বৃহস্পতিবার আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, চাক্তাই, ফিরিঙ্গীবাজার, কোতোয়ালি, নিউমার্কেট, মেহেদিবাগ, চটেশ্বরী মোড় ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার নালার বেশির ভাগ অংশে স্ল্যাব নেই। খালে নেই নিরাপত্তাবেষ্টনী। বর্ষা শুরু হওয়ায় উন্মুক্ত খাল ও নালা নিয়ে নগরবাসীর মনে ভয় আরও বেড়েছে।

নগরের বহদ্দারহাটের নতুন চান্দগাঁও থানার মোড়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচল। মোড়ের এক পাশে নালা। টানা বৃষ্টিতে নালা আর সড়ক পানিতে একাকার হয়ে যায়। সড়ক-নালা কোনোটিকেই আলাদা করার সুযোগ থাকে না। তখন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে নগরবাসী।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই সড়ক ধরে হেঁটে যাচ্ছিলেন পথচারী সিরাজুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বৃষ্টির পানিতে সব একাকার হয়ে যায়। বোঝার উপায় থাকে না কোথায় নালা, কোথায় সড়ক। নালার ওপর সব জায়গায় স্ল্যাবও নেই। যেকোনো সময়ই ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।

default-image

পশ্চিম বাকলিয়ার রূপনগর এলাকায় গত মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে কথা হয় সাফোয়ান আস সাফার সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তাঁর বাসার পাশেই নালা। নালার পাশে সড়ক। বৃষ্টি হলেই হাঁটুপানি জমে যায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই সড়কে হাজারো মানুষ চলাচল করে। সকালবেলা শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যায়। অনেক সময় নালায় পড়ে আহত হন পথচারীরা।

অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা চাক্তাই খালের মাধ্যমে পণ্য আনা-নেওয়া করেন। খাললাগোয়া সরু সড়কে প্রতিনিয়ত রিকশা, মিনিট্রাক, সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। তবে খালের বড় অংশ এখনো অরক্ষিত। খাল আর সড়কের মধ্যে কোনো বিভাজক বা বেষ্টনী নেই। বর্ষায় খালটি ফুলেফেঁপে ওঠে। তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যায় বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বর্ষায় চাক্তাই খালে পানি বেড়ে যায়। খালের পাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয় পথচারীদের।

গত এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে ডুবেছে নগরের একাধিক এলাকা। তাই উন্মুক্ত খাল ও নালা নিয়ে নগরবাসীর মনে ভয় আরও বেড়েছে। নালা–খালে পড়ে হতাহতের ঘটনাগুলো তাঁদের মধ্যে এই ভয় ধরিয়ে দিয়েছে।

গত বছরের ৩০ জুন নগরের মেয়র গলি এলাকায় চশমা খালে পড়ে অটোরিকশাচালক ও এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। ২৫ আগস্ট নগরের মুরাদপুরে চশমা খালে পা পিছলে পড়ে তলিয়ে যান সবজি বিক্রেতা ছালেহ আহমেদ। ৬ ডিসেম্বর চশমা খালের ষোলোশহর তলিয়ে যায় শিশু মো. কামাল উদ্দিন। তিন দিন পর নগরের মির্জা খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনাস্থল থেকে শুরু করে খালটির কোনো স্থানেই এখনো নিরাপত্তাবেষ্টনী দেওয়া হয়নি।

default-image

২৭ সেপ্টেম্বর নগরের আগ্রাবাদের মাজার গেট এলাকায় ফুটপাত থেকে পা পিছলে নালায় পড়ে মৃত্যু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী শেহেরীন মাহমুদ সাদিয়ার। এরপর ওই নালায় স্ল্যাব বসানো হয়েছে।

নগরের উন্মুক্ত নালা-খালে পড়ে একাধিক মানুষের হতাহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)—কেউ এর দায় নেয়নি। এসব মৃত্যুর জন্য উল্টো পরস্পরকে দায়ী করে আসছে সংস্থা দুটি। সংস্থা দুটির ভূমিকায় চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। সরকারের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এমন মৃত্যুর জন্য দুটি সংস্থার গাফিলতিকে দায়ী করা হয়েছে।

সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, পথচারীদের নিরাপদে চলাচলের জন্য গত দুই বছরে প্রায় ২৫ হাজার বর্গফুট স্ল্যাব মেরামত এবং নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ খালের পাড়ে ১৫ হাজার বর্গফুট রক্ষাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এখনো নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে নালা-নর্দমায় অন্তত ৩ হাজার মরণফাঁদ রয়েছে। আর পথচারীদের চলাচল নিরাপদ করতে খালের পাড়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী দরকার ১৯ হাজার ২৩৪ মিটার। তালিকা তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত নালা-নর্দমা ও খালের পাড় ঝুঁকিমুক্ত করার কাজ শেষ করতে পারেনি সিটি করপোরেশন।

অবশ্য সিটি করপোরেশন নালা-খাল ঝুঁকিমুক্ত করতে স্ল্যাব বসানোর কাজ করছে বলে জানান প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্ল্যাব মেরামত ও নির্মাণ ধারাবাহিকভাবে করা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানের খালেও বেষ্টনী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

খাল-নালা ঝুঁকিমুক্ত না হওয়ার জন্য সিডিএ–সিটি করপোরেশনের গাফিলতিকে দায়ী করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সাবেক জাতীয় পর্ষদ সদস্য ও প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, খালা-নালায় পড়ে মানুষ মারা যাওয়ার পরও সংস্থাগুলোর টনক নড়েনি। মানুষের মৃত্যুর পর দু-এক দিন একটু কথাবার্তা হয়। এরপর সব আগের মতো চলতে থাকে। এসব ঘটনায় কাউকে বিচারের মুখোমুখিও করা যায়নি। দুই সংস্থা এর দায় এড়াতে পারে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন