয়মাণ গণতন্ত্রের জন্যও প্রযোজ্য। গণতন্ত্রকামীদের জন্য এ থেকে শিক্ষা নেওয়ার, কার্যকর কৌশল তৈরির পথ খোঁজার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির। মনে রাখা জরুরি যে বৈশ্বিক এই সংকট যেন কোনো দেশে গণতন্ত্রকে হত্যার বৈধতা না দেয়; যেন স্বৈরাচারী শাসকেরা না বলতে পারেন যে এই প্রবণতা বৈশ্বিক, ফলে এটাই স্বাভাবিক। কোনো রোগ মহামারি হয়ে ওঠার মানে এই নয় যে তা-ই স্বাভাবিক। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পথরেখাকে চিহ্নিত করার কথা বিবেচনা করতে হবে।

(স্থানাভাবে তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হলো না। লেখকের বইয়ে সূত্র যথাযথভাবে উল্লেখিত রয়েছে)

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন