default-image

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বন্দরখোলা এলাকার কৃষক হাকিম ব্যাপারী। বন্যায় তলিয়ে গেছে তাঁর গোয়ালঘর। ঘরেও পানিতে থই থই। নিজেরই থাকার উপায় নেই, এর ওপর গবাদিপশু নিয়ে পড়েন আরও বেকায়দায়। তাই বাধ্য হয়ে আগেভাগেই কোরবানির গবাদিপশুর হাটে গরু বিক্রি করতে গিয়েছিলেন। তবে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় গরু নিয়ে ফিরে এসেছেন। হাকিম ব্যাপারীর মতো শিবচরের বেশির ভাগ কৃষকের এখন করুণ দশা। অনেকে নানা সংকটে পড়ে কোরবানির হাটে ঘরের গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন পানির দামে।

বাড়িতে পানি থাকায় বন্দরখোলা ইউনিয়নের শিকদারহাট সেতুর ওপর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন হাকিম ব্যাপারী। আজ রোববার সরেজমিন সেতুর ওপর গেলে তিনি তাঁর দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বানের পানি এইবারকা আমাগো সুখ কাইড়া নিল। যেই গরুর দাম ষাইট হাজার টাহা, হেই গরুর দাম কয় তিরিশ হাজার টাহা। গরু বেচা লইয়া (বিক্রি করতে গিয়ে) আমাগো মাথায় হাত।’

মাদারীপুরের শিবচরে বন্যার কারণে হাকিম ব্যাপারীর মতো শিকদারহাট সেতুতে আশ্রয় নেওয়া বেশির ভাগ কৃষকের এখন একই দশা। অনেকে নানা সংকটে পড়ে কোরবানির হাটে ঘরের গরু-ছাগলটি বিক্রি করে দিচ্ছেন পানির দামে।

মাদারীপুরের শিবচরে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গবাদিপশু নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে চরাঞ্চলের বানভাসি মানুষ। বসতঘরে পানি ঢুকে পড়ায় কেউ উঁচু রাস্তা আবার কেউ আশ্রয় নিয়েছে সেতুর ওপরে। বাঁশ ও পলিথিনের ছাউনির ভেতরে সীমাহীন কষ্টে দিন কাটছে তাদের।

বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন বলেন, বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর বুকসমান পানি। ঘরের ভেতর মাচা করেও তাঁদের শেষ রক্ষা হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে তাঁরা আশ্রয়ের জন্য এসেছেন। বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেওয়া বেশির ভাগ পরিবারেই কোরবানির বিক্রিযোগ্য গরু আছে। কিন্তু কোরবানির গবাদিপশুর হাটে গরুর ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা।

সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার বন্দরখোলা ইউনিয়নে ১০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সরকারিভাবে খোলা এসব আশ্রয়কেন্দ্রে হয়নি অনেকের জায়গা। তাই শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে রাস্তা ও সেতুর ওপর। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে তারা বাঁশ ও পলিথিনের ছাউনি দিয়ে কোনো রকমে মাচার মতো তৈরি করে সেখানে দিন কাটাচ্ছে। বন্দরখোলা এলাকার সাকিনা শিকদারহাট সেতু ও আমজাদ উকিল সেতুতে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর সদস্যরা বিশুদ্ধ পানির সংকটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসনের সূত্র জানায়, পদ্মা নদী ও আড়িয়াল খাঁ নদের পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় শিবচর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের ১২ হাজার ৭৫০ জন পানিবন্দী জীবন কাটাচ্ছে। বাসভাসি মানুষকে নিরাপদে রাখার জন্য ২১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে ৩২০টি পরিবার। সবচেয়ে বেশি ১০টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে বন্দরখোলা ইউনিয়নে। এ ছাড়া এ সময়ে নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৫০টি পরিবার।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে সরকারিভাবে খাদ্যসরবরাহ করা হচ্ছে। পানিবন্দী মানুষের ঘরেও ত্রাণের প্যাকেট ও চাল সরবরাহ করা হয়েছে। নিরাপদ পানিও সরবরাহ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে যারা গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, তাদের গো–খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছে। হাটে পশুর দাম এ বছর কমে যাওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। গত বছরের মতো এবার গবাদিপশুর দাম নেই। তাই কিছুটা ক্ষতির মুখে পড়েছেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা। তাঁদের সহযোগিতা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অর্থসহায়তা দেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন