default-image

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনে করেন, মশার বিস্তার রোধে দুই সিটি করপোরেশনের গাফিলতি নেই। মশকনিধনের ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি হয়নি। তিনি ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকাসহ সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ওপর গুরুত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থান করছেন। সেখানে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি বিবিসি বাংলার ইউটিউব চ্যানেল ও ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। এতে গত ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, পদ্মা সেতু নিয়ে গুজবে গণপিটুনি এবং দেশের অর্থনীতিসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে।

এডিস মশার বিস্তার রোধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের গাফিলতির অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু রোগের এখন চিকিৎসা করার ব্যবস্থা আছে। ডেঙ্গু হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার যথাযথ ব্যবস্থা আছে। আসলে সংবাদগুলো যখন বেশি আসে, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আর সেটাই সমস্যা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, ‘একটু উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত যারা, সেই জায়গাগুলোতেই এর প্রকোপ বেশি। আমাদের সব সময় লক্ষ্য থাকে বস্তি এলাকা, ড্রেন এসব দিকে। মশা মারা কিন্তু নিয়মিত একটা ব্যাপার।’

শুধু সিটি করপোরেশনকে দোষ না দিয়ে সব মানুষকে সতর্কতা অবলম্বন করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। মশার ওষুধ কেনায় দুর্নীতির অভিযোগ নাকচ করে শেখ হাসিনা বলেন, মশার ওষুধ কেনার ব্যাপারে দরপত্র আহ্বান করা হয়। যারা দরপত্রে উপযুক্ত হয়, তারা কিনে নিয়ে আসে এবং সেগুলো ব্যবহারও হয়।

ভবিষ্যতে মশা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে আরও সুষ্ঠুভাবে করা যায়—এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদেরও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে আহ্বান করা হয়েছে। সরকারের সব অফিস-আদালতকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। শুধু ঢাকা নয়, পুরো দেশেই একটা পরিচ্ছন্নতা অভিযান দরকার।

default-image



নির্বাচন ও গণতন্ত্র
৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে এবং এটা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। এ প্রশ্ন করা হলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সেটা এখন কোনো কেন্দ্রে গোনার দিক থেকে হয়তো পেয়েছে। কোনো কেন্দ্রে হয়তো হতে পারে। কিন্তু আমাদের ট্রাইব্যুনাল আছে সেখানে মামলা করতে পারে, কোর্টে মামলা করতে পারে। নির্বাচন কমিশনেও মামলা করতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ যদি সত্যিই ভোট দিতে না পারত, তাহলে তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে মানুষ আন্দোলনে নামত এবং আমরা ক্ষমতায় থাকতে পারতাম না।’

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের মান ও এর চর্চা কীভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স বলছে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালের আগে শুধু একটি টেলিভিশন ছিল। সেটি সরকারের বাংলাদেশ টেলিভিশন। এখন ৪৪টি বেসরকারি টেলিভিশন আছে। তারা স্বাধীনভাবে কাজ করছে।

গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘স্বাধীনতা না থাকলে তারা সত্য-মিথ্যা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে বা সরকারের বিরুদ্ধে এত অপপ্রচার করতে পারছে কীভাবে। সবাই সব কথা বলে, বলেন স্বাধীনতা নেই। তাহলে এত কথা বলে কীভাবে। এই যে সমালোচনা করা যায় না, এই কথাটা বলার তো সাহস পাচ্ছে। এটাও তো সমালোচনা করা।’ তিনি বলেন, ‘তবে অনেক সময় উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়। যা জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের দিকে নিয়ে যায়। তখন কি সরকার হাত গুটিয়ে বসে থাকবে?’

পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও অমানবিক কায়দায় অত্যাচারের গুরুতর অভিযোগও নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একশ্রেণির মানুষ হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এরা সেই মানুষ, যারা সারাক্ষণ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে সরকারের পেছনে লেগেই আছে। সব সরকারের আমলেই হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনা দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকার এটি বন্ধে কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এমন মানসিকতা আমাদের নেই এবং আমরা সেটি করি না। ঘটনাচক্রে কিছু ঘটতে পারে। বরং আপনি যদি গত ১০ বছরে আমাদের অবস্থান দেখেন, আমরা কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পেরেছি।’

default-image

অর্থনীতি ও গুজব

বাংলাদেশ দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা দেশের একটি। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সুফল সব পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অবশ্যই পৌঁছাচ্ছে। সেভাবেই সরকার পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০০৫ বা ২০০৬ সালের দিকে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ শতাংশের বেশি। এখন তা ২১ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। মাথাপিছু আয় ৪০০-৫০০ মার্কিন ডলার ছিল। এখন প্রায় ২ হাজার মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছি। ৮ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। প্রবৃদ্ধি বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ে। কিন্তু সরকার এটা হতে দেয়নি। নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।’ স্বাভাবিকভাবে এর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে। এরপরও দেশ ছাড়তে গিয়ে ভূমধ্যসাগরে মানুষ মারা পড়ছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আদিকাল থেকেই মানুষের এই প্রবণতা আছে। এই জায়গায় নয়, অন্য জায়গায় গিয়ে ভাগ্য গড়তে হবে। এর সঙ্গে দারিদ্র্যের কোনো সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এখন বেশ নাজুক অবস্থায় আছে এবং ঋণখেলাপিরা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে তা আর ফেরত দিচ্ছেন না। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতটা প্রচার হয়, বিষয়টা ততটা নয়। ঋণ নিয়ে সেটা ফেরত না দেওয়ার সংস্কৃতি চালু হয় সেনা স্বৈরশাসকের আমলে। তাঁর সরকার অনেক টাকা উদ্ধার করেছে।

পদ্মা সেতুতে মানুষের কাটা মাথা লাগার গুজব এবং এর জেরে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে বেশ কয়েকজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মানুষ কি প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না? এ প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রক্ত আর কাটা মাথা দিয়ে কীভাবে সেতু তৈরি হয়? এ গুজবটা যারা ছড়াচ্ছে; পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত প্রথম থেকেই ছিল। কারা করছে, কেন করছে, এটা খুঁজে বের করতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন