ম্যানগ্রোভ বন—সবুজে মোড়া সুন্দরবন। সুন্দরবনের খুলনা অঞ্চলের কালাবগি এলাকায়। 
২০১৮ সালের মার্চে
ম্যানগ্রোভ বন—সবুজে মোড়া সুন্দরবন। সুন্দরবনের খুলনা অঞ্চলের কালাবগি এলাকায়। ২০১৮ সালের মার্চে ছবি: সাদ্দাম হোসেন

ক্রিকেট খেলায় ‘বাঘ’দের জয়ে সবাই আহ্লাদিত! বাঘের নিবাস সুন্দরবন বিশ্ব–ঐতিহ্যে স্থান পেয়েছে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শ্বাসমূল বন। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয় সুরক্ষাবলয় হিসেবে সুন্দরবন গত বছরের ঘূর্ণিঝড় আম্পানেও ঢাল হিসেবে এগিয়ে এল। ভালোবাসার সুন্দরবনে ‘উন্নয়নের’ নামে পরিবেশগত দিক থেকে সংকটজনক এলাকায় বিভিন্ন শিল্পকারখানা গড়ে উঠছেই! সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য এবং বনের পরিধির বড় রকমের নেতিবাচক পরিবর্তন হচ্ছে। গত দুই দশকে (২০০০-২০) বনের ঘনত্ব হ্রাস পেয়ে অনেক অঞ্চল পতিত জমিতে পরিণত হচ্ছে।

ছোট হয়ে আসছে সুন্দরবন

সুন্দরবনের একটি অঞ্চলে দশকওয়ারি বনের বিস্তার ও ঘনত্বের ওপর সম্প্রতি একটি গবেষণা চালিয়ে বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন অন্বেষণ জানাচ্ছে, বনে গাছপালার পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে যাচ্ছে। বন উজাড় হয়ে ফাঁকা বা পতিত জমির পরিমাণ বাড়ছে। দুই দশকে (২০০০-২০) ঘন বনের পরিমাণ কমেছে প্রায় অর্ধেক। প্রথম দশকে (২০০০-১০) ব্যাপক হারে ঘন বন উজাড় হয়ে গাছপালার ঘনত্ব পাতলা হয়ে যায় এবং কমতে থাকে বনের বিস্তার। তবে এ সময়ে পতিত জমি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু পরবর্তী দশকে (২০১০-২০) প্রায় দ্বিগুণ হারে খালি বা পতিত জমির পরিমাণ বেড়েছে। বনের চারপাশে গাছপালা দেখা গেলেও ভেতরে ব্যাপক অঞ্চলজুড়ে একদম ফাঁকা বা যৎসামান্য গাছপালার উপস্থিতি। বর্তমানে বনের বিস্তার আগের তুলনায় কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ১৭৭৬ সালে বাংলাদেশ অংশের পুরো বনের বিস্তার ছিল ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার। ২০১৬ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশের পুরো বনের বিস্তার ৬ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার।

খুলনার কয়রা উপজেলায় ‘উন্নয়ন অন্বেষণে’র গবেষণাটি করা হয়েছে। নির্বাচিত অঞ্চলটির দৈর্ঘ্য ৪০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ৩০ কিলোমিটার। বনজীবীদের অংশগ্রহণমূলক ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থার মাধ্যমে এটি করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ এবং ইউরোপীয় কমিশনের কোপার্নিকাস প্রোগ্রাম থেকে সংগৃহীত বেশ কয়েকটি রিমোট সেন্সিং চিত্রও এতে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিপদগ্রস্ত জীববৈচিত্র্য

বৈশ্বিক পরিস্থিতির তুলনায় জীববৈচিত্র্য হ্রাসের হার বাংলাদেশে বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব অনুসারে বিশ্বজুড়ে ২০০০-২০১৫ সময়কালে প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বন উজাড় হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশ ২ দশমিক ৬ শতাংশ বন হারিয়েছে। জাতিসংঘের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের ৮০ লাখ উদ্ভিদ-প্রাণী প্রজাতির ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বিলুপ্তির মুখোমুখি। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ইউনিয়ন আইইউসিএনের হিসাবে, ১৬১৯ প্রাণ-প্রজাতির ২৪ শতাংশ খুব শিগগির অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

সুন্দরবনের বিস্তার ক্রমশ ছোট হয়ে আসায় অনেক উদ্ভিদ প্রজাতির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। সুন্দরবনের সুন্দরীগাছ সবচেয়ে বেশি কমছে। উদ্ভিদবৈচিত্র্য হ্রাসের কারণে বিভিন্ন প্রাণীর অস্তিত্বও হুমকির সম্মুখীন। গাছগুলোর গড় উচ্চতা হ্রাস পাচ্ছে। এ কারণে পাখি, বানর এবং গাছে বসবাসকারী এ–জাতীয় প্রজাতির অনেক প্রাণীর বাসস্থান হুমকির মুখে পড়েছে।

সুন্দরবনে বৈশ্বিকভাবে বিপদগ্রস্ত বন্য প্রাণীর প্রায় ৩১টির বেশি প্রজাতি রয়েছে। বন বিভাগের তথ্য বলছে, বিপদগ্রস্ত বন্য প্রাণী প্রজাতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বেঙ্গল টাইগার, অজগর, রাজগোখরা, অ্যাডজুটেন্ট স্টর্ক পাখি বা হাড়গিলা, সাদা পেটের সমুদ্র ইগল, দুই প্রজাতির উদ্‌বিড়াল, মাসকেড ফিনফুট বা কালামুখ প্যারাপাখি, রিং লিজার্ড, মেছো বাঘ, স্যান্ডপাইপার বা চামচঠুঁটো বাটান পাখি, ইগল এবং লেজার অ্যাডজুটেন্ট বা মদনটাক পাখি ইত্যাদি। আইইউসিএনের হিসাব অনুযায়ী, মোট ৪০টিরও বেশি প্রজাতির উভচর, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীকে মহাবিপন্ন বা সংকটাপন্ন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

‘বেঙ্গল টাইগার’কে আইইউসিএন ইতিমধ্যেই মহাবিপন্ন প্রজাতি ঘোষণা করে ভবিষ্যতে বিলুপ্তির দিকে ধাবিত বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে। ২০০৪ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ৪৪০। বন বিভাগের সর্বশেষ ২০১৯ সালের জরিপে ১১৪টি বাঘ গণনা করা হয়। বাঘ সংরক্ষণ বড় জরুরি। বনে বাঘ না থাকলে ক্রিকেটের বাঘ নিয়েই আত্মতৃপ্তিতে থাকতে হবে। হিমালয়ের দেশ নেপাল চার বছর আগেই বাঘ দ্বিগুণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে ফেলেছে। ভারতও দ্বিগুণ করার কাছাকাছি চলে এসেছে। বাংলাদেশে বন অধিদপ্তর বাঘ রক্ষায় নানা কার্যক্রম গ্রহণ করছে। কয়েকটি বেসরকারি সংস্থাও বাঘ সংরক্ষণে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।

কমছে জলজ প্রাণী

সুন্দরবনের সামুদ্রিক ও জলজ প্রাণী আগের তুলনায় অতিরিক্ত পরিমাণে আহরিত হচ্ছে। বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে নানা জলজ প্রাণী। ঝুঁকির মধ্যে অধিকাংশ পাখনাযুক্ত (ফিনফিশ) এবং শামুকজাতীয় (শেলফিশ) মাছ।

default-image

বৈশ্বিকভাবে বিলুপ্তপ্রায় বাটাগুর বাসকা প্রজাতির কচ্ছপ সুন্দরবনে পাওয়া গেলেও এখন মহাবিপন্ন। এ ছাড়া গাঙ্গেয় ডলফিন, ইরাবতী ডলফিন এবং লোনাপানির কুমির প্রজাতিও বিপন্ন। বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত নিবন্ধে সুন্দরবনের বন্য প্রাণীদের নানা সংখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু বাঘ আর ডলফিন ছাড়া অন্য কোনো প্রাণীদের নিয়মিত জরিপ সুন্দরবনে হয় না। ফলে এসব প্রাণীর হালনাগাদ তথ্য এবং সংখ্যাও জানা কঠিন হয়ে গেছে। স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সুন্দরবনের সম্পদ এসব জীববৈচিত্র্যের সংখ্যার নিয়মিত হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশিত হওয়া উচিত। এতে সুন্দরবনের কার্যকরী সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আইইউসিএন ও এর কমিশন সদস্যদের সংশ্লিষ্ট করা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বন ধ্বংসের প্রধান কারণগুলো

মানবসৃষ্ট চাপ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেই মূলত সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির সম্মুখীন। প্রথমত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠী অবৈধভাবে বন দখল করছে। বনের চারপাশে ক্রমশ মানুষের বসতি বাড়ছে। অভয়ারণ্য বা স্থগিতাদেশ থাকলেও অবৈধভাবে গাছ কাটার কারণে বন উজাড় হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বনের চারপাশে—এমনকি পরিবেশগত দিক থেকে সংকটজনক এলাকার (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) মধ্যেও দিন দিন নানা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাছে। তৃতীয়ত, বনজ সম্পদের অতিরিক্ত আহরণের কারণে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। আবার ক্ষতিকর পন্থায় সম্পদ আহরণের কারণেও অনেক প্রজাতি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। যেমন অহরহ বিষ প্রয়োগ, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার করে মাছ সংগ্রহ করা হয়। চতুর্থত, সহ–ব্যবস্থাপনার কথা বলা হলেও বিদ্যমান বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি বনজীবীদের অধিকার এবং প্রথাগত জ্ঞানকে ক্রমশ প্রান্তিক করে ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবার সম্পদ আহরণের সময় তাঁদের নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে বন বিভাগ থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণের বাইরে সম্পদ আহরণে লিপ্ত হচ্ছে। পঞ্চমত, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাতে জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। ষষ্ঠত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বনের নানা জৈব ও অজৈব উপাদান (যেমন লবণাক্ততা, বৃষ্টিপাত, মাটির পিএইচ, খনিজ উপাদান ইত্যাদি) পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে বাস্তুসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সপ্তমত, বনজীবীদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও প্রথাগত টেকসই পন্থাগুলো ব্যবহৃত হলে সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহার—উভয়ই উন্নত হতো।

বন সংরক্ষণে আইন যুগোপযোগীকরণ

বন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বন আইনের যুগোপযোগীকরণ ও প্রয়োগের দরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বন আইন ২০১৯ প্রণীত খসড়ার বিভিন্ন দিকের ওপর সর্বসাধারণের মতামত চাওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই আইইউসিএনের বাংলাদেশ জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে কিছু মতামত ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।

বন সংরক্ষণে বনবাসী ও বনজীবীদের বিভিন্ন ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও প্রথাগত টেকসই পন্থাগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক বন ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে চর্চা বাড়াতে পারলে বন ও বনভূমির সংরক্ষণ ত্বরান্বিত হবে। বন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার এবং বনজীবীদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। বন আইন যুগোপযোগীকরণে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আইনের প্রতিপালনও জরুরি। বন উজাড়, দখল এবং বনাঞ্চলে বন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দরকার রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি।

প্রয়োজন প্রকৃতি–মানুষের আন্তসম্পর্ক

সুন্দরবন নিরবচ্ছিন্নভাবে অগণিত সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কাজ করছে উপকূলীয় সুরক্ষাবলয় হিসেবে। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের ঐশ্বর্য, মর্যাদা এবং ঐতিহ্য তুলে ধরতেও সুন্দরবনের ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বনের গুণগত মানে নেতিবাচক পরিবর্তন হওয়ায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, বায়ুদূষণ কমানোর সক্ষমতা এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য ইত্যাদি হ্রাস পাচ্ছে।

করোনাক্রান্তির শিক্ষা প্রকৃতি ও মানুষের আন্তসম্পর্কের লালন ও পালন। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা অতি জরুরি। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে আন্তসম্পর্ক, পরস্পর–নির্ভরশীলতা ও সহযোগিতা ফিরিয়ে আনা গেলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাবে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকবে এবং মানুষ ও পরিবেশ উভয়েরই ভালো থাকা নিশ্চিত হবে। মানুষ যেমন প্রকৃতি ধ্বংসে দায়ী, তেমনই মানুষের চেষ্টাতেই প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

লেখক: রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’–এর চেয়ারপারসন। আইইউসিএন এশীয় অঞ্চলের সদস্যদের কমিটির ভাইস চেয়ারপারসন এবং বাংলাদেশের আইইউসিএন জাতীয় কমিটির চেয়ারপারসন।

rt@du.ac.bd

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন