সামিয়া প্রথম আলোকে বলেন, চার দিনে কোনো সরকারি ত্রাণ তিনি পাননি। এক ব্যক্তি কিছু চিড়া-মুড়ি দিয়েছিলেন। সেটাই খেয়েছেন। আশ্রয় নেওয়া পরিচিতিজনদের কাছেও কিছু শুকনা খাবার ছিল। সেটা ভাগাভাগি করে খেয়েছেন। এখন সবারই খাবার অভাব।

কোম্পানীগঞ্জের তেলিখালের নির্মাণাধীন ফায়ার সার্ভিস স্টেশন, তেলিখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কোম্পানীগঞ্জ সদর সরকারি মডেল উচ্চবিদ্যালয়—এই তিনটি আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে বন্যাদুর্গত মানুষের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা দাবি করেন, কেউই সরকারি ত্রাণ পাননি। ব্যক্তি উদ্যোগে কেউ কেউ শুকনা খাবার দিয়ে গেছেন। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। সুপেয় পানির অভাবও প্রকট। তবে কোথাও কোথাও দূরের টিউবওয়েল থেকে পানি আনা যাচ্ছে।

শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নয়, কয়েকটি গ্রাম ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বললে তাঁরাও দাবি করেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দেওয়া ত্রাণসহায়তা তাঁরা পাননি।

অবশ্য কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লুসি কান্ত হাজং প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ৬৬ মেট্রিক টন (৬৬ হাজার কেজি) চাল ও ১০ লাখ টাকার শুকনা খাবার (চিড়া, গুড় ও বিস্কুট) পাঠানো হয়েছে। এই খাবার স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১ হাজার ৭০০টি প্যাকেট খাবার দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, এর পরেও মানুষ বলছে তারা খাবার পাচ্ছে না।

তেলিখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণ না যাওয়ার বিষয়ে ইউএনও বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় সেখানে পুলিশ ত্রাণ নিয়ে গেছে।

উল্লেখ্য, এবারের বন্যায় কোম্পানীগঞ্জের পুরোটাই ডুবে গেছে। সেখানকার জনসংখ্যা প্রায় দুই লাখ।

সিলেট ও সুনামগঞ্জে গত বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকে বন্যা পরিস্থিতির হঠাৎ অবনতি ঘটে। কোম্পানীগঞ্জে গতকাল পানি কিছুটা কমেছে। তবে উপজেলা শহরের বাজারে হাঁটুপানি ছিল।

কোম্পানীগঞ্জের শওকত নগর গ্রামের বাসিন্দা গৃহিণী কল্পনা বেগম তিন মেয়েকে নিয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে ঠাঁই নিয়েছিলেন উপজেলা সদরের সরকারি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, বন্যার পানিতে তাঁর টিনের ঘর, আসবাব, কাপড়চোপড়, চাল—সবই ভেসে গেছে। হাঁস-মুরগিও রক্ষা করা যায়নি।

আশ্রয়কেন্দ্রের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষে গতকাল দুপুরে কথা হয় কল্পনা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী ট্রাকচালক। ট্রাকের মালিক কিছু শুকনা খাবার, চাল ও ডাল দিয়ে গেছেন। এ ছাড়া গত রোববার এক ব্যক্তি কিছু চিড়া, মুড়ি ও বিস্কুট দিয়ে যান। সেগুলোই কয়েক দিন ধরে খাচ্ছেন।

এই সরকারি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে গতকাল গিয়েছিলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আয়েশা আক্তার। তিনি বলেন, সরকারি ত্রাণসহায়তা আসতে শুরু করেছে। কিন্তু সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ত্রাণ কার্যক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।

আয়েশা আক্তার আরও বলেন, তাঁর মাধ্যমে গত পাঁচ দিনে মাত্র ২০০ জনকে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হয়েছে।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদরের সরকারি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ে গিয়ে গতকাল দুপুরে দেখা যায়, স্কুল ভবনের নিচতলায় প্রায় হাঁটুপানি। বন্যাদুর্গত মানুষ স্কুল ভবনের দ্বিতীয় তলার তিনটি ও তৃতীয় তলার দুটি কক্ষ ব্যবহার করছেন। শ্রেণিকক্ষে বসার বেঞ্চগুলোকে পাশাপাশি রেখে বিছানা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কয়েকজন অস্থায়ী চুলায় রান্নার চেষ্টা করছেন। তবে রান্নার জ্বালানির বড় অভাব। ভবনটিতে মাত্র দুটি শৌচাগার রয়েছে। ছাদে যাওয়ার সিঁড়িতে রাখা হয়েছে কয়েকটি গরু আর হাঁস।

কেন্দ্রটির তৃতীয় তলায় আশ্রয় নিয়েছেন সখিনা বেগম। তিনি ইসলামপুর ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, পানি তাঁর সর্বনাশ করেছে। মানুষের কাছে হাত পেতে তিন বস্তা ধান জোগাড় করেছিলেন। ধান ভাঙিয়ে চালও করেছিলেন। বন্যার পানিতে সব চাল ভেসে গেছে।

তেলিখালে নির্মাণাধীন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে ও তেলিখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রের চিত্রও মোটামুটি একই। ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের আশ্রয়কেন্দ্রে ৬টি শৌচাগারই নির্মাণাধীন। একটিও এখনো ব্যবহারের উপযোগী নয়। ফলে সেখানে আশ্রয় নেওয়া লোকজনকে শৌচকর্মের জন্য উন্মুক্ত স্থান ব্যবহার করতে হচ্ছে।

ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে তেলিখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র। কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার আটটি কক্ষে প্রায় ৩০০ লোক আশ্রয় নিয়েছে। শৌচাগার পানিতে ডুবে আছে। কেন্দ্রটিতে আশ্রয় নেওয়া নারী জামিয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, শৌচকর্মে মেয়েদের দুর্ভোগ বেশি।

শুধু আশ্রয়কেন্দ্র নয়, যারা কোনো রকমে ঘরবাড়িতে রয়ে গেছে, তারাও বলছে খাবারের অভাবের কথা। দক্ষিণ বুড়দেও মাঝ পাড়ার বাসিন্দা আবদুল করিম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজের যা কিছু আছে সেগুলোই অল্প অল্প করে খেয়ে জীবনটা কোনোমতে বাঁচিয়ে রেখেছি। কারও কাছ থেকে কোনো সহায়তা এখনো পর্যন্ত পাইনি।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন