পেট্রলবোমায় দগ্ধ রোগীদের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতে ক্যানসারের মতো রোগ ও নানা জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন। এ জন্য হাসপাতাল ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় তাঁদের নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। না হলে শুধু কর্মক্ষমতা হারানো নয়, বিপন্ন হতে পারে জীবনও।
চিকিৎসকেরা বলছেন, পেট্রলবোমায় দগ্ধ ব্যক্তিরা দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন। এঁদের কেউ কেউ দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলতে পারেন। এসব রোগীর বেশির ভাগের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনেক সময় লাগতে পারে। আর পেট্রলবোমা হামলা থেকে বাঁচতে যাঁরা লাফ দিয়ে হাত-পা ভেঙেছেন, তাঁদের চিকিৎসা হবে আরও দীর্ঘ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের মধ্যে ২৮ জন ভবিষ্যতে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন বলে চিকিৎসকেরা মনে করছেন।
দগ্ধ এসব ব্যক্তিদের বেশির ভাগই দরিদ্র এবং ঢাকার বাইরে থাকেন। ফলে তাঁদের পক্ষে নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়া কতটা সম্ভব হবে, সে নিয়ে আশঙ্কা আছে চিকিৎসকদের মধ্যেই। তাঁদের যেকোনো মূল্যে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।
মনোচিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছেন, চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছাড়ার পর বেশির ভাগ ব্যক্তিই গুরুতর মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। দগ্ধ ব্যক্তিদের মানসিক চিকিৎসার বিষয়টি বারবারই উপেক্ষিত থাকছে।
ক্যানসারের ঝুঁকি: চিকিৎসকেরা জানান, যাঁরা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত দগ্ধ হয়েছেন, তাঁরা চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পর নিয়মিত চিকিৎসা না নিলে পোড়া জায়গাগুলো ফুলে উঠতে পারে। এ জায়গাগুলোয় খুব চুলকাবে। এ সময় যদি যথাযথ চিকিৎসা না হয়, তাহলে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এ ধরনের ক্যানসারকে বলা হয় মারজুলিন ক্যানসার। দগ্ধ হওয়ার দুই যুগ পরও এ ক্যানসার হতে পারে।
জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতাল ছাড়ার পর দগ্ধ রোগীদের প্রত্যেককে বিশেষ ধরনের পোশাক পরতে হবে এবং নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শে চলতে হবে। নইলে পোড়া জায়গায় ক্যানসার হতে পারে।
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে ২৮ জনের পরবর্তী সময়ে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। এঁদের ২৫ জনের বয়স ১৮ থেকে ৪২ বছর।
দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা: খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর পেট্রলবোমা ও বোমা হামলায় যাঁরা দগ্ধ হয়েছেন, তাঁদের ১২ জন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ মুহূর্তে যে চারজন সেখানে ভর্তি আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের একটি করে চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। চিকিৎসকেরা তাঁদের অন্য চোখটি বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। এঁদের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। চিকিৎসা শেষে যে আটজন বাড়ি ফিরেছেন, তাঁদের দুজনেরও একটি করে চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া তিনজনকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে চিকিৎসার জন্য ভারতের শংকর নেত্রালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ফেনীর স্কুলছাত্র অনীকও রয়েছে। এই তিনজনেরই চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানান।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিকিৎসকেরা বলেন, আঘাতের কারণে কারও একটি চোখ নষ্ট হলে অন্যটিও নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আঘাত পাওয়ার এক বছর পরও ক্ষতির বিষয়টি বোঝা যেতে পারে। হাসপাতাল ছাড়ার পরও তাঁদের তিন মাস বা ছয় মাস পরপর চিকিৎসকের কাছে আসতে হবে।
কর্মক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা: দগ্ধ ঘা শুকানোর সময় বা চামড়া লাগানোর পর যখন শুকাতে শুরু করে, তখন চামড়ায় টান ধরে। এ সময় নিয়মিত ফিজিওথেরাপি না নিলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ঠিকভাবে না-ও কাজ করতে পারে বলে চিকিৎসকেরা জানান।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যাঁরা পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন, তাঁদের বেশির ভাগই শ্রমজীবী মানুষ। এ তালিকায় আছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, হিউম্যান হলার ও ট্রাকের চালক, নির্মাণশ্রমিক, রংমিস্ত্রি, ফেরিওয়ালা, জামদানি শাড়ির কারিগর। এঁদের বেশির ভাগই ভারী কাজ করেন। এঁদের দু-এক বছর নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিতে হবে। নইলে তাঁরা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অচল হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন চারজনের হাত-পা ভেঙেছে। এঁদের পোড়ার চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙা হাত-পায়েরও চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই চারজনই ভারী কাজ করেন। তবে এঁরাও আর ভারী কাজ করতে পারবেন না।
মানসিক চিকিৎসা: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, দগ্ধ রোগীরা হাসপাতাল ছাড়ার পর তাঁদের একটি বড় অংশ চরম বিষণ্নতায় ভুগবেন। চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবেন না; উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় থাকবেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ অভিহিত করে বলেন, এ দুর্যোগের অসহ্য যন্ত্রণা হাসপাতাল ছাড়ার পরও রোগীদের বয়ে বেড়াতে হবে। এ যাত্রায় তাঁদের সহযাত্রী হবেন কেবল পরিবারের সদস্যরা। অনেকেই তাঁদের কথা ভুলে যাবেন।
মনোচিকিৎসকেরা বলছেন, দগ্ধ রোগীদের মানসিকভাবে সুস্থ করতে সমাজের সমর্থন ও নিয়মিত থেরাপি দরকার হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন