ফিরে দেখা ২১ আগস্ট

ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে গেলাম রক্তগঙ্গায়...

বিজ্ঞাপন
default-image

জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি এসে মোটরসাইকেলটা কোথায় পার্ক করা যায় ভাবছি, এ সময় আদা চাচার গলা, ‘জিয়া বাজান, কই যাও? জলদি আহো...।’ আদা চাচা আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী। বহু বছর নিজের পয়সায় সবাইকে শুকনো আদা কুচি আর পেয়ারা খাইয়ে হয়ে গেছেন প্রিয় ‘আদা চাচা’। নিজের নাম রফিকুল ইসলাম ছাপিয়ে তাঁর নাম হয়ে উঠেছিল ‘আদা চাচা’। যেসব সাংবাদিক অনেক দিন ধরে আওয়ামী লীগ বিট কাভার করেন, তাঁদের কাছে অতি পরিচিত এক ব্যক্তিত্ব এই আদা চাচা। তাঁর দিকে হাত নেড়ে চিৎকার করে বললাম, ‘মোটরসাইকেলটা পার্ক করেই আসছি।’

যে সময়ের কথা বলছি, তা ১৪ বছর আগের ঘটনা। এই দীর্ঘ সময়ে কত কিছু স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে! কিন্তু এই দিনটা ভোলা যে অসম্ভব। প্রতিটি দৃশ্য যেন চোখের সামনে ঘুরে ঘুরে যায়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সেই ভয়াবহ ঘটনা এখনো তাড়া করে ফেরে আমাকে। মোটরসাইকেল পার্ক করে ক্যামেরা হাতে নিয়ে সভাস্থলের দিকে এগোতে থাকলাম। উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ওই সময়ের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার ভাষণের সঙ্গে জনসভার একাংশ নিয়ে একটি ভালো ছবি তোলা। তখনো জানতাম না, সামনে ভয়ংকর কিছু অপেক্ষা করছে, রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে, মানুষের আর্তনাদের মধ্যে বুকভরা বেদনা নিয়ে ক্যামেরা হাতে নিতে হবে।

আমি যেতে যেতেই শুরু হয়ে গেছে সভা। ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে ট্রাকের ওপর বানানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা একে একে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে জিরো পয়েন্ট, গোলাপ শাহ মাজার পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ। এ রকম জনসভায় ফটোসাংবাদিকদের মধ্যে কঠিন প্রতিযোগিতা হয়, কে কার চেয়ে ভালো পজিশনে দাঁড়াতে পারে, যাতে ভালো একটা ছবি তুলতে পারা যায়। গিয়ে দেখি, আমি ছাড়া বাকি ফটোসাংবাদিকেরা প্রত্যেকে ভালো পজিশনে দাঁড়িয়ে পড়েছেন।

আমি যখন বাধ্য হয়ে ভালো একটা পজিশন খুঁজছি, তখনই চলে এল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার গাড়ি। ট্রাকের পেছনে লাগানো কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নেত্রী উঠে গেলেন। মঞ্চে উঠেই সাধারণত ভিআইপি নেতা-নেত্রীরা হাসিমুখে সবার উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিনন্দন জানান, ফটোসাংবাদিকদের নজর থাকে ওই হাসিমুখে হাত নাড়া আর শ্রোতা—এই দুটোর ছবি তোলা। শেখ হাসিনা ট্রাকে উঠে হাত নাড়তে শুরু করেছেন। কিন্তু আমি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যেখান থেকে ক্যামেরায় শেখ হাসিনাকে পাওয়া গেলে দর্শক পাওয়া যায় না, দর্শক পাওয়া গেলে শেখ হাসিনা বাদ পড়েন। মহা মুশকিল! আমি ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে ট্রাকের চারপাশ ঘুরে এলাম ভালো পজিশনের খোঁজে।

default-image

শেখ হাসিনার বক্তৃতা শুরু হয়ে গেছে। একটু অপেক্ষা করে টুক করে ট্রাকের ওপরই উঠে পড়লাম। সেখানে শেখ হাসিনার কাছাকাছি আরও কয়েকজন ফটোসাংবাদিক অবস্থান নিয়েছেন। এটিএন বাংলার ক্যামেরাও দেখা যাচ্ছে। দলের নেত্রীকে ঘিরে রয়েছেন অন্তত ১০ জন কেন্দ্রীয় নেতা। শেখ হাসিনা কী বক্তৃতা করছেন, সেগুলো অবশ্য আমার মাথায় ঢুকছে না। আমার একটাই টার্গেট—শেখ হাসিনাকে ফ্রেমের একপাশে রেখে দর্শকদের নিয়ে ভালো একটা ছবি তোলা। ছবিটা হয়ে গেলেই দৌড়ে চলে যেতে হবে জিরো পয়েন্ট, বক্তৃতা শেষে যে মিছিল বের হবে, সেখান থেকে সেটা ধরতে হবে, মিছিলের ছবি তুলতে হবে। কিন্তু ট্রাকে এত মানুষ যে ডানে-বাঁয়ে হাজার কসরত করেও ভিউ ফাইন্ডারে মনের মতো একটা ফ্রেম খুঁজে পেলাম না। বক্তৃতা প্রায় শেষ, কয়েকজন ফটোসাংবাদিক আর আওয়ামী লীগ নেতা এর মধ্যে নেমেও গেছেন। আমিও বিরক্ত, ধুর, নেমে গিয়ে বরং জিরো পয়েন্টে মিছিলটা ভালো করে ধরার জন্য তৈরি হই। ট্রাকের বাঁ পাশে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে অবস্থান নিয়েছেন আইভি রহমানসহ মহিলা আওয়ামী লীগের কর্মীরা। সেখান দিয়ে নামার জায়গা না পেয়ে ঘুরে ট্রাকের উল্টো দিকে এসে লাফ দিয়ে নামব, এমন সময় কী মনে করে জানি আবার ঘুরলাম: আরও দুটো ক্লিক করে যাই।

দুটো নয়, আরও দশটা ক্লিক করলাম। শেখ হাসিনার বক্তৃতা শেষ। তাঁর হাতে একটা কাগজ, সেখানে মনে হয় বক্তৃতার পয়েন্টগুলো লেখা, সেটা এক হাতে ভাঁজ করতে করতে তিনি মাইকের সামনে থেকে মুখটা শুধু ঘুরিয়েছেন, ওই সময় ট্রাকের ওপর থেকে যাওয়া ফটোসাংবাদিকেরা চিৎকার করে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আরেকবার পোজ দেওয়ার জন্য, ‘আপা, আপা...!’ কিন্তু আপার সঙ্গে তখনো চোখাচোখিও হয়নি, এর মধ্যেই ‘ধুপ’ করে ছোট একটা শব্দ হলো ট্রাকের ডান কোনায়, একটু আগেই যেখানটাতে আমি লাফ দিয়ে নামার কথা ভাবছিলাম। কয়েক বছর ধরে হরতাল, সংঘর্ষ, ভাঙচুর, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া আর পিকেটিংয়ের অ্যাসাইনমেন্ট করতে করতে কোনটি বোমার শব্দ, কোনটি কাঁদানে গ্যাসের শেল বা গুলির আওয়াজ—এগুলো চিনে ফেলেছি। কাজেই আওয়াজটা শুনে মনে হলো, ট্রাকের পেছনের দিকের কোনো টায়ার ফেটে গেছে বুঝি। উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম, ঘটনা কী, কোন চাকাটা ফেটেছে। এর মধ্যেই কাছাকাছি কয়েক ফুটের মধ্যে একই রকম আরেকটা আওয়াজ। প্রথম আওয়াজের খুব বেশি হলে দুই সেকেন্ড পর।

default-image

এরপর একই সঙ্গে অনেকগুলো ঘটনা ঘটতে শুরু করল। ট্রাকের চারপাশে ঠাসাঠাসি করে মানুষ গিজগিজ করছিল, আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গেই যে যার মতো ছিটকে সরে সরে যাচ্ছে। কয়েকজন রাস্তার ওপর শুয়ে পড়েছে। ট্রাকের পাশে কুণ্ডলী পাকানো ধূসর ধোঁয়া। মানুষের চিৎকার, হুটোপুটি, কান্নার আওয়াজ—সবকিছু ছাড়িয়ে আমি সচকিত হয়ে উঠলাম, শেখ হাসিনা কেমন আছেন? শেখ হাসিনাকে ভালো করে দেখা হলো না। কোথা থেকে কে কীভাবে ধাক্কাটা দিল, খোদা জানেন। আমি চিত হয়ে পড়ে যেতে লাগলাম। পড়ে যেতে যেতেই দেখলাম, মাত্র তিন ফুট দূরে শেখ হাসিনাকে বসিয়ে দিয়ে একজন দেহরক্ষী আর কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা মানববর্ম হয়ে তাঁকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছেন। আমি যে সোজা হয়ে পড়ে যাব, সেই উপায়ও ছিল না। নেতাদের বসার জন্য ট্রাকের ওপর এলোমেলো করে অনেকগুলো প্লাস্টিকের চেয়ার রাখা। আমি পড়লাম সেগুলোর ওপরে। এই সময়েও মাথা কাজ করছে, বাঁ কাঁধে ঝোলানো ক্যামেরার ভারী ব্যাগটা বাঁ হাত দিয়ে যত্ন করে ধরে রেখেছি, যাতে জোরে আঘাত না পায়, আর ডান হাতে সাবধানে উঁচু করে রেখেছি নাইকন ডিজিটাল ডি-৭০ ক্যামেরাটা।

মানুষ পড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, আমার সেই সুযোগও হলো না। ফটোসাংবাদিক, যাঁরা তখনো ট্রাকে রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁরা তাল হারিয়ে আমার ওপরে এসে পড়েছেন। এর মধ্যেই পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি, বৃষ্টির মতো ধুপধাপ সেই অপরিচিত আওয়াজ। সেই সঙ্গে মানুষের চিৎকার, কান্না। এর মধ্যে হঠাৎ টানা গুলির আওয়াজ। আমার ওপরে যাঁরা পড়েছিলেন, তাঁদের চাপে এমনিতেই আমার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার দশা, গুলির আওয়াজ শুনে তাঁরা জীবন বাজি রেখে নিচের দিকে আরও চাপতে লাগলেন। যেন ট্রাকের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে পারলেই এ যাত্রা বেঁচে যাওয়া যাবে। তাঁরা যত নিচের দিকে ঠেলে, না পেড়ে আমি ততই তাঁদের ওপরের দিকে ঠেলি। একপর্যায়ে কোনো সন্দেহ রইল না, গুলিতে যদি না-ও মরি, মানুষের শরীরের চাপে আমি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে মারা যাব।

এর মধ্যেই দেখি, কে একজন ফটোসাংবাদিক এক হাতে তাঁর ক্যামেরাটা উঁচু করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ক্লিক করে যাচ্ছেন। ঘোরতর জীবন–সংশয়ের মধ্যে আমারও কর্তব্যবোধ জেগে উঠল, ক্যামেরাটা তো উঁচু করাই ছিল, ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে গেলাম রক্তগঙ্গায়। শাটার বাটনটা চেপে এবার ক্যামেরাটা এদিক-ওদিক ঘোরাতে লাগলাম। ডিজিটাল ক্যামেরায় খটাখট ছবি উঠতে লাগল।

ওইভাবে কতক্ষণ ছিলাম, জানি না। পরে শুনেছি, খুব বেশি হলে টানা দুই-আড়াই মিনিট। আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল। অপরিচিত শব্দ বৃষ্টি থেমে যাওয়ারও অনেকক্ষণ পর আমার ওপরে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা উঠে দাঁড়ালেন। ট্রাকে দাঁড়ানো আমরা কয়েকজনই মনে হলো অক্ষত আছি, বাকিদের শরীর থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে, চেনা যাচ্ছে না কাউকে। উঠে দাঁড়িয়ে ট্রাকের চারপাশে তাকিয়ে আমার মনে হলো, বিদেশি কোনো যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি দেখছি বুঝি। একটু আগেই ছিল কী সুন্দর লোকে লোকারণ্য, এখন সেখানে বহু মানুষ শুয়ে কাতরাচ্ছে। প্রত্যেকে রক্তাক্ত। রক্তে লাল হয়ে আছে পুরো রাস্তা।

default-image

ট্রাক থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমেছিলাম না লাফ দিয়ে এখন আর মনে নেই। কান ঝাঁ ঝাঁ, মাথার ভেতর ড্রামের দ্রিম দ্রিম, চোখেও ঝাপসা দেখছিলাম। এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আহত মানুষদের মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ বের হচ্ছে, জোরে চিৎকারও করতে পারছে না। পকেট থেকে মোবাইল বের করে কাকে জানি ফোন করার চেষ্টা করছি, কাকে করছি এখন আর মনে নেই। কী করব, সেই চেতনাও নেই। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের এই মাথা থেকে ওই মাথায় আহত লোকজনের গা বাঁচিয়ে মনে হয় শুধু দৌড়াদৌড়ি করছি। ফোনে মনে হয় কাউকে পেলাম না। গলা শুকিয়ে আসছে। এত রক্ত! এত রক্ত!

এভাবে কতক্ষণ পেরিয়েছে, বলতে পারব না। বিক্ষুব্ধ কর্মীরা ক্রুদ্ধ হয়ে এর মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি ভাঙচুর শুরু করে দিয়েছে। কোথাও কোথাও আগুনও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকজন মানুষ আমাকে সাংবাদিক হিসেবে চিনতে পেরে ছুটে এসে চিৎকার করে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, ‘এই যে ভাই, ওইখানে একটা আস্ত গ্রেনেড পড়ে আছে। ওটার ছবি তোলেন তাড়াতাড়ি...।’

বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম। কর্তব্যবোধ জাগি জাগি করছে, কিন্তু কোথায় জানি কী একটা সমস্যা হয়ে গেছে, ধরতে পারছি না। ক্যামেরা চোখে নিলাম, ক্লিক করতে শুরু করে দিয়েছি। চারপাশে এত আহত মানুষ, কাকে রেখে কার ছবি তুলব? কেন ছবি তুলব? মাথার মধ্যে সবকিছু জট পাকিয়ে গেছে।

ট্রাকের বাঁ পাশে দেখতে পেলাম আইভি রহমানকে, বিমূঢ় হয়ে পড়ে আছেন, তাঁর দুই পা-ই মনে হচ্ছে উড়ে গেছে। তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছেন আরও কয়েকজন নারী। আহত, না নিহত বোঝার উপায় নেই। ট্রাকের ডান দিকে দেখলাম, সাদা শার্ট পরা একজন বিশালদেহী মানুষ উপুড় হয়ে পড়ে আছেন, নিথর দেহ। পড়ে থাকার ভঙ্গিই বলে দিচ্ছে, প্রাণ নেই ওই শরীরে। বুড়ো একজন মানুষ পড়ে আছেন একপাশে, সাহায্যের জন্য হাত বাড়াচ্ছেন, রক্তাক্ত হাত। কম বয়সী আরেকজন রক্তের মধ্যে শুয়ে চিৎকার করার চেষ্টা করছে, তাঁর গলা দিয়ে কোনো স্বর বেরোচ্ছে না। সবাই সাহায্যের জন্য আকুতি জানাচ্ছেন। কাকে রেখে কাকে সাহায্য করব। সাহায্য করব, নাকি ছবি তুলব। তৎপর লোকজন অবশ্য এর মধ্যেই আহত ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। একজন গোয়েন্দাকেও দেখলাম ওয়ারলেসে কাকে জানি কী বলছেন, আরেক হাতে একজন আহত ব্যক্তিকে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন।

মানুষের আর্তনাদে কি বাতাস ভারী হয়ে ওঠে? শ্বাস নিতে কষ্ট হতে থাকে? ট্রাকের ডিজেলের ট্যাংক ফুটো হয়ে গেছে, সেই ফুটো দিয়ে বড় বড় ফোটায় তেল পড়ছে। আগুন কেন এখনো লাগেনি, সেটাই আশ্চর্য। কালো ডিজেলের স্রোত এগিয়ে চলেছে আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে ড্রেনের দিকে। সেখানে আরেকটা তরল স্রোতও এসে মিশেছে। সেই স্রোতের রং লাল। রক্ত। লাল আর কালো। সব মিলিয়ে বীভৎস দৃশ্য।

সেদিন রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে যেতে হলো নিহত ব্যক্তিদের অবস্থা জানতে এবং সম্ভব হলে আহত ব্যক্তিদের ছবি তুলে আনতে। ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় নিহত ব্যক্তিদের লাশ আড়াআড়িভাবে ফেলে রাখা হয়েছে। সব কটি লাশের সামনে গিয়ে দেখছি পরিচিত কেউ মারা গেছেন কি না। ঘটনাস্থল থেকে চলে আসার সময় দেখেছিলাম, অনেক আহত অনেক ব্যক্তিকে ভ্যানে করে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে, তাঁদের অনেককে দেখেই মনে হয়েছিল হয়তো বেঁচে যাবেন। কিন্তু দেখলাম তাঁদেরও অনেকে মারা গেছেন। একজন বৃদ্ধের লাশও দেখলাম, রক্তাক্ত দাড়ি। এক নজর দেখেই উঁকি দিলাম পরের লাশটার দিকে।

পেছন থেকে কে একজন বলে উঠল, ‘ইনারে চিনছেন? চিনেন নাই? আপনেগো আদা চাচা!’

আমি ঝট করে ফিরলাম বুড়ো মানুষটার লাশের দিকে। রক্তাক্ত মুখটার আড়ালে সত্যি সত্যি আমাদের প্রিয় আদা চাচার মুখ। এতগুলো মৃত্যু সামনাসামনি দেখেও আমি সেভাবে ভেঙে পড়িনি, একবারও মৃত্যুভয় জাগেনি। আদা চাচাকে দেখে আমার দুই চোখে অশ্রুবান ডাকল।

১৪ বছর পর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় হয়েছে। কিন্তু যাঁদের হারিয়েছি, যে পরিবারগুলো স্বজন হারানোর ব্যথা নিয়ে দুঃসহ দিন যাপন করছে, যাঁরা আহত হয়ে পঙ্গু জীবন যাপন করছেন, তাঁদের কথাই আজ বারবার মনে হচ্ছে। যা তাঁরা হারিয়েছেন, তা কি তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন