বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
সমস্যার মধ্যেও কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের দ্বিতীয় সুড়ঙ্গের খননকাজ শেষ হওয়া ছিল স্বস্তির

বছরজুড়ে এ ধরনের অব্যবস্থাপনার ঘটনা ঘটলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সিডিএ নিজেদের দায় এড়িয়েছে। ঘটনার দায় পরস্পরের কাঁধে চাপিয়েছে দুটি সংস্থা। তবে সরকারের এক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারার পেছনে দুটি সংস্থার ব্যর্থতা রয়েছে।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ২০২১ সাল চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য থমকে যাওয়া বছর। নিরাপদ নগরের বিষয়টি এই বছর নিয়মিত ধাক্কা খেয়েছে। নালা-নর্দমা ও খালে পড়ে মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ভাঙা সড়কের কারণে কলেজছাত্রীর প্রাণ গেছে। এ ছাড়া জলাবদ্ধতার প্রকল্পের কাজ হলেও অগ্রগতি ছিল কম। এসব থেকে শিক্ষা নিয়ে সেবা সংস্থাগুলো আগামী বছরে এমনভাবে কাজ করবে, যাতে আরও কোনোভাবে মানুষের ক্ষতি না হয়। উন্নয়নকাজে নিরাপত্তাবেষ্টনীসহ যথাযথ নিরাপদ ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে বলে আশা। আর কর্ণফুলী টানেল ও আউটার রিং রোডের কাজ পুরোপুরি শেষ হলে যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রে মাইলফলক হবে।

২০২১ সাল চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য থমকে যাওয়া বছর। নিরাপদ নগরের বিষয়টি এ বছর নিয়মিত ধাক্কা খেয়েছে।
মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক, চুয়েট

এ কেমন মৃত্যু

২৭ সেপ্টেম্বর রাতে চক্ষু চিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) ছাত্রী শেহেরীন মাহমুদ সাদিয়া (১৯)। সঙ্গে ছিলেন মামা জাকির হোসেন ও নানা হাজি জামাল। যান চশমার দোকানে। এরপর মামা-নানার সঙ্গে বাসায় ফিরছিলেন সাদিয়া। কিন্তু ফুটপাত থেকে পিছলে নালায় পড়ে যান। রাত তিনটায় নালা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

নগরের আগ্রাবাদের মাজার গেট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কারণে পুরোনো ফুটপাত ভেঙে নতুন ফুটপাত করা হয়। কিন্তু ফুটপাতের সঙ্গে নালা যুক্ত হলেও সেখানে ছিল না কোনো ধরনের নিরাপত্তাবেষ্টনী। সাদিয়ার মৃত্যুর পর টনক নড়ে সিটি করপোরেশন ও সিডিএর। ওই ফুটপাতে দেওয়া হয় ইটের দেয়াল।

default-image

এর আগে গত ৩০ জুন জলাবদ্ধতার সময় নগরের মেয়রগলি এলাকায় চশমা খালে পড়ে যায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এতে অটোরিকশাচালক মো. সুলতান (৩৪) ও যাত্রী খাদিজা বেগমের (৬৫) মৃত্যু হয়। ২৫ আগস্ট বৃষ্টির সময় সবজি বিক্রেতা ছালেহ আহমেদ (৫০) হঠাৎ পা পিছলে পাশের খালে পড়ে যান। সবার সামনে মুহূর্তেই খালের ভেতরে তলিয়ে নিখোঁজ হন। চট্টগ্রাম নগরে মুরাদপুরে চশমা খালে তলিয়ে যাওয়া এই ব্যক্তির খোঁজ মেলেনি গত চার মাসেও।

৬ ডিসেম্বর বিকেলে চিটাগং শপিং কমপ্লেক্স এলাকায় চশমা খালে বন্ধু রাকিবের সঙ্গে বোতল কুড়াতে নেমে মো. কামাল উদ্দিন (১২) নামের এক শিশু নিখোঁজ হয়। তলিয়ে যাওয়ার তিন দিন পর ৯ ডিসেম্বর নগরের মোহাম্মদপুর এলাকায় মির্জা খালে কামালের মরদেহ পাওয়া যায়।

একের পর এক মৃত্যুর ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে সিটি করপোরেশন। এখন নগরের ঝুঁকিপূর্ণ নালা-নর্দমা ও খালগুলো চিহ্নিত করে তাতে বেষ্টনী দিচ্ছে সংস্থাটি। তবে তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। নিরাপত্তার ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। সিটি করপোরেশনের হিসাবে চট্টগ্রাম নগরে উন্মুক্ত নালা-নর্দমা ও খালে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান রয়েছে ৫ হাজার ৫২৭টি। এর মোট দৈর্ঘ্য ১৯ হাজার ২৩৪ মিটার।

উড়ালসড়কে ‘ফাটল’

চট্টগ্রাম নগরের বহদ্দারহাটের এম এ মান্নান উড়ালসড়কের কালুরঘাটমুখী র‍্যাম্পের পিলারে ‘ফাটল’। গত ২৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ছবি ও খবর। তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় যান চলাচল। অবশ্য সিটি করপোরেশন ও সিডিএর দুটি বিশেষজ্ঞ দল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানায়, পিলারে কোনো ফাটল ছিল না। তবে এ আলোচনার পরেই নজরে আসে র‍্যাম্পটি নির্মাণ করা হয়েছিল হালকা যানের জন্য। কিন্তু তদারকির অভাবে সেটিতে এত দিন চলাচল করছিল ভারী যানও। ‘ফাটলের’ খবরের পর তা বন্ধ করা হয়। ফাটলের খবরের কারণে র‍্যাম্পে যান চলাচল বন্ধ ছিল ১৩ দিন।

এর রেশ থামতে না থামতেই নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে বন্দর উড়ালসড়কে ফাটলের খবর পাওয়া যায়। নগরের সল্টগোলা এলাকায় নির্মিত এই উড়ালসড়কের ফাটলের বিষয়টি স্বীকার করলেও তাতে কোনো ঝুঁকি নেই বলে দাবি করেছিলেন নির্মাণকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা।

স্বস্তির খবর টানেলের টিউব খনন

উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সারা বছর দুর্ভোগে থাকলেও স্বস্তি দিয়েছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের দ্বিতীয় সুড়ঙ্গ বা টিউবের খননকাজ শেষ হওয়ার বিষয়টি। ৭ অক্টোবর এর খননকাজ শেষ হয়। আগের বছরের (২০২০) ১২ ডিসেম্বর এর খননকাজ শুরু হয়েছিল। এটি খনন করতে লেগেছিল মাত্র ১০ মাস। চট্টগ্রামের আনোয়ারা প্রান্ত থেকে শুরু হওয়া এই টিউব এসে মিশেছে নগরের পতেঙ্গা প্রান্তে। নদীর তলদেশে প্রথম সুড়ঙ্গ খনন করতে যেখানে ১৭ মাস লেগেছিল।
২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদীর তলদেশে প্রথম টানেলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছিলেন।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন