বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অভিযোগ পাওয়া গেছে, এই নিয়োগ–বাণিজ্যের পেছনে পেছনে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন ক্রীড়া পরিদপ্তরের পরিচালকের একান্ত সহকারী বখতিয়ার খলজি। জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ১০ জনের ১ জন তাঁর ছোট ভাই মো. মুনিরুজ্জামান। এর আগে বখতিয়ার খলজির স্ত্রী সাইফুন নাহার অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পান। এসব অভিযোগের বিষয়ে বখতিয়ার খলজি কথা বলতে রাজি হননি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। গণমাধ্যমে কোনো কথা বলতে পারব না। যা বলার পরিচালক স্যার বলবেন।’

ক্রীড়া পরিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্য ও প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে ক্রীড়া পরিদপ্তরে হিসাবরক্ষক পদে যোগ দেন আবদুল আজিজ। যোগদানপত্রে তাঁর বাবার নাম আবদুল মোন্নাফ ও মায়ের নাম আঞ্জুমান আরা লেখা রয়েছে। স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার দড়িকাটবওলা গ্রাম।

কিন্তু তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রে মা–বাবার নাম ঠিক থাকলেও স্থায়ী ঠিকানা লেখা রয়েছে, রংপুর সদর থানার বুড়িরহাট ফার্ম। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত ১৮ এপ্রিল আবদুল আজিজের কর্মস্থল ঢাকায় ক্রীড়া পরিদপ্তরে গেলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমি কিছু বলতে পারব না। কোনো তথ্য জানতে চাইলে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।’ এ কথা বলেই তিনি তাঁর কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান। এ প্রতিবেদক প্রায় দেড় ঘণ্টা ওই কক্ষে অপেক্ষা করলেও তিনি আর ফেরেননি।

চাকরির আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো গরমিল পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশকে নিয়োগ পাওয়া সবার ভেরিফিকেশন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
মোহাম্মাদ নূরে আলম সিদ্দিকী, ক্রীড়া পরিদপ্তরের পরিচালক

ঢাকায় ক্রীড়া পরিদপ্তরে সাঁট–মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ পাওয়া মনজুরুল হাসানের যোগদানপত্রে স্থায়ী ঠিকানা দেখানো হয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলা খাষদেলদারপুর গ্রামকে। কিন্তু তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বলছে, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার তালেবটারী গ্রাম।

চাকরিতে যোগদানে উল্লেখ করা ঠিকানার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য চৌহালীর খাষপুকুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই নাম ও ঠিকানায় কোনো ব্যক্তি খাষদেলদারপুর গ্রামে নেই।

ভুয়া ঠিকানা ও প্রত্যয়নপত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে গ্রাউন্ডসম্যান পদে চাকরি পান আবু বকর সিদ্দিক। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে তাঁর কর্মস্থল ঢাকার মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে টেলিফোনে যোগাযোগ করে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন। পরে কয়েক দফা কল করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।

মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ক্রীড়া পরিদপ্তরে টাকা দিয়ে অযোগ্যরাও চাকরি পাচ্ছেন। আমার ছেলে–মেয়েরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এখানে চাকরি পায়নি। কারণ, আমি চাহিদামতো টাকা দিতে পারিনি।’

এভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে ১০ জনের নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে ক্রীড়া পরিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মাদ নূরে আলম সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, চাকরির আবেদনপত্রে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে কোনো গরমিল পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশকে নিয়োগ পাওয়া সবার ভেরিফিকেশন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মিথ্যা তথ্য দিয়ে বগুড়া জেলা কোটায় একজন চাকরি নিয়েছেন বলে আমাদের কাছে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি।’

গ্রাউন্ডসম্যান পদে নিয়োগ পেয়ে বাগেরহাট সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজে কাজ করছেন মো. রজবুল ইসলাম। তিনি চাকরি নিয়েছেন বগুড়া জেলা কোটায়। স্থানীয় ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ভিটাপাড়া গ্রামকে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, রজবুলের বাড়ি রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কিসমত হাবু গ্রামে।

একইভাবে রংপুর জেলার বাসিন্দা হয়েও গাইবান্ধার ও বগুড়া জেলা কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন লিটন মিয়া ও মনিরুজ্জামান। এঁদের মধ্যে মনিরুজ্জামান ঠাকুরগাঁও জেলা ক্রীড়া অফিসের অফিস সহায়ক কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে চাকরি করছেন। আর লিটন মিয়া ঝিনাইদহ জেলা ক্রীড়া অফিসের অফিস সহায়ক হিসেবে কাজ করছেন।

ক্রীড়া পরিদপ্তরের নিয়োগপত্র অনুযায়ী, আবু বকর সিদ্দিকের স্থানীয় ঠিকানা পাবনা জেলার সদর থানার দোগাছী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বোবড়াখালী গ্রামে। কিন্তু দোগাছী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র বলছে, এই নামে ওই ঠিকানায় কেউ বসবাস করেন না। অন্যদিকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বাড়ি রংপুর জেলার সদর থানার বেনুঘাট গ্রামে।

মালি পদে নিয়োগপ্রাপ্ত এম এইচ মুন্না এখন বাগেরহাট সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজে আছেন। তিনি কুড়িগ্রাম জেলা কোটায় চাকরি পান। নিয়োগপত্রে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা হচ্ছে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার জোড়গাছ গ্রামে। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে দেওয়া তথ্য বলছে, এম এইচ মুন্নার স্থায়ী ঠিকানা রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার কিসমত হাবু গ্রামে। এম এইচ মুন্না প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, নদীভাঙনের কারণে কুড়িগ্রামের চিলমারী ছেড়ে রংপুরে বসবাস করতাম। রংপুরে আমার বাড়ি রয়েছে। তবে চাকরি নিয়েছি কুড়িগ্রামের ঠিকানায়।

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার ঠিকানা ব্যবহার করে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পান সম্রাট মণ্ডল। রাজশাহী সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজে কর্মরত সম্রাট প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, এটাই তাঁর ঠিকানা। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বলছে, সম্রাট মণ্ডলের স্থায়ী ঠিকানা গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার জলিরপাড় গ্রামে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যশোর জেলার কোটা না থাকলেও এই জেলার বাসিন্দা আল মামুন নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজে অফিস সহকারী পদে কাজ করছেন।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চাকরির বয়সসীমা ছিল ১৮-৩০ বছর। কিন্তু ত্রিশোর্ধ্ব সাইফুল ইসলাম অফিস সহায়ক পদে চাকরি পান। তিনি বর্তমানে মাগুরা জেলা ক্রীড়া অফিসের হিসেবে কর্মরত। বয়স গরমিলের বিষয়টি ক্রীড়া পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নজরে আসায় কয়েক মাস ধরে তাঁর বেতন বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘জালিয়াতি করে যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁরা যেমন অপরাধী; এসব জেনেও যাঁরা নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন, তাঁরা আরও বড় অপরাধ করেছেন। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন