গণরুমে রাখার বিনিময়ে নবীন শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে ছাত্রলীগ নিজেদের মিছিল লম্বা করে। তাদের আশ্রয়ে অনেক অছাত্র ও বহিরাগত হলগুলোতে থাকেন।

তবে ছাত্রদের হলগুলোতে ছাত্রলীগের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ছাত্রীদের হলগুলোতে এটি অনেকটাই কম। কারণ, সেখানে আসন বরাদ্দে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আছে৷

‘গেস্টরুম কালচার’

ছাত্রলীগের ‘অবাধ্য’ হলেই প্রথম বর্ষের ছাত্রদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। ‘অবাধ্য’ শিক্ষার্থীদের বিচারে নিয়মিত হলগুলোর অভ্যর্থনাকক্ষে বসে ছাত্রলীগের ‘আদালত’৷ ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এটি ‘গেস্টরুম কালচার’ নামে পরিচিত।

শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে থাকার ‘আদব-কায়দা’ শেখানোর নামে মানসিক নির্যাতন করা হয় ‘গেস্টরুমে’। কখনো কখনো করা হয় শারীরিক নির্যাতনও। এ ছাড়া কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও ‘বিচারের’ মুখোমুখি হতে হয়।

গত ২৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলে প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে গেস্টরুমে ডেকে নেওয়া হয়। ছাত্রলীগের কর্মসূচি ও গেস্টরুমে না যাওয়ার অভিযোগ তুলে ওই শিক্ষার্থীকে বৈদ্যুতিক বাতির দিকে তাকিয়ে থাকতে বলা হয়। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। নির্যাতনের শিকার আকতারুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের (২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ) ছাত্র। অবশ্য এ ঘটনায় ছাত্রলীগের তিন কর্মীকে বিজয় একাত্তর হল থেকে ছয় মাসের জন্য বহিষ্কার করেছিল হল প্রশাসন।

ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে দেড় শতাধিক গণরুম আছে৷ শুধু গণরুম নয়, ছাত্রদের ১৩টি হলের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলের ২৯৬টি কক্ষের মধ্যে প্রায় সব কটিই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। স্যার এ এফ রহমান হলের ১০৪টি কক্ষের ১০০টিই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে।

মাস্টারদা সূর্য সেন হলের ৩৮৮টি কক্ষের ৭০ শতাংশই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলেও ৩৮৮ কক্ষের বড় অংশই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। ছাত্রদের হলগুলোয় ‘মন্ত্রিপাড়া’ নামে রাজনৈতিক ব্লকও আছে। এগুলোয় ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা থাকেন৷ তাঁদের অনেকেই অছাত্র। ছাত্রলীগের ছত্রচ্ছায়ায় কিছু বহিরাগতও হলগুলোয় থাকেন৷

তবে হল নিয়ন্ত্রণ রাখার কথা স্বীকার করলেও ছাত্রলীগ নেতাদের কেউ নাম উল্লেখ করে বক্তব্য দিতে চাননি।

হল প্রশাসনের প্রায় নির্বিকার ভূমিকার কারণে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের হাতে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের এই প্রক্রিয়া দশকের পর দশক ধরে চলে আসছে। যখন বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তখন একই কাজ করত ছাত্রদল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের দাবি, হলগুলোতে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ আছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঐতিহ্যগতভাবেই প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো চলছে। প্রতিটি হলেই একটি প্রশাসন রয়েছে। সেই প্রশাসনে থাকা প্রাধ্যক্ষ, আবাসিক শিক্ষকেরা তাঁদের কাজ করছেন৷’

৫৫ শতাংশের আবাসনব্যবস্থা নেই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন ৩৭ হাজার ১৮। এর মধ্যে ছাত্র ২০ হাজার ৭৭৩ জন আর ছাত্রীর সংখ্যা ১৬ হাজার ২৪৫। ছাত্রদের জন্য ১৩টি হল ও ২টি হোস্টেলে আসন আছে ১১ হাজারের কিছু বেশি। ছাত্রীদের জন্য ৫টি হল ও ২টি হোস্টেলে রয়েছে ৫ হাজার ৭০০ জনের আবাসনব্যবস্থা। অর্থাৎ মোট শিক্ষার্থীর ৫৫ শতাংশেরই আবাসনব্যবস্থা নেই৷

দীর্ঘ ২৮ বছর অচল থাকার পর ২০১৯ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন হয়। এ নির্বাচনের প্রচারণায় ছাত্রলীগসহ সব প্যানেলের প্রার্থীরাই গণরুমব্যবস্থা উচ্ছেদ করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ছাত্রলীগ-সংখ্যাগরিষ্ঠ ডাকসু (ভিপি ও একটি সম্পাদক পদে জয় পেয়েছিল ছাত্র অধিকার পরিষদ) এ ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি৷ তবে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা জানান, ডাকসু নির্বাচনের ফলে ‘গেস্টরুমে’ মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা কিছুটা কমেছিল৷ কিন্তু ডাকসু মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর এখন তা আবার আগের রূপে ফিরে গেছে৷

হলের কক্ষ দখল ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘হলের কক্ষ দখল বা নিয়ন্ত্রণ—এগুলো রাজনৈতিক টার্ম৷ যেকোনো ঘটনাকে রাজনৈতিক রং দেওয়ার জন্য এবং ছাত্রলীগকে ঘায়েল করার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয়৷ যেসব শিক্ষার্থীর থাকার বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না, তাঁদের জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানাই, দাবি করি এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় তাঁদের সহযোগিতা দেওয়ার চেষ্টা করি৷ এটি আমরা কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিকভাবে সুবিধা নেওয়ার জন্য করি না৷ নবীন শিক্ষার্থীদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়ার জন্য এটি করা হয়৷’

রাজনৈতিক বিবেচনায় হল প্রশাসন

হলগুলোয় প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষক নিয়োগ করা হয় রাজনৈতিক বিবেচনায়৷ ফলে প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকেরা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের প্রতি ‘দুর্বল’ থেকে তাঁদের হল নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেন৷ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন আলোচনা আছে, প্রাধ্যক্ষরা শুধু শিক্ষার্থীদের কাগজপত্র স্বাক্ষর করেই দায়িত্ব শেষ করেন৷ হলের শৃঙ্খলা, মেধার ভিত্তিতে আসন বণ্টন, ক্যানটিনের খাবারের মান ইত্যাদি নিয়ে তাঁদের তেমন মাথাব্যথা নেই৷ আবাসিক শিক্ষকেরাও নিজেদের দায়িত্বপ্রাপ্ত ‘ব্লকে’ যান না৷ এ কারণে বেশির ভাগ আবাসিক শিক্ষার্থীই নিজের ব্লকের আবাসিক শিক্ষককে চেনেন না৷

১৮টি হলের ১৮ জন প্রভোস্টই আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘নীল দলের’ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একইভাবে আবাসিক শিক্ষকদের প্রায় ৯৯ শতাংশই সরাসরি নীল দলের রাজনীতি করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান প্রথম আলোকে বলেন, আবাসিক হলগুলোয় আসন বণ্টন বা সার্বিক ব্যবস্থাপনার খুব কম ক্ষেত্রেই প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ আছে৷ প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের হাতে৷ সাধারণত রাজনৈতিক পরিচয় ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বিবেচনায় প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়৷

এর ফলে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের অনাচারের বিরোধিতা করা বা শিক্ষার্থীদের স্বার্থ দেখার মতো ব্যক্তিত্ববান শিক্ষকেরা প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিবেচনায় থাকেন না৷

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন