বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

রায়ে আদালত বলেছেন, ক্ষতিপূরণের আদেশ দেওয়ার পর প্রায়ই দেখা যায়, প্রতিবাদীরা ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে কালক্ষেপণ করে। ক্ষতিপূরণের টাকা পরিশোধে বিলম্বের দ্বারা ভুক্তভোগীদের একধরনের অজানা আশঙ্কার মধ্যে নিমজ্জিত রাখা হয়। সে জন্য ক্ষতিপূরণের মামলায় ব্যাংক রেট হারে ক্ষতিপূরণের সঙ্গে সুদ প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকা প্রয়োজন। ক্ষতিপূরণ একটি দেনার মতো, এটি ঋণের মতো, যা সুদসহ পরিশোধিত হয়।

রায়ে বলা হয়, সাংবিধানিক আইনে সরকার বা সরকারি কর্তৃপক্ষ তাদের অধীন কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের দায়িত্বে গাফিলতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য। তবে সরকার এই সমপরিমাণ টাকা দায়িত্বে গাফিলতির জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে আইনগত পদ্ধতিতে আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেবে। এই নীতির ফলে সরকারি কোষাগার থেকে ক্ষতিপূরণ দিলেও দায়িত্বে অবহেলা যেসব কর্মকর্তা বা কর্মচারী করেছেন, তাঁদের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।

নির্দেশনায় বলা হয়, ১৮টি পরিবারের প্রতিটিকে ১৫ লাখ টাকা করে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যার অর্ধেক বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এবং বাকি অর্ধেক চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেকের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারকে দেবে। রায় পাওয়ার ৩০ কর্মদিবসের মাধ্যমে তা হস্তান্তর করবে। ক্ষতিপূরণের অতিরিক্ত হিসেবে মামলা দায়েরের তারিখ (২০১৭ সাল) থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্তদের অ্যাকাউন্টে ক্ষতিপূরণের টাকা জমা পর্যন্ত প্রচলিত ব্যাংক রেট তথা ৮ শতাংশ হারে সুদ প্রতিবাদীরা (বিআইডব্লিউটিসি ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ) পরিশোধ করবে।

রায়ে বলা হয়, ১৮ ব্যক্তি তাঁদের জীবন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ১৮ ব্যক্তির মৌলিক অধিকার তথা বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করা হয়েছে। আলোচনায় এটি কাচের মতো স্পষ্ট যে স্বীকৃতমতেই প্রতিপক্ষ ৮ (বিআইডব্লিউটিসি) ও ৯ (চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ)–এর অবহেলার কারণেই ১৮ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মো. আবদুল হালিম গত ৩০ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, ‘রায়ে কয়েকটি মৌলিক ও অমীমাংসিত বিষয় পরিষ্কার হয়েছে। সাংবিধানিক আইনে সরকারি কর্তৃপক্ষ গাফিলতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য, তা ভুক্তভোগী নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দেনা। এই দেনা ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ের মতো ঋণ বলে গণ্য হবে। কর্তৃপক্ষ যাতে ক্ষতিপূরণ দিতে দেরি না করে, সে জন্য যত দিন ক্ষতিপূরণ পরিশোধ না করবে, তত দিন এই দেনার ওপর ব্যাংক রেট অনুযায়ী সুদ যোগ হবে এবং তা পরিশোধ করতে হবে—এটি এই রায়ে আসা নতুন দিক।’

তবে বিআইডব্লিউটিসির আইনজীবী সাইফুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের পরপরই তা স্থগিত চেয়ে ওই বছরই আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ায় এখন নিয়মিত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করা হবে। লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি সাপেক্ষে ক্ষতিপূরণ প্রদান বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’

২০১৭ সালের ২ এপ্রিল ওই দুর্ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামের কুমিরা ঘাট থেকে প্রায় ৩৫০ জন যাত্রী নিয়ে একটি জাহাজ সন্দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করে। সন্ধ্যায় জাহাজটি গুপ্তছড়া ঘাটের কাছে পৌঁছায়। তবে সরাসরি ঘাটে ভিড়তে না পারায় কিছুটা দূরে জাহাজ থেকে যাত্রীরা নৌকায় ওঠেন। এরপর যাত্রীদের নিয়ে নৌকাটি ঘাটে পৌঁছায়। যাত্রী ঘাটে নিয়ে যাওয়ার সময় অন্য একটি নৌকা বাতাসে উল্টে যায়। কোস্টগার্ড ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সহযোগিতায় ২২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ওই বছরের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত ১৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ওই বছরই রিট করেন। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল দেন। চূড়ান্ত শুনানি গত বছরের ৩০ জুন হাইকোর্ট রায় দেন।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, কঠিন বাস্তবতার বিষয়ে আদালত তাঁর বাস্তব জ্ঞান ও সচেতনতার চোখ বন্ধ রাখতে পারেন না। অপরাধীর শাস্তি ভুক্তভোগী, তথা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবারকে উল্লেখ করার মতো সান্ত্বনা দেয় না। প্রতিকার হিসেবে যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ আদালত কর্তৃক প্রদানে সম্ভবত সবচেয়ে উৎকৃষ্ট এবং একমাত্র কার্যকর প্রতিবিধান, যা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির বা ভুক্তভোগী বা মৃত ব্যক্তির পরিবারের ক্ষতে মলম লাগানোর মতো। বর্তমান মামলায় লাল বোটে ডুবে ১৮ যাত্রীর মৃত্যুর জন্য বিআইডব্লিউটিসি ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ দায়ী। বিআইডব্লিউটিসি ও চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রমাণিত পূরণযোগ্য ক্ষতির কারণে প্রাইভেট আইনের আওতায় ক্ষতিপূরণের দাবির অতিরিক্ত হিসেবে পাবলিক আইনের আওতায় (ভুক্তভোগী পরিবার) ক্ষতিপূরণ পাওয়ার হকদার। রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের কাজ বা আদেশ দ্বারা কোনো ব্যক্তির বেঁচে থাকার সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকার হরণ করা হলে ওই হরণ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠিন দায়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন