তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে দুই গোয়েন্দা সংস্থার গভীর সম্পর্কের বিষয়টি সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নীরব ভূমিকাও ছিল রহস্যজনক।
বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার রায়ে এ মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের মহানগর দায়রা জজ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক এস এম মজিবুর রহমান। এ ঘটনা নিয়ে দায়ের করা চোরাচালান ও অস্ত্র আইনের দুই মামলার রায়ে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সই করেন বিচারক। নিয়ম অনুযায়ী, রায়ের প্রত্যায়িত অনুলিপি এখন হাইকোর্ট, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষকে দেওয়া হবে।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে সিইউএফএল জেটি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের চালান আটক করা হয়। ১০ বছর অপেক্ষার পর গত ৩০ জানুয়ারি এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। চোরাচালান মামলার রায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিল্পসচিব নুরুল আমিন, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহীম এবং উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়াসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং একই ব্যক্তিদের অস্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় দুই মামলার ৫২ আসামির মধ্যে ৩৮ জনকে খালাস দেওয়া হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিএনপির চেয়ারপারসন সম্পর্কে বলা হয়, মেজর জেনারেল (অব.) সাদিক হাসান রুমি টেলিফোনে এ ঘটনা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। জবাবে তাঁকে বলেন, তিনি এ ঘটনা জানেন। এ ব্যাপারে একটি কমিটি করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর এ মনোভাবের কথা উল্লেখ করে বিচারক বলেন, কোনোরূপ কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে সরকারপ্রধানের এ ধরনের নীরবতা রহস্যজনক।
পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, তিনি বিস্মিত, স্তম্ভিত ও মর্মাহত যে ডিজিএফআই এবং এনএসআইয়ের মতো দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ও যোগাযোগ ছিল। উলফার হাত শক্তিশালী করতেই এ অস্ত্রের চালান আনা হয়। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বিনষ্ট করার দুরভিসন্ধি নিয়েই তাঁরা এ কাজ করেছেন।
পর্যবেক্ষণে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সম্পর্কে বলা হয়, লুৎফুজ্জামান বাবর আসামিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে কৌশলে এ ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। ঘটনার এক বছর পর বাবর এ মামলার দুই সাক্ষী সার্জেন্ট আলাউদ্দিন ও সার্জেন্ট হেলালউদ্দিনকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতন করেছেন। তাঁরা অস্ত্র চুরি করেছেন বলে একে-৪৭ রাইফেলসহ তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু এ চালানে কোনো একে-৪৭ ছিল না।
মতিউর রহমান নিজামী সম্পর্কে বলা হয়, তিনি ওই সময় শিল্পমন্ত্রী ছিলেন। তিনি এ ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
এ ঘটনা তদন্তে জোট সরকারের আমলে করা তদন্ত কমিটির ব্যাপারে আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ওই ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রসচিব ওমর ফারুককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়। কিন্তু এই কমিটির প্রতিবেদনে ঘটনার মূল হোতা পরেশ বড়ুয়ার নামই বাদ দেওয়া হয়। সরকারি মদদ ছাড়া এভাবে এত বিপুল পরিমাণ অস্ত্র নির্বিঘ্নে দেশে আনা সম্ভব হবে, সেটা কেউ বিশ্বাস করবে না। এতে প্রমাণিত হয়, তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী, উচ্চপর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
বিচারক বলেন, আন্তর্জাতিক চোরাকারবারিরা যে দেশের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের লোভ দেখিয়ে বশীভূত করতে পারে সে দেশকে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য বেছে নেয়। পরেশ বড়ুয়া এ ক্ষেত্রেও সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন