রাঙামাটির ঝগড়াবিল মৌজার মিতিংগাছড়ি ও বিলাইছড়িপাড়া গ্রামের শতাধিক পরিবারের মানুষজন একধরনের অনিশ্চতার মধ্যে বসবাস করছেন। অনিশ্চয়তার শুরু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি হুকুম–দখলের বিজ্ঞপ্তি জারির পর থেকেই। কে কত ক্ষতিপূরণ পাবেন, কোথায় যাবেন—এমন ভাবনায় দিন কাটছে তাঁদের।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এই এলাকার ৭৪ জনের নামে ভূমি হুকুম–দখলের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। কিন্তু ওই জায়গায় আরও অনেকের বসবাস। তাঁদের সবার মনেই এখন উৎকণ্ঠা। জমির ক্ষতিপূরণ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা না পওয়ায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও করতে পারছেন না তাঁরা।
সম্প্রতি ঝগড়ারবিল মৌজায় গিয়ে দেখা গেছে, আসামবিস্ত-কাপ্তাই সড়কের পাশের দুই গ্রামের মানুষজন দল বেঁধে বিভিন্ন দোকানে ও বাড়ির উঠানে বসে কথা বলছেন। প্রশাসন কখন জায়গা দখল শুরু করবে, কে কোথায় যাবেন তা নিয়ে আলাপ হচ্ছিল তাঁদের মধ্যে। বিলাইছড়িপাড়ার বাসিন্দা বাদী চান চাকমা নিজের খেতে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘ফসল পরিচর্যা করে আর লাভ কী? এখন নতুন জায়গা দেখতে হবে।’ ওই গ্রামের প্রধান (কার্বারি) বাসকি চাকমা বলেন, ‘আমাদের জীবনটাই স্থবির হয়ে গেছে। কাজের প্রতি কারও মন নেই।’
দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়েছেন এখানকার মানুষজন। ক্ষতিপূরণ আদৌ পাবেন কি না, পেলেও কোথায় পুনর্বাসিত হবেন এটা জানা না থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা জানান। বিলাইছড়িপাড়ার অনুরুদ্ধ চাকমা জানান, তিনি বাড়ির দুই পাশের জায়গা দুজনের কাছে বিক্রি করেছিলেন। ওই দুই ব্যক্তি হুকুম–দখলের বিজ্ঞপ্তি পেলেও তিনি পাননি। অথচ তিনি মূল জায়গার মালিক। সবাই যে অন্ধকারে আছেন ঝগড়ারবিল মৌজার হেডম্যান সুরঞ্জন দেওয়ানের কথায় সেটা পরিষ্কার হয়। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাকে কোনো অনুলিপি দেওয়া হয়নি। কতজন উচ্ছেদ হবে, ক্ষতিপূরণ কী হবে কিছুই জানি না।’
তবে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রকৃত ভূমির মালিকেরা পর্যায়ক্রমে হুকুম–দখলের বিজ্ঞপ্তি পাবেন, ক্ষতিপূরণও দেওয়া হবে সবাইকে। এ ব্যাপারে রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ তানভীর আহমদ ছিদ্দিকী জানান, যে ১০০ একর জায়গা হুকুম–দখল করা হবে, সেখানে ১৪০ পরিবার রয়েছে। যাঁরা বিজ্ঞপ্তি পাননি, তাঁদের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে। ভূমি হুকুম–দখল শুরুর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তিন ধারায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরবর্তী ধাপ হলো যৌথ জরিপ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে চিঠি লিখে যৌথ জরিপ পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে। তাঁরা সময় দিতে পারলে কাজ শুরু হবে।’
ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ তানভীর আহমদ ছিদ্দিকী বলেন, ‘জায়গার সর্বোচ্চ দর যা, তার দেড় গুণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আর পুনর্বাসনের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহমর্মিতা ও সহানুভূতি এবং অগ্রাধিকার দিয়ে চেষ্টা করব।’
উল্লেখ্য, রাঙামাটিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতিসহ আদিবাসীদের তিনটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সংগঠন বিরোধিতা করে আসছে। গত ১০ জানুয়ারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ কয়েকটি বাঙালি সংগঠনের সংঘর্ষ ঘটে। পরে তা বাঙালি-আদিবাসী সহিংসতায় রূপ নিলে রাঙামাটি শহরে ১৪৪ ধারা ও সান্ধ্য আইন জারি করতে হয়।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন